রাষ্ট্র, নিরাপত্তা ও সভ্যতার প্রশ্নে অজিত ডোভালের দৃষ্টিভঙ্গি

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 11 h ago
অজিত ডোভাল
অজিত ডোভাল
 
  রাজীব নারায়ণ

২০২৬ সালের লোকমান্য তিলক জাতীয় পুরস্কার গ্রহণ করতে যখন অজিত ডোভাল মঞ্চে ওঠেন, তখন তিনি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের সেইসব উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথা বলেননি, যা তাঁকে ভারতের অন্যতম খ্যাতিমান গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বরং তিনি তুলে ধরেছিলেন আজকের ভারতের সামনে উন্মুক্ত হওয়া ‘সুযোগের জানালা’-র কথা এবং দেশের যুবসমাজকে আরও শক্তিশালী ভারত গড়ার লক্ষ্যে নিজেদের নিবেদন করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল তাঁর স্বভাবসুলভ সংযত ও মিতভাষী ভঙ্গিতে, একজন এমন মানুষের কণ্ঠে, যিনি গত ছয় দশক ধরে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য, উভয় ধরনের হুমকি থেকে ভারতকে সুরক্ষিত রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন।
 
সাধারণত পুরস্কার অতীতের সাফল্যকে উদ্‌যাপন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি সম্মাননা যেন ভবিষ্যতের দিকেই দৃষ্টি ফেরানোর আহ্বান জানাল। ঘটনাটি ঘটেছিল পুনেতে ২০২৬ সালের লোকমান্য তিলক জাতীয় পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে। অজিত ডোভাল যখন পুরস্কার গ্রহণের জন্য মঞ্চে উঠলেন, উপস্থিত সকলেই তাঁর কাছ থেকে প্রচলিত ধন্যবাদজ্ঞাপনমূলক বক্তব্যের প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA) ব্যক্তিগত অর্জনের কথা না বলে জাতীয় দায়িত্ব ও লক্ষ্য নিয়েই কথা বলেন।
তিনি বলেন, "প্রতিটি প্রজন্মকে বিচার করা হয়, জীবনে আসা সুযোগগুলোর প্রতি তারা কীভাবে সাড়া দিয়েছে তার ভিত্তিতে। আজকের সময় আমাদের কাছে অঙ্গীকার, শৃঙ্খলা এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ দাবি করছে।" তাঁর এই বক্তব্যে মুহূর্তের জন্য পুরো সভাকক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কথাগুলোর গভীর তাৎপর্য উপস্থিত মানুষের মনে পৌঁছে যেতেই চারদিক করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
 
এই পুরস্কারের সম্মানজনক তালিকায় অজিত ডোভাল এমন সব বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের পাশে স্থান করে নিয়েছেন, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন নরেন্দ্র মোদি, সুধা মূর্তি এবং নিতিন গড়করি। তাঁদের মতো ব্যক্তিত্বদের পাশে তাঁর নাম যুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে তাঁকে আলাদা করে তোলে তাঁর কর্মজীবনের প্রকৃতি। তাঁর পেশাগত জীবন কেটেছে জনসমাজের দৃষ্টির আড়ালে। কারণ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়ন সাধারণ মানুষ কী জানেন, তার ওপর নয়; বরং তারা কী জানতে বাধ্য হননি, তার ওপরই নির্ভর করে। তবে কিছু কিছু কর্মজীবন নীরবতার সেই সীমা অতিক্রম করে ইতিহাসে স্থান করে নেয়।
 
অজিত ডোভালের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, ডোভাল জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিরক্ষামূলক এবং আক্রমণাত্মক সক্ষমতায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। গত এক দশকে দেশের নিরাপত্তা কাঠামো যে সম্পূর্ণ নতুন রূপ পেয়েছে, সে বিষয়ে খুব কম মানুষই দ্বিমত পোষণ করবেন। এই পরিবর্তনের বড় অংশেই রয়েছে সেই ব্যক্তির স্পষ্ট ছাপ, যিনি মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির অসংখ্য বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পাশে বসে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রেখেছেন।
 
নিরাপত্তা নীতির পরিবর্তন
 
গোয়েন্দা সংস্থায় দীর্ঘ কর্মজীবন অজিত ডোভালের দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ বহন করলেও, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA) হিসেবে তাঁর দায়িত্বকাল ভারতের কৌশলগত চিন্তাধারার ভাষাই বদলে দিয়েছে। বহু দশক ধরে ভারতকে এমন একটি দেশ হিসেবে দেখা হতো, যে উসকানিমূলক ঘটনার জবাবে সংযম প্রদর্শন করে এবং কূটনৈতিক প্রতিবাদ ও আন্তর্জাতিক জনমতের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু গত এক দশকে সেই ধারণায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ভারতের প্রতিক্রিয়া এখন আরও পরিকল্পিত, সমন্বিত এবং দৃঢ় হয়েছে।
 
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালকে ২০২৬ সালের লোকমান্য তিলক জাতীয় পুরস্কার প্রদান করছেন
 
২০১৬ সালে উরি হামলার পর নিয়ন্ত্রণরেখা (LOC) পেরিয়ে পরিচালিত সার্জিক্যাল স্ট্রাইক এবং ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলার পর বালাকোটে বিমান হামলা এই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে। যদিও এই সামরিক অভিযানগুলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনা করেছিল, তবুও এগুলো এমন এক বৃহত্তর কৌশলগত নীতির প্রতিফলন, যেখানে গোয়েন্দা তথ্য, কূটনীতি, সামরিক পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সবকিছুই ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।
 
এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন রোধে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া, সীমান্ত নজরদারি শক্তিশালী করা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বেসামরিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলাও ছিল এই নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব বিষয় হয়তো টেলিভিশনের বিতর্কে খুব বেশি আলোচিত হয়নি, কিন্তু একটি বিশ্বাসযোগ্য ও শক্তিশালী জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলতে এগুলিই ছিল মূল স্তম্ভ।
 
দার্শনিক গোয়েন্দা
 
বছরের পর বছর অজিত ডোভালকে নানা বিশেষণে অভিহিত করা হয়েছে। তবে সম্ভবত ‘দার্শনিক গোয়েন্দা’ অভিধাটিই তাঁকে সবচেয়ে যথার্থভাবে তুলে ধরে। কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় যিনি নেপথ্যে কাটিয়েছেন, জনসমক্ষে কথা বলার সুযোগ পেলেই তিনি অসাধারণ স্পষ্টতা ও খোলামেলা ভাবেই নিজের চিন্তাধারা তুলে ধরেছেন। গত এক দশকে বিভিন্ন কৌশলগত সম্মেলন, বক্তৃতা এবং আলোচনায় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এমন এক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন, যা গোয়েন্দা কার্যক্রম বা সামরিক কৌশলের সীমা ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত।
 
একবার তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, "ভারত একটি সভ্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র। আমাদের কি এমন কোনো সম্মিলিত ও স্বতন্ত্র চেতনা রয়েছে, যা আমাদের সবাইকে একসূত্রে বাঁধে?" এই প্রশ্নের মধ্যেই ফুটে ওঠে তাঁর সেই বিশ্বাস, যেখানে একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু তার সীমান্তে নয়, বরং তার মূল্যবোধ, পরিচয় এবং জনগণের অভিন্ন চেতনায় নিহিত। অজিত ডোভালের কাছে জাতীয় নিরাপত্তার সূচনা হয় জাতীয় আত্মবিশ্বাস থেকেই।
অজিত ডোভালের দৃষ্টিভঙ্গিতে আজকের বিশ্বে ক্ষমতার পরিমাপ আর শুধু সেনাবাহিনী বা ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়।তিনি একবার বলেছিলেন, "যারা আপনাকে তাদের স্বার্থ অনুযায়ী ভাবতে বাধ্য করতে পারে, প্রকৃত ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকে।"
 
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি এমন এক সময়ে ধারণা, তথ্য এবং প্রভাবের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করেছিলেন, যখন বিশ্ব ক্রমশ সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল অপপ্রচারের যুগে প্রবেশ করছে। সম্ভবত এই কারণেই তিনি বারবার সতর্ক করেছেন যে, গণতন্ত্র টিকে থাকে তখনই, যখন নাগরিকরা "সঠিকভাবে তথ্যপ্রাপ্ত এবং সঠিকভাবে শিক্ষিত" হন। তাঁর মতে, ভ্রান্ত তথ্য ও বিভ্রান্তিকর বয়ান অনেক সময় প্রচলিত যুদ্ধের মতোই একটি জাতির ভবিষ্যৎ ও ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
 
একইভাবে, জাতীয় নিরাপত্তাকে তিনি সবসময়ই একটি যৌথ জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। তিনি বলেছিলেন, "জাতীয় নিরাপত্তা শুধু সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব নয়; এটি সমগ্র দেশের দায়িত্ব।"
 
এই একটি বাক্যের মধ্যেই তাঁর বৃহত্তর রাষ্ট্রদর্শন নিহিত রয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, শক্তিশালী ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান, সচেতন ও তথ্যসমৃদ্ধ নাগরিক এবং সামাজিক সংহতি, এসবই একটি দেশের প্রতিরক্ষার জন্য সামরিক প্রস্তুতির মতোই অপরিহার্য। এ কারণেই তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, একটি দেশের স্থায়ী জাতীয় শক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং ধারাবাহিক উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সম্ভবত অজিত ডোভালকে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরভাবে তুলে ধরে তাঁরই এই মন্তব্য, "কোনো দেশের শক্তি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হলো সেই দেশের মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে অবমূল্যায়ন করা।" এই দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের অন্তরালে রয়েছেন এমন এক চিন্তক, যিনি রাষ্ট্র পরিচালনাকে সবসময় একটি বিস্তৃত সভ্যতাগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন, যেখানে চরিত্র, সক্ষমতা এবং সম্মিলিত জাতীয় উদ্দেশ্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
 
তিনি যত গোপন অভিযান পরিকল্পনা করেছেন, যত সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং যত কৌশলগত নীতি গঠনে অবদান রেখেছেন, শেষ পর্যন্ত অজিত ডোভাল হয়তো তাঁর নেতৃত্ব দেওয়া মিশনের জন্য যতটা স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, তার চেয়েও বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তাঁর উচ্চারিত চিন্তা ও দর্শনের জন্য।
 
তাঁর বিশ্বাস, একটি দেশের প্রথম প্রতিরক্ষা প্রাচীর শুধু তার সেনাবাহিনী নয়; বরং তার জনগণের আত্মবিশ্বাস, তার প্রতিষ্ঠানের শক্তি এবং তার সভ্যতার স্থিতিস্থাপকতা। আর সম্ভবত এই বিশ্বাসের মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত অজিত ডোভাল।
 
(লেখক রাজীব নারায়ণ একজন প্রবীণ সাংবাদিক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।)