আজমেরের গলি থেকে স্বাস্থ্যসেবার শীর্ষে: কীভাবে সার্জেনিক্স হেলথকেয়ারের সিইও হলেন ফিরদৌস খান

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
ফিরদৌস খান
ফিরদৌস খান
 
আর্সালা খান | নয়াদিল্লি

রাজস্থানের আজমেরের সরু গলি থেকে একটি স্বাস্থ্যসেবা সংস্থার নেতৃত্বে পৌঁছানোর গল্পটি সংগ্রাম, দৃঢ়তা এবং লক্ষ্যনিষ্ঠার এক অনন্য উদাহরণ। আর্থিক সংকট, সামাজিক বাধা এবং পারিবারিক দায়িত্বের মধ্য দিয়েও নিজের পথ নিজেই তৈরি করেছেন ফিরদৌস খান। আজ তিনি সার্জেনিক্স হেলথকেয়ারের (Surgenix Healthcare) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), একটি সংস্থা যা উন্নত ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

আজমেরেই কেটেছে ফিরদৌসের শৈশব। তিনি তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় বোন। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের কঠিন আর্থিক অবস্থার সাক্ষী ছিলেন তিনি। তাঁর বাবা একজন ওয়েটার হিসেবে কাজ করতেন, আর মা সামলাতেন সংসারের দায়িত্ব। আর্থিক অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী, এমনও সময় এসেছে যখন পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এই প্রতিকূলতাই তাঁকে ভেঙে দেয়নি, বরং আরও দৃঢ় করে তুলেছিল।
 
ফিরদৌস খান
 
পরিবারকে সাহায্য করার জন্য খুব অল্প বয়সেই কাজ শুরু করেন ফিরদৌস। নিজের হাতে তৈরি ব্রেসলেট বানিয়ে বিক্রি করতেন। পাশাপাশি সেলাই ও বুননের কাজও করতেন, যাতে পরিবারের আয়ে কিছুটা হলেও সহায়তা করা যায়। আর্থিক সংকট বারবার তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও তিনি কখনও সেই পরিস্থিতিকে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে দেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে সবচেয়ে কঠিন বাধাও অতিক্রম করা সম্ভব।
 
তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন তিনি তাঁর বৃদ্ধ দাদুকে চিকিৎসা পরিষেবা পেতে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে দেখেন। দীর্ঘ সময় হাসপাতালে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করতে বিলম্ব হওয়া এবং পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব, এসব ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তখনই তাঁর মনে একটি ভাবনা জন্ম নেয়, স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজ, সহজলভ্য এবং রোগীবান্ধব করে তোলা। সেই ভাবনাই পরবর্তীকালে সার্জেনিক্স হেলথকেয়ারের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
 
দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করার পর ফিরদৌস বড় স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে দিল্লিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু প্রথমদিকে তাঁর পরিবার এই সিদ্ধান্তে রাজি ছিল না। একটি ছোট শহরের তরুণীর একা মহানগরে গিয়ে থাকা ও কাজ করা পরিবারের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তবুও ফিরদৌস নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।অবশেষে তিনি পরিবারকে বোঝাতে সক্ষম হন। তিনি জানান যে দিল্লিতে তাঁর একটি চাকরি হয়েছে এবং সেই বিশ্বাসেই তিনি দিল্লিতে চলে যান। জীবনের সেই সিদ্ধান্তই পরবর্তীকালে তাঁর সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে প্রমাণিত হয়।
 
দিল্লিতে এসে তিনি একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় (এনজিও) কাজ শুরু করেন। সেখানে তাঁর প্রধান দায়িত্ব ছিল ঋতুস্রাবজনিত স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এই কাজের সূত্রে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পান এবং বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমির নারীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যাগুলি কাছ থেকে জানতে পারেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে এখনও বহু নারী মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সঠিক চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য থেকে বঞ্চিত। অনেকের কাছেই সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়া সম্ভব হয় না, আবার চিকিৎসা প্রক্রিয়াও তাঁদের কাছে জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
 
এই অভিজ্ঞতাগুলি তাঁকে সামাজিক কাজের প্রতি আরও বেশি অনুপ্রাণিত করে। তিনি ‘প্যাড যাত্রা’ নামে একটি সচেতনতামূলক অভিযান শুরু করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি। বিভিন্ন শহরে গিয়ে তিনি নারীদের ঋতুচক্র, পরিচ্ছন্নতা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করেন। পাশাপাশি তিনি ‘পিরিয়ডস ফেস্ট’-এরও আয়োজন করেন, যেখানে নারীরা দীর্ঘদিনের সামাজিক ট্যাবু ভেঙে ঋতুস্রাব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করার সুযোগ পান।
 
এই সমস্ত উদ্যোগ পরিচালনার সময় ফিরদৌস বুঝতে পারেন, শুধুমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধি করলেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অনেক রোগীই সঠিক চিকিৎসক নির্বাচন, উপযুক্ত হাসপাতাল খুঁজে পাওয়া কিংবা পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়া বুঝে উঠতে সমস্যায় পড়েন। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন, এমন একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন, যা রোগীদের রোগ নির্ণয় থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পাশে থাকবে। এই উপলব্ধিই সার্জেনিক্স হেলথকেয়ারের প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
 
রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য, স্বচ্ছ এবং রোগীকেন্দ্রিক করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ফিরদৌস সার্জেনিক্স হেলথকেয়ার প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থা রোগীদের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে সংযুক্ত করে, পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয় এবং স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও সহজ করে তোলে।
 
ফিরদৌস খান
 
সার্জেনিক্স হেলথকেয়ারকে কী আলাদা করে তুলেছে?
 
এই সংস্থার অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল রোগীর সম্পূর্ণ চিকিৎসা-যাত্রাকে গুরুত্ব দেওয়া। শুধুমাত্র চিকিৎসা নয়, প্রথম পরামর্শ থেকে শুরু করে চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে রোগীর পাশে থাকে সার্জেনিক্স হেলথকেয়ার।
 
সংস্থার পরিষেবাগুলি চারটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে বিন্যস্ত

প্রথম ধাপে অভিজ্ঞ কাউন্সেলররা প্রতিটি রোগীর প্রয়োজন মূল্যায়ন করে তাঁদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসার পরামর্শ দেন। দ্বিতীয় ধাপে রোগীরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে বিনামূল্যে পরামর্শের সুযোগ পান। এর ফলে তাঁরা নিজেদের শারীরিক সমস্যার প্রকৃতি এবং সম্ভাব্য চিকিৎসা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন। তৃতীয় ধাপে রোগীদের দেশের শীর্ষস্থানীয় হাসপাতাল এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ করে দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পান। চতুর্থ ও শেষ ধাপে চিকিৎসার পর ব্যক্তিগতভাবে রোগীদের পাশে থেকে তাঁদের দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হয়।
 
রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম
 
সার্জেনিক্স হেলথকেয়ার বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত ট্রিটমেন্ট প্যাকেজও প্রদান করে। এর ফলে রোগীরা চিকিৎসার সম্ভাব্য খরচ সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা পান এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁদের চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে পারেন। সংস্থার লক্ষ্য শুধুমাত্র চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া নয়; বরং রোগী এবং তাঁর পরিবারের পাশে থেকে পুরো চিকিৎসা-যাত্রায় স্বচ্ছতা, আস্থা এবং নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা নিশ্চিত করা।
 
আজ ফিরদৌস খানের জীবনগাথা হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণার উৎস, বিশেষ করে ছোট শহরের সেই সব মেয়েদের কাছে, যারা সীমিত সম্পদ নিয়েও বড় স্বপ্ন দেখতে চায়। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, স্বপ্ন পূরণের পথে ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা সামাজিক প্রত্যাশা কখনও চূড়ান্ত বাধা হতে পারে না। দৃঢ় সংকল্প, কঠোর পরিশ্রম এবং সাহস থাকলে সবচেয়ে কঠিন বাধাও সাফল্যের সোপানে পরিণত হয়।
 
আজমেরের এক সাধারণ মেয়ে থেকে সার্জেনিক্স হেলথকেয়ারের সিইও হয়ে ওঠার মাধ্যমে ফিরদৌস খান দেখিয়ে দিয়েছেন, অসাধারণ পরিবর্তন আনতে অসাধারণ সম্পদের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন অসাধারণ দৃঢ় সংকল্পের। তাঁর জীবন আজও অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।


শেহতীয়া খবৰ