রবীন্দ্রসংগীত থেকে বাউলে বৈশাখের সুরে এক বাংলা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 3 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
অপর্ণা দাস / গুয়াহাটি

ভোরের নরম আলো, কানে ভেসে আসছে, “এসো হে বৈশাখ”। ঠিক সেই মুহূর্তেই কোথাও দূরে এক বাউলের কণ্ঠে ধরা পড়ছে জীবনের সহজ দর্শন। দুই ভিন্ন ধারার এই সুর যেন একসূত্রে বেঁধে দেয় সমগ্র বাঙালিকে-ধর্ম, অঞ্চল, বিভাজন ভুলে। পয়লা বৈশাখের এই সুরই আসলে বাঙালির প্রকৃত পরিচয়, একতার, মানবতার আর সংস্কৃতির।
 
পয়লা বৈশাখ মানেই নতুন সূচনা, নতুন ক্যালেন্ডার, নতুন আশা। তবে এই উৎসবের গভীরে রয়েছে এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যার অন্যতম স্তম্ভ সঙ্গীত। সকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্ট রবীন্দ্রসংগীত দিয়ে যেমন দিন শুরু হয়, তেমনি দিনের বিভিন্ন সময়ে মেলা, পথসভা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাউলদের গান সেই আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
 
পয়লা বৈশাখে সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রার একটি দৃশ্য (ফাইল)
 
পয়লা বৈশাখের সূচনা যেন অসম্পূর্ণ থাকে যদি না শোনা যায়, “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো” এই গান শুধু একটি সুর নয়, এটি এক গভীর দর্শন। এখানে বৈশাখকে আহ্বান জানানো হয় যেন সে তার তাপ ও শক্তি দিয়ে পুরোনো ক্লান্তি, গ্লানি ও অশুভ সবকিছুকে দূর করে দেয়। “যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গান”- যার অর্থ পুরোনো দুঃখ, কষ্ট ও ব্যর্থতাকে ভুলে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। 
 
“মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা”, এই লাইনগুলো নতুন বছরের মূল বার্তাকেই তুলে ধরে, পুরোনোকে বিদায়, নতুনকে বরণ। শহরের সাংস্কৃতিক মঞ্চ হোক বা গ্রামবাংলার প্রভাতফেরি, রবীন্দ্রসংগীতের এই সুর বাঙালির মনে নবজীবনের আশা জাগিয়ে তোলে।
 
পয়লা বৈশাখের সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রায় রবীন্দ্র সংগীত ও রবীন্দ্র নৃত্য পরিবেশনের দৃশ্য (ফাইল)
 
অন্যদিকে, পয়লা বৈশাখের মেলা ও উৎসবে শোনা যায় বাউলদের গান, যা আরও এক ভিন্ন অথচ গভীর অনুভূতির জন্ম দেয়। লালন ফকিরের বিখ্যাত গান, “সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে”- এই গানে তিনি প্রশ্ন তোলেন মানুষের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে। আবার,“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”, এই বাউল দর্শন শেখায় যে মানবপ্রেমই জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার এই বার্তা পয়লা বৈশাখের ভাবনার সঙ্গে একেবারে মিলে যায়। 
 
পাগল কানাইয়ের গান “আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে”, শাহ আবদুল করিমের “গাড়ি চলে না, চলে না” এবং হাসান রাজার “লোকে বলে বলরে, ঘরবাড়ি ভালো না আমার”,এই সব বাউল গানে মানুষের অন্তর্দৃষ্টি, আত্মার খোঁজ এবং পার্থিব জীবনের প্রতি এক ধরনের অনাসক্তির প্রকাশ ফুটে ওঠে। আর নববর্ষের প্রেক্ষাপটে এই ভাবনাই এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়, বাইরের জাঁকজমকের চেয়ে ভেতরের শান্তিই আসল। একতারা, দোতারা আর খোলের সুরে বাউলরা বারবার মনে করিয়ে দেন, মানুষের ভেতরেই ঈশ্বরের বাস।
 
বাউলের একটি দলের ছবি (ফাইল)
 
রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির আত্মার এক গভীর প্রকাশ, যেখানে প্রকৃতি, মানবতা ও দর্শনের মেলবন্ধন ঘটে। অন্যদিকে, বাউল গান মাটির কাছাকাছি, এখানে জটিলতা নেই, আছে সহজ ভাষায় জীবনের বড় সত্য। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এই দুই ধারার সঙ্গীতই ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে।
 
বাউলদের মধ্যে যেমন হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের শিল্পী রয়েছেন, তেমনি রবীন্দ্রসংগীতও সব বাঙালির কাছে সমানভাবে প্রিয়। ফলে পয়লা বৈশাখ হয়ে ওঠে এমন এক দিন, যেখানে সংস্কৃতি হয়ে ওঠে মিলনের সেতু।
 
পয়লা বৈশাখের একটি অনুষ্ঠানে বাউল সঙ্গীত পরিবেশনের দৃশ্য (ফাইল)
 
রবীন্দ্রসংগীত যেখানে শৃঙ্খলিত কাব্য ও দার্শনিক ভাবনার প্রতিফলন, বাউল গান সেখানে মুক্তচিন্তা ও আত্মঅন্বেষণের প্রতীক। কিন্তু দুই ধারার মূল কথা এক, মানুষ ও মানবতার জয়। পয়লা বৈশাখে এই দুই সুর একসাথে মিলিত হয়ে তৈরি করে এমন এক সাংস্কৃতিক আবহ, যেখানে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব বাঙালি একসাথে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়।
 

তাই শেষ পর্যন্ত বলা যায়, পয়লা বৈশাখ কেবল নতুন বছরের সূচনা নয়, এটি বাঙালির আত্মার উৎসব। এখানে ধর্ম নয়, সংস্কৃতিই মুখ্য। আর সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ ঘটে,  রবীন্দ্রসংগীত থেকে বাউলের সুরে। যেখানে সব সুরই শেষ পর্যন্ত মিশে যায় একটাই কথায়,“মানুষ হও, মানবতাকে ভালোবাসো।” এখানেই লুকিয়ে আছে সত্যিকারের শান্তি ও নতুন বছরের অর্থ।