রত্না জি চোত্রাণী
ফ্যাশনের ভিড়ে আলাদা পরিচয় গড়ে তুলতে শুধু পোশাক নয়, দরকার নতুন ভাবনা, আর সেই ভাবনাকেই সফল ব্র্যান্ডে রূপ দিয়েছেন নাহিদ মুকিতুল্লা। ব্যস্ত হায়দ্রাবাদের এক ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম নেওয়া নাহিদ মুকিতুল্লা ছোটবেলা থেকেই উদ্যোক্তা জীবনের আবহে বড় হয়েছেন। সেই পারিবারিক শিক্ষাকেই তিনি পরবর্তীকালে রূপ দেন একটি সফল ফ্যাশন ব্র্যান্ডে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ‘আর্বানো’ (Urbano) আজ ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় অনলাইন ডেনিম লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড। এই সাফল্যের যাত্রায় তাঁর সঙ্গে রয়েছেন ভাইয়েরা, যাঁরা পারিবারিক সম্পর্ককে উদ্যোক্তা অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত করেছেন। পাশাপাশি, নেপথ্যে থেকে ব্যবসার পরিচালনা, কৌশল নির্ধারণ ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তাঁর স্বামী সমীর মাসরাথ। নাহিদ যখন ব্র্যান্ডের নকশা ও সৃজনশীল ভাবনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন সমীর নিশ্চিত করছেন ব্যবসার সুসংহত বিকাশ।
ভারতের খ্যাতনামা কুট্যুর কর্মশালাগুলি যেখানে দক্ষ কারিগরদের দখলে, সেখানে নাহিদ ও তাঁর ভাইয়েরা ভারতীয় ফ্যাশনের নিয়মকানুন নতুন করে লিখছেন। সমকালীন ভারতীয় ফ্যাশনে নাহিদ একজন পথপ্রদর্শক, যিনি ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পকে আধুনিক নকশার সঙ্গে দক্ষতার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি তাঁর ব্র্যান্ডের মূল দর্শনে টেকসই উন্নয়ন ও নৈতিক মূল্যবোধকে অটুট রেখেছেন। ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নাহিদের সৃজনশীলতার শিকড় গড়ে উঠেছিল প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বনগরী হায়দ্রাবাদে।

পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই পরিচয় এবং প্রগতিশীল পারিবারিক পরিবেশ নাহিদের মধ্যে এক বিশেষ আবেগ জাগিয়ে তোলে, যা পরবর্তীকালে তাঁর জীবনযাত্রার দিকনির্দেশক হয়ে ওঠে। সেই আবেগ আজও ভারতীয় ফ্যাশনের গতিপথকে প্রভাবিত করছে। তিনি এমন নকশা তৈরি করেন, যা শুধু জেন-জেড বা তরুণ মিলেনিয়ালদের জন্য নয়, বরং লিঙ্গ ও উপলক্ষের সীমারেখাকেও অতিক্রম করে। তাঁদের টেক্সটাইল ও কুট্যুর কেবল ফ্যাশন নয়, এমন এক প্রজন্মের চাহিদা পূরণ করে, যারা চায় তাদের ডেনিমও যেন তাদের মতোই পরিশ্রমী হয়, লিঙ্কডইনে মার্জিত, ইনস্টাগ্রামে স্বতন্ত্র এবং প্রতিটি পরিস্থিতিতে আরামদায়ক।
নাহিদ যখন হায়দ্রাবাদ এবং অন্যান্য রাজ্যের বিভিন্ন দোকানে ঘুরে দেখতেন, তখন তিনি সর্বত্র একই চিত্র দেখতে পেতেন, ডেনিমে কোনও নতুনত্ব নেই। সাধারণ নেভি রঙের চিনো, একঘেয়ে স্টোন-ওয়াশ শার্ট কিংবা নিস্তেজ পোশাক। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন যে অনলাইন বাজারে ডেনিমের ক্ষেত্রে একটি বড় ‘হোয়াইট স্পেস’ বা অপূর্ণ ক্ষেত্র রয়েছে। বাজারে ডেনিম ছিল, কিন্তু আকাঙ্ক্ষার অভাব ছিল। আর সেই শূন্যস্থানই পূরণ করেছে আর্বানো।
নাহিদ মুকতুল্লা
আজ তাঁদের বিভিন্ন ওয়াশ ও রঙ নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। যেমন ‘কোল্ড ব্রু ফেড’ (Cold brew Fade), সোমবার সকালের কফি-রানের জন্য, ভিনটেজ ও স্টোন-ওয়াশ ফিনিশ; অলিভ গ্রিন, ব্রাউন ও এক্রু রঙের ডেনিম; ‘মনসুন গ্রে’, মেঘলা চারকোল শেডে সূক্ষ্ম হুইস্কারিং; ‘ফিল্টার কফি’, কোল্ড ব্রু ব্রাউন ওভারডাই। প্রতিটি নকশাই কার্যকারিতা ও ফিটনেসের সমন্বয়ে তৈরি।
বেঙ্গালুরুর IIM-এ উদ্যোক্তা বিষয়ক একটি কোর্স সম্পন্ন করা নাহিদ, হাতে অল্প কিছু সঞ্চয় এবং কোনও মার্চেন্ডাইজিং চাকরির প্রতি আগ্রহ না থাকা সত্ত্বেও আর্বানোর যাত্রা শুরু করেন। আজ তাঁর এই মার্চেন্ডাইজ ব্র্যান্ড অনলাইন জগতে অন্যতম সেরা বিক্রিত ডেনিম লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। আদিত্য বিড়লা-নেতৃত্বাধীন টিএমআরডব্লিউ গ্রুপের সমর্থনে সংস্থাটি বহুগুণে সম্প্রসারিত হয়েছে।
পুরুষ ও শিশুদের জন্য শার্ট, চিনো, টি-শার্ট, জ্যাকেট, হুডি কিংবা অ্যাসিড-ওয়াশ কো-অর্ড, সবকিছুই ‘মুড-ফার্স্ট’ ধারণা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়। যদিও ভাইবোনদের কারওই ফ্যাশন মার্কেটিং বা ব্র্যান্ডিংয়ে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল না, তবুও তাঁরা প্রবণতা ও স্টাইল চিহ্নিত করার অসাধারণ ক্ষমতা অর্জন করেছেন। তাঁদের নকশা আরও সাহসী, আরও বিশেষ এবং নিজস্ব বক্তব্য বহন করে।
নাহিদ মুকতুল্লা ও তার ব্যবসার অংশীদাররা
নাহিদের নিরলস প্রচেষ্টার পেছনে সমীর মাসরাথের অবদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিজেও একজন উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি ব্যবসার কার্যক্রম, আর্থিক পরিকল্পনা এবং পরিচালনাগত শৃঙ্খলা বজায় রাখেন। সরবরাহ শৃঙ্খল, বিক্রেতাদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব এবং সম্প্রসারণ কৌশল তাঁর হাতে থাকায় নাহিদ সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন পণ্য ও ব্র্যান্ড উন্নয়নে। বন্ধুদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সিদ্ধান্তে, নতুন কালেকশন উন্মোচন থেকে শুরু করে বিনিয়োগ সংক্রান্ত আলোচনায়, সমীরই নাহিদের ‘সাউন্ডিং বোর্ড’ এবং ‘স্ট্রেস টেস্ট’। তাঁর নীরব উপস্থিতি নাহিদের দৃশ্যমান নেতৃত্বকে ভারসাম্য দেয়। এই দলগত প্রচেষ্টাতেই এমন নকশার জন্ম হয়, যা সব লিঙ্গের মানুষের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য।
আজ আর্বানোর পণ্য ভারতের হাজার হাজার পিনকোডে পৌঁছে যায়। তাদের সেরা বিক্রিত পণ্যের তালিকায় শুধু জিন্স নয়, রয়েছে আরও নানা ধরনের মার্চেন্ডাইজ। বোর্ডরুমের কর্পোরেট পেশাজীবী, স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা, স্টাইলিস্ট কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও এগুলি কোলহাপুরি চপ্পলের সঙ্গে পরিধান করেন। জেন-জেড প্রজন্মের কাছে এই পোশাকের আকর্ষণ হলো, ক্যাফে থেকে ককটেল পার্টি পর্যন্ত একই পোশাকে অনায়াসে মানিয়ে নেওয়া যায়।
তাঁদের ভাষায়, এগুলি হলো, ‘তোমার সঙ্গে সঙ্গে পদোন্নতি পাওয়া ডেনিম’। আর্বানোর অফিসের দেয়ালে লেখা রয়েছে, “আমরা শুধু নীল রঙ বিক্রি করি না, আমরা বিক্রি করি মুড।” আর এমন এক বাজারে, যেখানে একসময় সবকিছুই ছিল সাধারণ ও একঘেয়ে, সেই মুডই আজ হয়ে উঠেছে একান্ত স্বতন্ত্র।