রাজীব নারায়ণ
শুল্ক, ভিসা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ এবং ভূ-রাজনৈতিক চাপের মতো নানা প্রতিকূলতা সহ্য করেছে ভারত। কিন্তু দেশের বিশাল বাজার, দক্ষ জনশক্তি এবং শিল্পক্ষেত্রের সক্ষমতা এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লির সামনে এখন আরও ন্যায্য অংশীদারত্বের দাবি জানানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এমন এক অংশীদারত্ব, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং নাগরিকদের জন্য আরও উন্নত সুযোগ তৈরি করবে।
একটি সুসম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত অংশীদারত্ব, কখনওই একতরফা সম্পর্ক নয়। অভিন্ন স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ভারত ও আমেরিকা কয়েক দশক ধরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক মাস আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের মধ্যেও অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকতে পারে।
ফেব্রুয়ারিতে প্রথম ঘোষিত বাণিজ্যচুক্তিটি দুই দেশের সম্পর্কে নতুন গতি সঞ্চার করেছিল। আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করতে সম্মত হয়েছিল। অন্যদিকে, ভারত তার বাজার আরও উন্মুক্ত করার পাশাপাশি আমেরিকার কাছ থেকে জ্বালানি ও প্রযুক্তি কেনার পরিমাণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে বাজারে প্রবেশাধিকার-সহ একাধিক বিষয়ে মতপার্থক্য থাকায় আলোচনা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
ভারতের সামনে প্রশ্নটি আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত কি না, তা নয়; বরং কীভাবে সেই সম্পর্ক থেকে পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, সেটাই আসল বিষয়। ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ এবং দ্রুত সম্প্রসারিত ভোক্তা বাজার হিসেবে ভারতের এমন কোনও কারণ নেই যে, তাকে আলোচনার টেবিলে নিজেকে সামান্য শক্তির অধিকারী দেশ হিসেবে তুলে ধরতে হবে। অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দেশের বৈধ জাতীয় স্বার্থকেও সম্মান জানাতে হবে। নীতিটি অত্যন্ত সহজ, একটি স্থায়ী অংশীদারত্বে উভয় পক্ষের স্বার্থের স্বীকৃতি থাকা প্রয়োজন।
ভারতের হাতে ইতিমধ্যেই রয়েছে দর-কষাকষির শক্তি
বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশগুলির মধ্যে ভারত অন্যতম। তবে একই সঙ্গে দেশটি একটি বড় তেল পরিশোধনকারী শক্তিও। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের জামনগর কমপ্লেক্স বিশ্বের বৃহত্তম তেল পরিশোধন কেন্দ্রগুলির অন্যতম। বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে এই কেন্দ্রের। বিশেষ করে জ্বালানির দামে যখন অস্থিরতা দেখা যায়, তখন এই সক্ষমতার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। সম্প্রতি আমেরিকার বিদেশ সচিব মার্কো রুবিওর মুম্বই ও জামনগর সফর এবং সেখানে ভারতীয় আধিকারিক ও ব্যবসায়িক নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর আলোচনা জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের আগ্রহকেই তুলে ধরেছে।
ভারতের তেল পরিশোধন সংক্রান্ত দক্ষতা, পরিকাঠামো এবং ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল-সহ নানা উৎস থেকে তেল সংগ্রহের সুযোগ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। এগুলি যেমন দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করে, তেমনই আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই সক্ষমতার বিনিময়ে ভারতের বাস্তব সুবিধা পাওয়া উচিত। যেমন, জ্বালানি বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা, তেল সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা এবং ভারতের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তাকে সম্মান জানিয়ে চুক্তি সম্পাদন।
এই একই যুক্তি পেট্রোলিয়াম ক্ষেত্রের বাইরেও প্রযোজ্য। ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা, ওষুধ শিল্প, উৎপাদন ক্ষেত্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং দক্ষ কর্মীবাহিনী আমেরিকার ব্যবসায়িক সংস্থাগুলির জন্য যথেষ্ট মূল্যবান। এই সম্পর্কের প্রতিফলন হওয়া উচিত ভারতের সেই অবদানের ভিত্তিতে। ভারতকে শুধুমাত্র আমেরিকার পণ্য বিক্রির বাজার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
ভারতীয় প্রতিভার প্রয়োজন আমেরিকারও
তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের মতো পারস্পরিক নির্ভরশীলতার উদাহরণ খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়। ভারতীয় সংস্থাগুলি আমেরিকার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির নির্ভরশীল ডিজিটাল পরিকাঠামু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারতীয় পেশাদাররা গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোগপতি হিসেবে অবদান রাখছেন। একই সঙ্গে আমেরিকার সংস্থাগুলিও ভারতের দক্ষ জনশক্তি থেকে উপকৃত হচ্ছে। কিন্তু এইচ-১বি ভিসার নিয়মকানুন কঠোর হওয়া এবং খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ২০২৭ অর্থবর্ষের জন্য আমেরিকার এইচ-১বি ভিসার যোগ্য আবেদনকারীদের নিবন্ধনের সংখ্যা আগের বছরের ৩,৪৩,৯৮১ থেকে ৩৮.৫ শতাংশ কমে ২,১১,৬০০-তে নেমে এসেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলি বিদেশে কর্মী নিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি ভারত এবং অন্যান্য দেশে নিজেদের ডেলিভারি সেন্টারের মাধ্যমে আরও বেশি কাজ পরিচালনার পথে এগিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় সংস্থাগুলির এই মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা নতুন সম্ভাবনাকে আড়াল করতে পারে না। ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বাধীনতা ভারতীয় পেশাদারদের পাশাপাশি আমেরিকার নিয়োগকর্তাদেরও উপকারে আসবে। ভারতের উচিত আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য ভিসা ব্যবস্থার দাবি জানানোর পাশাপাশি উন্নত কম্পিউটিং প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো। পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত হলে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ গবেষণার বিষয়গুলিও অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
নতুন সম্ভাবনার ভূগোল
বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ ভারতের সামনে আরও একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশ এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আমেরিকায় বিদ্যুতের ব্যবহার, জলের চাহিদা, জমির ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় কোথায় এই কেন্দ্রগুলি গড়ে তোলা হবে, তা নিয়ে বিতর্কও তীব্র হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের রয়েছে বিশাল ডিজিটাল অর্থনীতি, দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ পরিকাঠামো এবং কম্পিউটিং পরিষেবার বাড়তে থাকা চাহিদা। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ফলে কর্মসংস্থান তৈরি, উদ্ভাবনের প্রসার এবং দেশের পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তবে এই প্রবৃদ্ধি হতে হবে দায়িত্বশীল। ডেটা সেন্টারগুলিতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও জলের প্রয়োজন হয়। নতুন পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, কৃষিকাজ কিংবা পরিবেশের স্থায়িত্বকে কোনওভাবেই উপেক্ষা করা চলবে না। ভারতের উচিত এমন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, যা স্থানীয় কর্মসংস্থান, পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও জল সাশ্রয়ী শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সুফল দেবে। একই সঙ্গে এই পরিকাঠামোকে শুধু আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের জন্য নয়, ভারতীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকদের প্রয়োজনেও কাজে লাগাতে হবে।
বদলে যাচ্ছে সমীকরণ
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এনেছে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে। এর ফলে রিপাবলিকানদের একক নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটেছে এবং দেশটিতে বিভক্ত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাণিজ্য ও বিদেশনীতি ক্ষেত্রে এর প্রভাব এখনও অনিশ্চিত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে এবং ভারতের প্রতি আমেরিকার নীতিতে নমনীয়তা আসবে, এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে নির্বাচনের ফলাফল আকস্মিক নীতিগত পরিবর্তনগুলির ওপর আরও বেশি নজরদারির পরিবেশ তৈরি করতে পারে এবং আরও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ করে দিতে পারে।
শেয়ার বাজারেও এর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম কমা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন করে বিনিয়োগের ফলে ভারতের শেয়ার বাজারের সূচকগুলি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এই উত্থান থেকে বোঝা যায়, ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সমস্ত অনিশ্চয়তা দূর হয়ে গিয়েছে। তা সত্ত্বেও বর্তমান পরিস্থিতি সতর্ক আশাবাদের একটি সময়োপযোগী কারণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের প্রাপ্য কী?
ভারতের উচিত নয় বৈরিতা কিংবা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসা। বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আলোচনায় এগোনো উচিত। একটি ন্যায্য বাণিজ্যচুক্তি, জ্বালানি সংগ্রহের ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বাধীনতা, দক্ষ পেশাদারদের জন্য উন্নত ভিসা ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার আরও গভীরতা, এগুলি এমন একটি দেশের যুক্তিসংগত দাবি, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই লক্ষ্যগুলি অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।
ভারতের অগ্রগতিও নির্ভর করছে বৃহৎ শক্তিগুলির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি কোনও একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়ার ওপর। বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করতে হবে এবং দেশের শক্তিগুলিকে সাধারণ মানুষের উন্নত জীবনের সুযোগে রূপান্তরিত করতে হবে। কোটি কোটি ভারতীয়ের কাছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অর্থ হওয়া উচিত উন্নত কর্মসংস্থান, বেশি আয় এবং আরও শক্তিশালী জনপরিষেবা। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজন দম্ভ কিংবা দ্বিধা নয়, বরং বুদ্ধিদীপ্ত কূটনীতি, সুচিন্তিত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ভারতের নিজস্ব সক্ষমতার ওপর আস্থা।
দীপাবলি উদ্যাপনের এই সময়ে আলোর উৎসবটি একটি যথার্থ উপমা হয়ে উঠতে পারে। ভারত কঠিন সময় এবং নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছে। সামনের পথ এখনও অনিশ্চিত, তবে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর যথেষ্ট কারণ দেশের রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন যাতে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বগুলিতে ঘটে, সেই দাবিও জোরালোভাবে জানানো প্রয়োজন।
(লেখক একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক এবং যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।)