রঘু রায়: যাঁর ক্যামেরায় তাজমহল হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত অনুভূতি
মালিক আসগর হাশমি / নয়া দিল্লি
বিশ্ব যুগের পর যুগ তাজমহলকে নানা পরিচয়ে চিনেছে। কেউ বলেছেন প্রেমের স্মৃতিস্তম্ভ, কেউ বলেছেন সাদা মার্বেলের বিস্ময়। কিন্তু এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি তাজমহলকে শুধু দেখেননি, অনুভব করেছিলেন গভীরভাবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যেন তার সঙ্গে কথা বলেছেন, তার নীরবতা শুনেছেন, তার সৌন্দর্যকে নতুন ভাষা দিয়েছেন। সেই মানুষটি ছিলেন ভারতীয় আলোকচিত্র জগতের ‘ভীষ্ম পিতামহ’ রঘু রায়। তাঁর প্রয়াণের খবরে আজ আগ্রা থেকে আন্তর্জাতিক শিল্পমঞ্চ, সবখানেই নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
৮৩ বছর বয়সে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন এই মহান শিল্পী। কিন্তু তিনি রেখে গেলেন এমন কিছু ছবি, যা আজও যেন জীবন্ত কণ্ঠে বলে ওঠে, দৃষ্টি সবার থাকে, কিন্তু রঘু রায়ের মতো আত্মিক দৃষ্টি খুব কম মানুষই পান।
ক্যামেরা যখন হয়ে উঠেছিল অনুভূতির জানালা
রঘু রায়ের নাম শুনলেই প্রথমে মনে পড়ে ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার সেই হৃদয়বিদারক ছবি, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এক নিষ্পাপ শিশুর মুখ। মনে পড়ে মাদার টেরেসা কিংবা ইন্দিরা গান্ধীর এমন সব মুহূর্ত, যেগুলো তাঁর ক্যামেরার স্পর্শে ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছিল।
তবে তাঁর হৃদয়ের গভীরে বিশেষ জায়গা জুড়ে ছিল আগ্রার তাজমহল। সত্তর ও আশির দশকে তিনি তাজকে নিয়ে এমন সব ছবি তুলেছিলেন, যা আজও শিল্পসাধনার নিদর্শন বলে মানা হয়। তিনি তাজকে কখনও শুধু স্থাপত্য হিসেবে দেখেননি। কখনও এক কৃষকের গরুর গাড়ির আড়াল থেকে, কখনও যমুনার ধারে স্নানরত মহিষের পাশ দিয়ে, আবার কখনও ঘন কুয়াশায় মোড়া রহস্যের আবরণে তিনি তাজকে নতুনভাবে চিনিয়েছেন।
লেখক নির্মল ঘোষ তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করে পুরনো স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি জানান, রঘু রায়ের ছবি তাঁর মনে এমন গভীর ছাপ ফেলেছিল, যা কোনওদিন মুছে যাবে না। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ যখন তাঁর বিখ্যাত ছবিগুলো আবার ভাগ করে নেওয়া হয়, তখন পৃথিবী যেন আবারও প্রত্যক্ষ করল সেই জাদু, যা কেবল রঘু রায়ই সৃষ্টি করতে পারতেন।
বারো হাজার টাকার বই, অথচ অমূল্য তার দৃষ্টি
তাজমহলকে কেন্দ্র করে রঘু রায় ফ্রন্টলাইন পত্রিকার জন্য ‘দ্য তাজ’ নামে একটি বিশেষ আলোকচিত্র সিরিজ তৈরি করেছিলেন। পরে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত বই তাজমহল। বর্তমানে সেই বইয়ের মূল্য বাজারে ১২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লক্ষ পঁচিশ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায়। তাঁর বহু ছবি রঘু রায় ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটেও সংরক্ষিত রয়েছে। তবে এই ছবিগুলোর আসল মূল্য অর্থে নয়, ভাবনায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, তাজমহল শুধু একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়, এটি এক জীবন্ত অনুভব।
রঘু রায়ের ক্যামেরায় তাজমহলের ছবি
একবার আগ্রার তাজ লিটারেচার ফেস্টিভ্যালে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কি সবসময় ক্যামেরার লেন্স দিয়েই পৃথিবীকে দেখেন? নিজের স্বভাবসিদ্ধ অকপট ভঙ্গিতে তিনি বলেছিলেন, তিনি সবকিছু লেন্সের চোখে দেখতে ভালোবাসেন। এমনকি যদি ঈশ্বরও সামনে এসে দাঁড়ান, তবে প্রথম কাজ হবে তাঁকে ক্যামেরায় ধরে রাখা। কাজের প্রতি এই অসীম আবেগই তাঁকে বিশ্বসেরা আলোকচিত্রীদের সারিতে পৌঁছে দিয়েছিল।
আজম খানের মন্তব্যে তীব্র প্রতিবাদ
রঘু রায় শুধু ছবি তুলতেন না, নিজের মতও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতেন। ২০১৩ সালের একটি ঘটনা এখনও আগ্রার মানুষের মুখে মুখে ফেরে। সে সময় উত্তরপ্রদেশের নেতা আজম খান তাজমহলকে সরকারি অর্থের অপচয় বলে মন্তব্য করেছিলেন।
রঘু রায়ের 'তাজমহল' বই
এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে রঘু রায় আগ্রার এক সাংবাদিক বৈঠকে বলেছিলেন, আজম খানকে কয়েকদিন তাজমহলের ভেতরে বেঁধে রাখা উচিত। হয়তো তার সৌন্দর্য ও স্থাপত্য তখন তাঁকে বোঝাবে, তিনি কত বড় ভুল কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেন, এমন চিন্তাধারার জন্য লজ্জা পাওয়া উচিত।
অতল বিনয়, অনন্য শিক্ষাগুরু
আজকের দিনে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে অনেকেই নিজেকে আলোকচিত্রী বলে ভাবেন। কিন্তু রঘু রায় ছিলেন শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও শিল্পবোধের এক বিরল উদাহরণ। আগ্রার পেশাদার ফটোগ্রাফার অর্পণ ভার্গব জানান, এত বড় ব্যক্তিত্ব হয়েও তিনি নতুনদের সঙ্গে এমন সহজভাবে মিশতেন, যেন বহুদিনের পরিচিত। তরুণদের তিনি এমন সূক্ষ্ম শিক্ষা দিতেন, যা কোনও বড় প্রতিষ্ঠানে শেখানো যায় না। তিনি বলতেন, ছবি আঙুল দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে তোলা হয়।
আগ্রার উদ্যোক্তা হারবিজয় সিং বহিয়ার এখনও মনে আছে, গত বছরের অক্টোবরে নিজের বই লর্ডস অফ গির প্রকাশ উপলক্ষে রঘু রায়ের আগ্রায় আসার কথা ছিল। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে আটকে দেয়। সবাই ভেবেছিলেন, তিনি সুস্থ হয়ে আবার ফিরবেন। কিন্তু নির্মম ক্যানসার সেই আশাকে শেষ করে দেয়।
ইনস্টাগ্রামের একটি পোস্টে রঘু রায়ের তোলা তাজমহলের ছবি
তাজ তাঁকে চিরকাল মনে রাখবে
আজ রঘু রায় আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু যখন যমুনার তীরে কুয়াশা নামবে, যখন কোনও গরুর গাড়ি তাজের পাশ দিয়ে ধীরে চলে যাবে, কিংবা যখন সূর্যের প্রথম আলো তাজের শুভ্র গম্বুজ ছুঁয়ে দেবে, তখন তাঁর স্মৃতি আবার ফিরে আসবে।
তিনি তাজমহলকে শুধু ভ্রমণস্থল হিসেবে রাখেননি, এক আবেগে রূপান্তরিত করেছিলেন। রঘু রায়ের চলে যাওয়া ভারতীয় সাংবাদিকতা ও শিল্পমহলে এমন এক শূন্যতা তৈরি করল, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। আজ তাজমহলও হয়তো কিছুটা নিঃসঙ্গ, কারণ যে মানুষটি তাকে এত ভালোবেসেছিলেন, তিনি আজ চিরনিদ্রায় শায়িত।
বিদায় রঘু রায়। আপনি যে দৃষ্টি পৃথিবীকে উপহার দিয়ে গেলেন, তা চিরঅম্লান থাকবে। তাজ আপনাকে এবং আপনার সেই জাদুকরী চোখকে সারাজীবন মনে রাখবে।