বাংলার নির্বাচনে আসল লড়াই কোথায়? বড় পরিচয়ের আড়ালে ছোট সমীকরণের রাজনীতি

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 d ago
বাংলার নির্বাচনে আসল লড়াই কোথায়? বড় পরিচয়ের আড়ালে ছোট সমীকরণের রাজনীতি
বাংলার নির্বাচনে আসল লড়াই কোথায়? বড় পরিচয়ের আড়ালে ছোট সমীকরণের রাজনীতি
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে যে চিত্রটি সামনে আনা হচ্ছে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল এক সমীকরণ কাজ করছে। “বাঙালিয়ানা বনাম হিন্দুত্ব”—এই দ্বন্দ্বকে সামনে রেখে প্রচার চালালেও, ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিতে পারে ছোট ছোট সংগঠিত সম্প্রদায়ভিত্তিক ভোটব্যাঙ্ক।রাজ্যের প্রধান দুই শক্তি—মমতা ব্যানার্জি-র নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং নরেন্দ্র মোদী-র নেতৃত্বাধীন বিজেপি—দু’পক্ষই নিজেদের মতো করে পরিচয় রাজনীতি সামনে আনছে। একদিকে “জয় বাংলা”, অন্যদিকে “জয় শ্রী রাম”—এই স্লোগানের সংঘর্ষে বড় পরিচয়ের লড়াই চোখে পড়লেও, ভিতরে ভিতরে নির্ধারক হয়ে উঠছে আঞ্চলিক ও জাতিগত দাবিদাওয়া।

জঙ্গলমহলের ৪০টি আসনে সাঁওতাল-সহ আদিবাসী এবং কুড়মি সম্প্রদায়ের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।সাঁওতালদের প্রধান দাবি—সারিধরমের স্বীকৃতি এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার উন্নতি। তাদের অভিযোগ, বন-সম্পর্কিত ঐতিহ্য ও অধিকার উপেক্ষিত হচ্ছে।অন্যদিকে কুড়মি সম্প্রদায়ের ক্ষোভ রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে তফসিলি উপজাতি (ST) মর্যাদা না পাওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ। ফলে এই অঞ্চলে ভোটের মেরুকরণে বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে।

উত্তরবঙ্গের প্রায় ৩০টি আসনে রাজবংশী ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথক রাজ্যের দাবি এবং ভাষাগত স্বীকৃতি—এই দুই ইস্যুতে রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে।অন্যদিকে দার্জিলিং পাহাড়ে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন এখনও বড় ফ্যাক্টর। এখানে দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির প্রভাব শক্তিশালী, এবং সেই ধারা বজায় থাকার ইঙ্গিত মিলছে।
মধ্যবিত্ত কৃষক ও তফসিলি জাতির সমীকরণও একটি বড় ফ্যাক্টর।
 
গোপ, সদগোপ, মহিষ্য—এই কৃষিভিত্তিক সম্প্রদায়গুলি মিলিয়ে রাজ্যের প্রায় ১৫ শতাংশ জনসংখ্যা। আগে রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব কম থাকলেও, এখন তারা গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাঙ্কে পরিণত হয়েছে।এছাড়া বাগদি সম্প্রদায়—যারা ১৬টি আসনে প্রভাবশালী—এই নির্বাচনে বড় ভূমিকা নিতে পারে। গত লোকসভা নির্বাচনে তাদের একটি বড় অংশ তৃণমূলের দিকে ঝুঁকেছিল, তবে এবার লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হওয়ার সম্ভাবনা।

দ্বিতীয় দফার ভোটে নজর থাকবে মতুয়া সম্প্রদায়ের দিকে, যারা ২১টি আসনে নির্ণায়ক।নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA)-এর প্রতিশ্রুতিতে বিজেপির দিকে ঝুঁকলেও, সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা সংশোধনে বহু নাম বাদ পড়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।এই অনিশ্চয়তা ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।পরিচয় রাজনীতির নতুন সমীকরণ বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ২০১৩ সালের পর থেকেই পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি নতুন মাত্রা পায়। বিভিন্ন জাতিগত ও পেশাভিত্তিক গোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে তৃণমূল এই ভোটব্যাঙ্ককে আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছে।অন্যদিকে বিজেপি বৃহত্তর হিন্দু পরিচয়ের ভিত্তিতে ভোট একত্রিত করার কৌশল নিয়েছে।

সব মিলিয়ে, বাংলার এই নির্বাচন কেবল বড় আদর্শগত লড়াই নয়। বরং বহু ছোট ছোট পরিচয়, দাবি ও অসন্তোষের জটিল সমীকরণই নির্ধারণ করবে চূড়ান্ত ফলাফল।
প্রথম দফার ভোটের পর এবার সারা পশ্চিমবঙ্গের নজর দ্বিতীয় দফার ভোটের দিকে। সুতরাং বৃহৎ সংখ্যক  আসনের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করেছে এই আঞ্চলিক ও জাতিগত ভোটব্যাঙ্কের ওপর। এখন দেখার, কোন রাজনৈতিক দল এই সূক্ষ্ম সমীকরণ সবচেয়ে ভালোভাবে সামলাতে পারে।