ইয়ানা মীর: কাশ্মীরের সাহসী কণ্ঠ, পাকিস্তানি প্রচারের বিরুদ্ধে একাই লড়াই
Story by Aasha Khosa | Posted by Aparna Das • 1 d ago
ইয়ানা মীর
আশা খোসা
পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং দীর্ঘ অস্থিরতার ইতিহাসে কাশ্মীর বহু বছর ধরে ক্ষতবিক্ষত। এই জটিল বাস্তবতার মাঝেই উপত্যকার ভেতর থেকে সাহসী কণ্ঠে প্রচলিত বহু বয়ানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন সাংবাদিক ইয়ানা মীর। যদি এমন একজন কাশ্মীরি মুখের কথা বলা হয়, যিনি পাকিস্তানের সন্ত্রাস-সমর্থক প্রচারযন্ত্রকে অস্বস্তিতে ফেলেছেন, তবে তিনি ইয়ানা মীর। কাশ্মীরে জন্ম, মুম্বইয়ে শিক্ষিত এই সাংবাদিক, মিডিয়া উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী ২০২০ সালে কাশ্মীরে ফিরে এসে এক স্বতন্ত্র পথ গড়ে তুলেছেন।
আমি প্রথম তাঁকে লক্ষ্য করি মধ্য কাশ্মীরের এক গ্রামে সন্ত্রাসবাদীদের হাতে নিহত এক পুলিশকর্মীর পরিবার নিয়ে করা একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে। যা আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল, তা শুধু ট্র্যাজেডি নয়, বরং পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর আত্মত্যাগ স্বীকারে অনীহা।
সাংবাদিক ইয়ানা মীর
“তারা তাঁর আত্মত্যাগকে স্বীকার করতে চাইছিল না। মনে হচ্ছিল যেন শহীদ ব্যক্তি কোনো ভুল কাজ করেছিলেন। পরিবার জোর দিচ্ছিল, তাঁর স্ত্রী যেন আমার সঙ্গে কথা না বলেন,” স্মৃতিচারণ করেন ইয়ানা।
বাধার মুখেও তিনি পিছিয়ে যাননি। শেষ পর্যন্ত তিনি সেই বিধবার সঙ্গে কথা বলেন, যিনি এই ঘটনার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ছিলেন। সেই পুলিশকর্মীকে সন্ধ্যার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বাড়ি ফেরার পথে অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসবাদীরা গুলি করে হত্যা করেছিল।
ইয়ানা ছিলেন কাশ্মীরভিত্তিক প্রথম সাংবাদিকদের একজন, যিনি একজন শহীদের বিধবার কণ্ঠকে সামনে নিয়ে আসেন। তাঁর প্রতিবেদনে উঠে আসে, কীভাবে বছরের পর বছর প্রচারণা ও ভয়ভীতি মানুষের মনস্তত্ত্বকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে, অনেক কাশ্মীরি এখনও সন্ত্রাসবাদী ও শহীদের মধ্যে পার্থক্য করতে দ্বিধায় ভোগেন। এ ধরনের গল্প অন্যত্র সাধারণ হলেও, সেই সময় কাশ্মীরে তা প্রায় নিষিদ্ধ বিষয় ছিল।
উপমহাদেশজুড়ে তাঁর কাজ আরও বেশি পরিচিতি পায়, যখন ঈদের আগে তিনি পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের (পিওকে) এক ভ্লগারের সঙ্গে যৌথ সম্প্রচার করেন। তিনি শ্রীনগরের বাজার থেকে সবজি, মাংস, রান্নার তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম দেখাচ্ছিলেন, আর ওপারে ভ্লগারও একই কাজ করছিলেন।
ইয়ানা মীর আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছেন
তফাৎ ছিল স্পষ্ট। পিওকের শহরগুলোতে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল, যা দেখে ওই ভ্লগারও বিস্মিত হন। ভিডিওটি কাশ্মীরের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং ভাইরাল হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। “সেই প্রথম আমার ভিডিও এত বড় পরিসরে পৌঁছেছিল,” বলেন ইয়ানা।
ইয়ানার নিজের জীবনযাত্রাও বাস্তুচ্যুতির অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত। দক্ষিণ কাশ্মীরের অনন্তনাগে তাঁদের আদি বাড়ি ছিল। ১৯৯০-এর অস্থির সময়ে তাঁদের পরিবারও হাজার হাজার মানুষের মতো স্থানান্তরিত হয়। “আমার বাবা-মা মুম্বইয়ে নতুন করে জীবন গড়তে কঠোর সংগ্রাম করেছেন,” বলেন তিনি।
মুম্বইতেই তিনি পড়াশোনা শেষ করেন এবং এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে একটি বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করছিলেন, কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির কারণে তাঁর কর্মজীবনে বিঘ্ন ঘটে। “কাশ্মীরের বন্ধুরা বলেছিল ফিরে এসে পরিবর্তনের অংশ হতে,” তিনি জানান।
তাঁর ফিরে আসার সময়টি ছিল ঐতিহাসিক, অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলুপ্তির পরবর্তী সময়। ইয়ানা ও তাঁর মতো অনেকের কাছে এটি ছিল এক নতুন সংযুক্তি ও সম্ভাবনার সূচনা। “সময়টা ছিল রোমাঞ্চকর। আমি সেই পরিবর্তনের অংশ হতে চেয়েছিলাম,” বলেন তিনি।
কাশ্মীরে ফিরে তিনি রিয়েল কাশ্মীর পোর্টালে যোগ দেন এবং সামাজিক মাধ্যমে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সেখানে তিনি অঞ্চলের পরিবর্তনের নানা দিক তুলে ধরতে থাকেন। তবে পথটি মোটেও সহজ ছিল না। আমাদের প্রতিবেদনের জন্য একের পর এক আইনি নোটিস ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। কাশ্মীরের প্রকৃত গল্প যাতে বাইরে না আসে, তার জন্য চাপ ছিল,” বলেন ইয়ানা। বর্তমানে তিনি দ্য রিয়েল কাশ্মীর (টিআরকে) গ্রুপের সিইও, যারা একটি নিউজ চ্যানেল, দৈনিক সংবাদপত্র এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করে।
ইয়ানা মীর কাশ্মীরের নারী কারুশিল্পীদের সঙ্গে একান্ত আলোচনায়
নিজের পরিচয়কে নির্ভয়ে তুলে ধরা তাঁর জনপরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর ফলেই তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পান। ২০২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তাঁকে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়, যেখানে মালালা ইউসুফজাইয়ের সঙ্গে তুলনা প্রত্যাখ্যান করে তিনি শিরোনামে আসেন।
“আমি মালালা নই। দয়া করে আমার সঙ্গে তাঁর তুলনা করবেন না,” তিনি বলেন, যা উপস্থিত অনেককেই বিস্মিত করে। তিনি আরও বলেন, “মালালার বিপরীতে আমি আমার নিজের জন্মভূমিতেই বাস করছি। আমি কোনো হুমকির মুখে নই। আমি আমার দেশে নিরাপদ অনুভব করি।”
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি কাশ্মীরে থাকি, আমার দেশ ভারতবর্ষে স্বাধীন ও নিরাপদ। আমাকে কখনও অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে হবে না। ধর্মের ভিত্তিতে ভারতীয়দের বিভক্ত করা বন্ধ করুন।” ইয়ানা বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্ল্যাটফর্মে এবং টেডএক্সেও বক্তৃতা দিয়েছেন।
সাংবাদিকতার বাইরেও ইয়ানা কাশ্মীরের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর বিশ্বাস, এই অঞ্চলকে শিল্প ও উদ্যোগের কেন্দ্রে পরিণত হতে হবে। “আমি প্রশিক্ষিত ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার, কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম বড় শিল্পের অভাবে সেই দক্ষতার এখানে খুব বেশি প্রয়োগ নেই,” তিনি বলেন।
অবদান রাখার লক্ষ্যেই তিনি ‘নূরজুও’ নামে একটি ছোট উদ্যোগ শুরু করেন, যেখানে স্থানীয় উল ও রেশম দিয়ে ঐতিহ্যবাহী ফেরান তৈরি হয় এবং কাশ্মীরি শিল্পীদের দিয়ে সূচিশিল্প ও নকশার কাজ করানো হয়। “অনেক ভারতীয় ফ্যাশনের অংশ হিসেবে পাকিস্তানি স্যুট কেনেন। আমি চাই তারা তার বদলে কাশ্মীরি স্যুট কিনুন, কারণ কাশ্মীর তো তাদেরই নিজের,” বলেন তিনি।
ইয়ানা বলেন, ‘রিয়েল কাশ্মীর’-এর প্রকৃত ছবি তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি কাশ্মীরে শক্তিশালী বেসরকারি ও কর্পোরেট ক্ষেত্র গড়ে তুলতে চান। “এটা জরুরি, কারণ শেষ পর্যন্ত স্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সহায়তাতেই মিডিয়া টিকে থাকতে পারে।”
ইয়ানা মীরের কাছে সাংবাদিকতা শুধু খবর পরিবেশন নয়, এটি হলো হারিয়ে যাওয়া বয়ান পুনরুদ্ধার করা, চাপা পড়া কণ্ঠকে সামনে আনা, এবং কাশ্মীরের বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা।