নানুরের উঠোন থেকে আত্মনির্ভরতার নতুন ইতিহাস: নকশিকাঁথায় বদলে গেল রেহানা বিবির জীবন

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 16 h ago
রেহানা বিবি
রেহানা বিবি
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

বীরভূম জেলার নানুর ব্লকের এক সাধারণ মুসলিম পরিবারের গৃহবধূ রেহানা বিবি। একসময় সংসারের অভাব-অনটন, স্বামীর অসুস্থতা এবং দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিদিন উদ্বেগে কাটত তাঁর দিন। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির কাছে হার না মেনে ছোটবেলায় শেখা নকশিকাঁথার শিল্পকেই তিনি জীবনের নতুন পথ হিসেবে বেছে নেন। আজ সেই সূঁই-সুতোর কাজই তাঁকে একজন সফল উদ্যোক্তায় পরিণত করেছে। শুধু নিজের পরিবারকেই আর্থিক সংকট থেকে মুক্ত করেননি, তাঁর উদ্যোগে গ্রামের বহু নারীও স্বনির্ভরতার পথে হাঁটছেন।
 
রেহানা বিবির জন্ম ও বেড়ে ওঠা বীরভূমের নানুর এলাকায়। অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়। সংসার সুখেরই ছিল, কিন্তু হঠাৎ স্বামী মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হলে পরিবারের আয়ের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। স্বামীর চাকরি চলে যায় এবং কিছুদিনের মধ্যে পেনশনও বন্ধ হয়ে যায়। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে রেহানার কাঁধে। দুই মেয়ের পড়াশোনা, স্বামীর চিকিৎসা এবং নিত্যদিনের সংসার চালানো, সব মিলিয়ে এক কঠিন সংগ্রামের মধ্যে পড়েন তিনি।
 
রেহানা বিবি
 
এই সময়েই তিনি নতুন করে ফিরে তাকান শৈশবে শেখা নকশিকাঁথার শিল্পের দিকে। ছোটবেলায় মা ও পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের কাছ থেকে সূচিশিল্পের প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন, শুধু ঐতিহ্যগত দক্ষতা দিয়ে বাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলতে তিনি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
 
Banglanatak dot com-এর Rural Craft Hub কর্মসূচির মাধ্যমে আধুনিক নকশা, পণ্যের মানোন্নয়ন এবং বাজারব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নেন। পরে British Council ও Diageo-এর Young Women Social Entrepreneurship Development Programme-এ অংশ নিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা পরিচালনার কৌশল শেখেন। এই প্রশিক্ষণই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
 
২০১৪ সালে খুব অল্প পুঁজি নিয়ে তিনি নিজের নকশিকাঁথার উদ্যোগ শুরু করেন। প্রথমদিকে হাতে তৈরি কাঁথা, শাড়ি ও গৃহসজ্জার সামগ্রী নিয়ে স্থানীয় প্রদর্শনীতে অংশ নিতেন। ধীরে ধীরে তাঁর কাজের পরিচিতি বাড়তে থাকে। ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথাকে আধুনিক নকশার সঙ্গে মিলিয়ে তিনি শাড়ি, ওড়না, বিছানার চাদর, কুশন কভার, ব্যাগ, টেবিল রানার এবং বিভিন্ন হোম ডেকর সামগ্রী তৈরি করতে শুরু করেন। তাঁর শিল্পকর্ম শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, দিল্লি, গোয়া, বেঙ্গালুরুসহ দেশের বিভিন্ন শহরের প্রদর্শনীতেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। পরবর্তীকালে বিদেশেও তাঁর তৈরি নকশিকাঁথা প্রদর্শিত হয়।
 
তবে রেহানা বিবির সাফল্যের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতা। তিনি মনে করেন, একজন নারীর সাফল্য তখনই অর্থবহ, যখন সেই সাফল্যের সুফল অন্য নারীদের কাছেও পৌঁছায়। তাই তিনি গ্রামের বহু নারীকে নকশিকাঁথার প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। যাঁদের অনেকেই আগে কখনও নিজের আয়ের কথা ভাবেননি, আজ তাঁরা বাড়িতে বসেই সূচিশিল্পের কাজ করে সংসারের আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাঁদের অনেকেই এখন বিভিন্ন প্রদর্শনীতে নিজেদের তৈরি পণ্য বিক্রি করছেন।
 

রেহানা বিবির মতে, নকশিকাঁথা শুধু একটি লোকশিল্প নয়; এটি বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং নারীর সৃজনশীলতার এক জীবন্ত দলিল। তাই তিনি নতুন প্রজন্মের মধ্যেও এই শিল্পকে জনপ্রিয় করে তুলতে নিরলস কাজ করে চলেছেন। তাঁর দুই কন্যাও আজ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তবে তিনি চান, তাঁরা উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নিজেদের পছন্দের পেশায় প্রতিষ্ঠিত হোক এবং একই সঙ্গে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকেও এগিয়ে নিয়ে যাক।
 
আজ নানুরের রেহানা বিবি শুধু একজন সফল নকশিকাঁথা শিল্পী নন; তিনি গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে না, যদি তার মধ্যে থাকে শেখার ইচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাস। একসময় যে নারী সংসারের অভাবের কাছে অসহায় ছিলেন, আজ তিনিই বহু নারীর হাতে কর্মসংস্থানের নতুন পথ তুলে দিয়েছেন।
 
রেহানা বিবির এই পথচলা বাংলার গ্রামীণ নারী সমাজের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে, স্বপ্ন দেখতে জানতে হয়, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সাহস, অধ্যবসায় এবং নিজের ওপর অটল বিশ্বাস। নানুরের একটি সাধারণ বাড়ি থেকে শুরু হওয়া তাঁর এই যাত্রা আজ আত্মনির্ভরতা, নারী ক্ষমতায়ন এবং বাংলার ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা শিল্পের পুনর্জাগরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


শেহতীয়া খবৰ