শাহ তাজ খান (পুনে)
ভারতীয় সাংবাদিকতার জগতে সীমা মুস্তাফা এমন এক নাম, যিনি সাহসী অবস্থান, স্পষ্টভাষী মতামত এবং স্বাধীন চিন্তার জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিশেষভাবে পরিচিত। “দ্য লোনলি প্রফেট: ভি.পি. সিং” (The Lonely Prophet: VP Singh), “আজাদির ডটার” (Azadi's daughter), “শাহিন বাগ অ্যান্ড দ্য আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া” (Shaheen Bagh and the Idea of India)-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের লেখিকা সীমা মুস্তাফার জন্ম ২০ এপ্রিল ১৯৫৫ সালে দিল্লিতে। লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করার পর মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি লখনউয়ের সংবাদপত্র দ্য পাইওনিয়ার (The pioneer)-এ সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন।
স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে
২০১৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম দ্য সিটিজেন। বর্তমানে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রসার এবং নারীদের কণ্ঠস্বরকে সামনে আনার কাজে তিনি বিশেষভাবে সক্রিয়। ইউটিউবে তাঁর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান “উইমেন অনলি... সীমা মুস্তাফা” (Women only.. Seema Mustafa) ইতিমধ্যেই দর্শকদের মধ্যে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে।
এই অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য সমাজ, রাজনীতি, শিল্প, শিক্ষা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রাখা নারীদের সংগ্রাম ও সাফল্যের কাহিনি তুলে ধরা। প্রচলিত সাক্ষাৎকারের বদলে তিনি আলাপচারিতার ভঙ্গিতে অতিথিদের সঙ্গে কথা বলেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সংগ্রামের পথ এবং সাফল্যের গল্প উঠে আসে সেই আলোচনায়। সমাজকর্মী, লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, রাজনীতিবিদসহ নানা ক্ষেত্রের নারীরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। বিশেষ করে সমাজের তৃণমূল স্তরে পরিবর্তন আনতে কাজ করা নারীদের তিনি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন।
রিপোর্টিংয়ের অসাধারণ দক্ষতা
চার দশকেরও বেশি দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে সীমা মুস্তাফা বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। তিনি বৈরুত যুদ্ধ কভার করেছেন। কার্গিল যুদ্ধের সময়ও তিনি সম্মুখসারিতে থেকে রিপোর্টিং করেন। সেই সাহসী সাংবাদিকতার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৯ সালে তিনি প্রেম ভাটিয়া পুরস্কার পান।
"দ্য পয়েনার" (The pioneer) দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি দ্য প্যাট্রিয়ট (The patriot), দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (The Indian Express), দ্য টেলিগ্রাফ (The Telegraph), দ্য এশিয়ান এজ (The asian age), নিউজএক্স (NewsX), দ্য সানডে গার্ডিয়ান (The sunday guardian)-সহ বহু নামী সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। এছাড়াও তিনি দ্য ইকোনমিক টাইমস (The Economic Times)-এও কর্মরত ছিলেন। তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে বেঙ্গালুরুর ডেকান ক্রনিকল (Deccan Chronicle) এবং পাকিস্তানের ডন পত্রিকায়। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত দ্য সিটিজেন (The Citizen)-এর তিনি প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
নেতৃত্বের ভূমিকায়
এডিটরস গিল্ড অফ ইন্ডিয়া-তেও সীমা মুস্তাফার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ২০২০ সালে তিনি সংগঠনটির প্রথম নির্বাচিত সভাপতি হন। এর আগে সাধারণত ঐকমত্যের ভিত্তিতে সভাপতি নির্বাচিত হতেন। ২০২২ সালের অক্টোবরে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারও এক বছরের জন্য সভাপতি নির্বাচিত হন।
একইসঙ্গে তিনি সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালিসিস (CPA)-এর পরিচালক হিসেবেও কাজ করছেন। স্বাধীন ইউটিউব চ্যানেল ও বিভিন্ন ওয়েব প্ল্যাটফর্মে আজও তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রেখেছেন।
বইয়ে রাজনীতি, সমাজ ও স্মৃতি
সীমা মুস্তাফার রচনায় উঠে এসেছে রাজনীতি, সমাজ, পরিবার ও সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা। তাঁর স্মৃতিকথা “আজাদির ডটার” ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়, যেখানে উদার মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। “দ্য লোনলি প্রফেট: ভি.পি. সিং” বইটিতে তিনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ভি.পি. সিং-এর ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং বহু অজানা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। ২০২০ সালে প্রকাশিত “শাহিন বাগ অ্যান্ড দ্য আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া” বইটিতে বিভিন্ন লেখকের মতামত ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে শাহিন বাগ আন্দোলনের দলিল সংরক্ষিত হয়েছে।
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “দ্য স্ক্যাম: দ্য কভার-আপ অ্যান্ড কম্প্রোমাইজ” (১৯৯৫) (The Scam: The cover-up and compromise) এবং “জার্নালিজম: এথিক্স অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটিজ” (২০১৩) (Journalism: Ethics and Responsibilities)।
সীমা মুস্তাফা
স্পষ্টভাষী সমালোচক
সীমা মুস্তাফার মতে, “সাংবাদিকতার কাজ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, তাকে তোষামোদ করা নয়।” ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে তাঁর অভিযোগ, তারা এখন আর “ওয়াচডগ” নয়, বরং “চিয়ারলিডার”-এ পরিণত হয়েছে।গণতন্ত্র নিয়ে তাঁর বক্তব্য, শুধু ভোট দেওয়াই যথেষ্ট নয়; ভিন্নমতকে সহ্য করাও গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ।
তরুণ সাংবাদিকদের তিনি মাঠে নেমে রিপোর্টিং করতে উৎসাহ দেন, শুধুমাত্র স্টুডিও বা অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ না থাকতে বলেন। বর্তমানে তিনি দ্য সিটিজেন ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ভারতীয় রাজনীতি, সমাজ ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে সম্পাদকীয় এবং বিশ্লেষণধর্মী লেখা লিখে চলেছেন।
এক অনন্য উত্তরাধিকার
লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ মুস্তাফার নাতনি, বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও রাজ্যসভার সদস্য আনিস কিদওয়াইয়ের দৌহিত্রী এবং রাফিয়া মুস্তাফার কন্যা সীমা মুস্তাফা এক শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশে বড় হয়ে ওঠেন।প্রায় অর্ধশতাব্দীর সাংবাদিকতা জীবনে তিনি সাহস, সততা ও নির্ভীকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের অজানা গল্প, বিশেষ করে নারীদের কণ্ঠস্বর, তিনি আজও সামনে নিয়ে আসছেন।
যুদ্ধক্ষেত্রের রিপোর্টিং হোক কিংবা শাহিন বাগের প্রতিবাদের কণ্ঠ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সীমা মুস্তাফা দেখিয়েছেন, সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি সত্য ও দায়বদ্ধতার এক আজীবন মিশন।