জিনাত কাইফি: প্রথার বেড়াজাল ভেঙে গড়ে ওঠা এক সাহসী সাংবাদিকের কাহিনি

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 17 h ago
জিনাত কাইফি
জিনাত কাইফি
 
নীলম গুপ্তা

"আমাদের পুরো পরিবার একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিল। সেখানেই আমার দিদিমা আমার বাগদান ঠিক করে দেন। তখন আমি জয়পুরের সেন্ট জোসেফ স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিলাম।" এই কথাগুলোর মাধ্যমেই প্রবীণ সাংবাদিক ও উর্দু সাহিত্যিক জিনাত কাইফি তাঁর জীবনের সেই দীর্ঘ পথচলার গল্প শুরু করেন, যে পথ সাহস, প্রতিবাদ, বেদনা এবং অদম্য সংকল্পে নির্মিত।
 
তিনি বলেন, "আমার বাবা ছিলেন কলেজের একজন অধ্যাপক। তিনি এবং আমার মা, দুজনেই এই বাগদানে সম্মত ছিলেন না। কিন্তু দিদিমার সামনে তাঁরা নীরব ছিলেন। সেই নীরবতাই আমার জীবনকে এক কঠিন পথে ঠেলে দিয়েছিল।" যার সঙ্গে তাঁর বাগদান হয়েছিল, সে ছিল তাঁর বাবার এক বন্ধুর ছেলে এবং একই পাড়াতেই থাকত। জিনাত কাইফি স্মৃতিচারণ করে বলেন, "আমার ভবিষ্যৎ শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ঘোষণা করলেন, আমি আর স্কার্ট পরতে পারব না। আমার স্কুলও বদলে দেওয়া হলো। নতুন স্কুলটিও ইংরেজি মাধ্যম ছিল, তবে সেখানে ইউনিফর্ম ছিল সালোয়ার-কামিজ। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই স্কুলে যাওয়ার সময় বোরকা পরাও বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়। তখন আমি এতটাই ছোট ছিলাম যে এর তাৎপর্য বুঝতাম না। শুধু এটুকুই বুঝতাম, এতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। অনেক সময় হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়েও যেতাম।"
 
জিনাত কাইফি
 
স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি জয়পুরের মহারানি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখানে উর্দু ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি এম.ফিল. এবং পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল, "ভারতের সংস্কৃতি নিয়ে রচিত উর্দু উপন্যাসের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ।" তিনি বলেন, "ছোটবেলায় বাবা আমাকে প্রায়ই বলতেন, 'নিজের ভাষাকে ভালোবাসো, না হলে সেই ভাষা মরে যাবে।' বাবার সেই কথাগুলো আজীবন আমার মনে গেঁথে রয়েছে।"
 
এই উচ্চশিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে তিনি সহজেই কলেজের অধ্যাপিকা হতে পারতেন। কিন্তু জিনাত কাইফির ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। তিনি বলেন, "আমি কখনও শিক্ষকতা করতে চাইনি। আমার কাছে সেটা খুবই একঘেয়ে মনে হতো। আমি ঘরের বাইরে বেরিয়ে এমন একটি পেশায় কাজ করতে চেয়েছিলাম, যেখানে থাকবে উত্তেজনা, চ্যালেঞ্জ এবং নতুন নতুন অভিজ্ঞতা।" সেই স্বপ্নই তাঁকে দিল্লিতে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সাংবাদিকতায় এক বছরের ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেন। কোর্স শেষ হওয়ার আগেই তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় হিন্দি সাময়িকী, গৃহশোভা, সরিতা, মুক্তা এবং মনোহর কাহানিয়াঁ-এ লেখা শুরু করেন। একই সঙ্গে তাঁর কবিতা ও ছোটগল্পও বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। তিনি বলেন, "আমার প্রথম ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছিল, যখন আমি দশম শ্রেণিতে পড়তাম।"
 
কবিতা ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। তবে তাঁর বাবা তাঁকে প্রকাশ্য মুশায়রায় কবিতা আবৃত্তি করার অনুমতি দিতেন না। জিনাত কাইফি বলেন, "বাবার বিশ্বাস ছিল, নারী কবিদের সবসময় সম্মানের চোখে দেখা হয় না।" তবে স্কুল ও কলেজের অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠে তাঁর কোনো বাধা ছিল না। পরে তিনি আকাশবাণী-র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শুরু করেন এবং টেলিভিশনের মুশায়রাতেও আমন্ত্রণ পেতে থাকেন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, "আমার বাবাও একজন কবি ছিলেন এবং নিয়মিত মুশায়রায় অংশ নিতেন। যখন আমাদের দুজনকেই আমন্ত্রণ জানানো হতো, আমি তাঁর সঙ্গে যেতাম। পরে তিনি ব্যবসার কাজে সিঙ্গাপুরে চলে গেলে আমি একাই মুশায়রায় অংশ নিতে শুরু করি।"
 
সাংবাদিকতার পড়াশোনার সময় তিনি প্রায় প্রতিদিনই নবভারত টাইমস-এর দপ্তরে যেতেন। তিনি বলেন, "আমি প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা সেখানে বসে থাকতাম এবং আমাকে যে কাজ দেওয়া হতো, নিষ্ঠার সঙ্গে তা করতাম।" তাঁর পরিবারের সদস্যরা সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার বিষয়ে খুব একটা উৎসাহী ছিলেন না। কিন্তু জিনাত কাইফি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, "একবার যখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, তখন আর কেউ আমাকে থামানোর চেষ্টা করেনি।"
 
 
একদিন নবভারত টাইমস-এর পক্ষ থেকে তাঁকে কিংবদন্তি অভিনেতা দিলীপ কুমার-এর সাক্ষাৎকার নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে সময় একটি চলচ্চিত্রের প্রচারের জন্য দিলীপ কুমার জয়পুরে এসেছিলেন। জিনাত কাইফি বলেন, "পত্রিকা জানত, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে আমি এর আগে বিভিন্ন সাময়িকীর জন্য শাহরুখ খান ও সালমান খানের সাক্ষাৎকার নিয়েছি।" নির্ধারিত সময়ে তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দিলীপ কুমারের সঙ্গে দেখা করতে যান। তিনি স্মরণ করেন, "আমি বসতেই তিনি বললেন, 'ইয়াং লেডি, আমি এই ছবিটি নিয়ে তোমাকে কিছুই বলব না। অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাইলে বলো।'"
 
জিনাত কাইফি
 
হঠাৎ এমন কথায় তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। জিনাত কাইফি বলেন, "তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, 'তুমি তোমার হোমওয়ার্ক করে আসোনি, তাই না? ফিরে যাও, ভালোভাবে প্রস্তুতি নাও, তারপর তিন দিন পরে এসো।'" সেই মুহূর্তটিই তাঁর সাংবাদিক জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, "সেদিন আমি শিখেছিলাম, যেখানেই যাও না কেন, সবসময় প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হয়।" পরবর্তী তিন দিন তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে দিলীপ কুমারকে জানার কাজে নিয়োজিত করেন। লাইব্রেরি, সংবাদপত্রের আর্কাইভ এবং পুরোনো নথি ঘেঁটে তাঁর সম্পর্কে যত তথ্য পাওয়া সম্ভব, সবই সংগ্রহ করেন। তিনি বলেন, "তিন দিন পরে আবার দেখা করতে গেলে আমাদের আলাপ শুরু হয় সকাল এগারোটায়, আর শেষ হয় সন্ধ্যায়।"
 
সেই সাক্ষাৎকারটি নবভারত টাইমস-এর একটি পূর্ণ পৃষ্ঠা জুড়ে তাঁর নামসহ প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনই তাঁকে সাংবাদিক মহল এবং পাঠকদের কাছে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। তিনি বলেন, "আমি ভেবেছিলাম, এবার হয়তো নবভারত টাইমসে স্থায়ী চাকরি পেয়ে যাব।" কিন্তু তা আর হয়নি। বরং পত্রিকার চলচ্চিত্র বিভাগের প্রতিবেদক তাঁর এই সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। জিনাত কাইফি বলেন, "পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, শেষ পর্যন্ত আমার মনে হলো সেখান থেকে চলে যাওয়াই ভালো।" ঠিক সেই সময় আকাশবাণীর একটি অনুষ্ঠান রেকর্ডিংয়ের সময় উর্দু পরিষেবার এক প্রযোজক তাঁকে জানান, দিল্লি থেকে রাষ্ট্রীয় সহারা একটি উর্দু সংবাদপত্র প্রকাশ করতে চলেছে। তিনি বলেন, "আমি জয়পুর প্রতিনিধি পদের জন্য আবেদন করি এবং নির্বাচিত হই।"
 
প্রথমবারের মতো তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ সংবাদপত্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন। পান নির্দিষ্ট পদ, দায়িত্ব এবং একটি প্রকৃত নিউজরুমে কাজ করার সুযোগ। তিনি বলেন, "এই সুযোগ আমার আত্মবিশ্বাসকে অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল।" সাপ্তাহিক পত্রিকা হওয়ায় তাঁর হাতে সময়ও ছিল যথেষ্ট। ফলে অনুসন্ধানী এবং ব্যতিক্রমী বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান। তিনি বলেন, "আমি সবসময় এমন গল্প খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম, যেগুলোর দিকে অন্য কেউ নজর দিত না।"
 
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর কাজ শুধু পাঠকদের নয়, রাজনীতিক এবং আমলাদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জিনাত কাইফি বলেন, "আমি একাধিক দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ্যে এনেছিলাম। শিশু শ্রম নিয়ে আমার একটি প্রতিবেদন সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।" ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এমন হয়ে ওঠে যে, তাঁকে আর সংবাদ খুঁজতে হতো না। তিনি বলেন, "সংবাদই যেন আমাকে খুঁজে নিতে শুরু করেছিল।"
 
 
অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল' বোর্ডের একটি সম্মেলন কভার করতে গিয়ে জিনাত কাইফির সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, "সেখানে আমাকে বোরকা পরতে হয়েছিল, কারণ বোরকা না পরলে বোর্ডের চেয়ারম্যান আমার সঙ্গে কথা বলতেন না।" শুধু এই ঘটনাই নয়, আরও কয়েকবার এমন হয়েছে যখন এমন জায়গায় প্রবেশ করার জন্য, যেখানে নারী সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি ছিল না, তিনি বোরকাকে কেবল একটি বাস্তবসম্মত উপায় হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
 
জিনাত কাইফি বলেন, "আমি রাজস্থানের প্রথম মুসলিম নারী সাংবাদিক ছিলাম। আমি সবসময় নির্ভীকভাবে, সাহসের সঙ্গে এবং সম্পূর্ণ নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করেছি।" তবে পেশাগত সাফল্য তাঁকে কর্মক্ষেত্রের বৈষম্য থেকে রক্ষা করতে পারেনি। তিনি বলেন, "নয়ডায় বসে থাকা সম্পাদক প্রায়ই আমার সেরা প্রতিবেদনগুলো নিজের মতো করে বদলে দিতেন এবং নিজের নামেই প্রকাশ করতেন।" এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে তিনি সবসময় বিষয়টি উড়িয়ে দিতেন। জিনাত কাইফি স্মরণ করেন, "তিনি বলতেন, 'তুমি ভালো লিখতে পারো না। তাই আমি তোমার লেখা নতুন করে লিখে দিই।'"
 
জিনাত কাইফি
 
সম্পাদক যখনই জয়পুরে আসতেন, কোনো কাজ থাকুক বা না থাকুক, সারাদিন তাঁর সঙ্গে থাকতে হতো। তিনি বলেন, "সরকারি দপ্তরে গেলে আমাকে বাইরে বসিয়ে রাখা হতো।" একটি বিশেষ অপমানজনক ঘটনার কথাও তিনি স্মরণ করেন। "শুরুর দিকে তিনি চাইতেন, গাড়ি থেকে নামার সময় আমি যেন তাঁর জন্য গাড়ির দরজা খুলে দিই।" জিনাত কাইফি স্পষ্টভাবে সেই নির্দেশ মানতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, "আমি একের পর এক এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করতে থাকায় তিনি আমার প্রতিবেদন প্রকাশ করাই বন্ধ করে দেন।"
 
এই কঠিন সময়ে সাহারার হিন্দি সংস্করণের সহকর্মীরা তাঁকে ভেঙে না পড়ার পরামর্শ দেন। তাঁরা বলেন, "তুমি আমাদের জন্য লিখো।" এরপর তাঁর বহু প্রতিবেদন সাহারার হিন্দি সংস্করণে তাঁর নিজের নামেই প্রকাশিত হতে থাকে। জিনাত কাইফি বলেন, "অনেক সময় চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছি। পদোন্নতি পাচ্ছিলাম না, একের পর এক নতুন বাধা তৈরি করা হচ্ছিল। কিন্তু নিজের ভালোবাসার পেশায় চাকরি পাওয়া সহজ নয়। তাই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।" অবশেষে সেই সম্পাদক প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। তিনি বলেন, "নতুন সম্পাদক আমাকে পদোন্নতি দেন।" তবে ২০১৮ সালে সাহারা গ্রুপ আর্থিক সংকটে পড়ে। টানা ছয় মাস কর্মীদের বেতন বন্ধ থাকায় শেষ পর্যন্ত জিনাত কাইফি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন।
 
সাংবাদিকতা এবং সাহিত্য, দুই ক্ষেত্রেই তাঁর অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ২০০২ সালে পিঙ্কসিটি প্রেস ক্লাব, জয়পুর তাঁকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। এছাড়াও রাজস্থান উর্দু অ্যাকাডেমি তাঁকে সম্মানিত করে এবং তাঁর উর্দু কবিতা ও ছোটগল্পের জন্যও একাধিক পুরস্কার লাভ করেন। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশেও তিনি অসংখ্য মুশায়রায় অংশগ্রহণ করেছেন। জিনাত কাইফি বলেন, "আমার কবিতা বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রকাশিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের উর্দু অ্যাকাডেমি সেগুলো পড়ে আমাকে আমেরিকায় আমন্ত্রণ জানায়। পুরো সফরের সমস্ত ব্যয় তারাই বহন করেছিল। সেই সফরে আমরা আমেরিকার দশটি ভিন্ন শহর ভ্রমণ করি।"
 
সাংবাদিকতা ও সাহিত্যজীবনে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করলেও জিনাত কাইফির ব্যক্তিগত জীবন কখনোই সহজ ছিল না। শৈশবে যে বাগদান হয়েছিল, সেটি কলেজে ওঠা পর্যন্ত বহাল ছিল। জিনাত কাইফি বলেন, "আমি সেই ছেলেটিকে জয়পুরের একটি রেস্তোরাঁয় দেখা করতে ডেকেছিলাম।" সেই সাক্ষাৎ অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে শেষ হয়। তিনি স্মরণ করেন, "সে আমার হাতে একটি লাইটার ধরিয়ে দিল, মুখে একটি সিগারেট রেখে আমাকে সেটি ধরিয়ে দিতে বলল।" তিনি দু'বার সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। জিনাত কাইফি বলেন, "তৃতীয়বারও যখন সে একই কথা বলল, তখন আমি তার মুখের ওপর এক গ্লাস পানি ছুড়ে মেরে সেখান থেকে বেরিয়ে আসি।"
 
এর কিছুক্ষণ পরই পুলিশ ওই রেস্তোরাঁয় অভিযান চালায় এবং সেখানে থাকা কয়েকটি যুগলের সঙ্গে ওই যুবককেও আটক করে। এরপর ছেলেটির পরিবার জিনাত কাইফির বাবা-মায়ের কাছে অভিযোগ জানায়। তিনি বলেন, "আমি বাবা-মাকে বলেছিলাম, যদি আগে জানিয়ে দেখা করতে যেতাম, তাহলে আজ যে সত্যটা জানতে পেরেছি, সেটা কখনও জানতে পারতাম না।" তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, "আমি এমন একজন মানুষকে বিয়ে করব না, যে শুধু শারীরিকভাবেই আমার সঙ্গে মানানসই নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকেও সম্পূর্ণ শূন্য।"
 
বাগদান ভেঙে গেলে পরবর্তীতে তাঁর জন্য নতুন সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, এই আশঙ্কা তাঁর বাবা-মায়ের ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ছেলেটির পরিবারই বাগদান ভেঙে দেয়। জিনাত কাইফি বলেন, "মা যখন আমাকে জানালেন যে বাগদান ভেঙে গেছে, তখন আমি বলেছিলাম, 'মিষ্টি বিতরণ করো!'" এরপর আরও দুটি বাগদান হয়েছিল। কিন্তু দুটি সম্পর্কই ভেঙে যায়, কারণ সম্ভাব্য শ্বশুরবাড়ির লোকেরা শর্ত দিয়েছিল, তাঁকে মুশায়রায় যাওয়া বন্ধ করতে হবে এবং সারাক্ষণ বোরকা পরে থাকতে হবে। তিনি বলেন, "ততদিনে আমি নিজের মতো করে বাঁচতে শিখে গিয়েছিলাম। সেই শর্তগুলো মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।"
 
পরে সাহারা টিভি-র হয়ে আজমের শরিফের উরস কভার করতে গিয়ে তাঁর পরিচয় হয় নয়ডার এক সাংবাদিকের সঙ্গে। জিনাত কাইফি বলেন, "প্রায় দশ দিন আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। তখন আমাদের মনে হয়েছিল, আমরা একসঙ্গে একটি সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে পারি।" এরপর তাঁদের বাগদান হয়। কিন্তু ভাগ্য আবারও অন্য পথ বেছে নেয়। তিনি বলেন, "একটি সরকারি বৈঠকে যোগ দিতে নয়ডা অফিসে গিয়ে জানতে পারি, তিনি তাঁর এক সহকর্মীর সঙ্গে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন।" সেই বাগদানও শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়।
 
জিনাত কাইফি
 
তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া পরবর্তী বিয়ের প্রস্তাবটি আসে এক সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত মানুষের কাছ থেকে, সেন্ট জোসেফ স্কুলে পড়ার সময়কার এক শৈশবের বন্ধুর কাছ থেকে। স্কুল পরিবর্তনের আগে তাঁরা একসঙ্গেই পড়াশোনা করতেন। ততদিনে সেই বন্ধুর একবার বিয়ে হয়ে গেছে এবং তাঁর চার সন্তানও ছিল। জিনাত কাইফি বলেন, "প্রথমে আমি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।" তারপরও তাঁদের বন্ধুত্ব অটুট ছিল এবং তাঁরা নিয়মিত বন্ধু হিসেবেই দেখা করতেন।
 
এরই মধ্যে বাবা-মায়ের সঙ্গে হজ পালন করতে সৌদি আরবে যান জিনাত কাইফি। সেখানে মদিনায় এক অদ্ভুত ঘটনার মুখোমুখি হন তিনি। তিনি বলেন, "মদিনায় একজন আমার কাছে একটি ফুলের তোড়া নিয়ে এলেন। সেই তোড়ার ভেতরে একটি চিঠি ছিল।" চিঠিটি লিখেছিলেন তাঁর সেই শৈশবের বন্ধু। চিঠিতে লেখা ছিল, "আমি তোমাকে সুখে রাখব। তোমার ওপর কখনও কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করব না। তুমি যেমনভাবে বাঁচতে চাও, ঠিক সেভাবেই স্বাধীনভাবে বাঁচবে।"
 
চিঠিটি তাঁর বাবা-মাও পড়েছিলেন। জিনাত কাইফি বলেন, "অনেক ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত আমাদের পুরো পরিবার এই বিয়েতে সম্মতি দেয়।" অবশেষে তাঁদের বিয়ে হয়। তিনি বলেন, "আজ আমাদের একটি ছেলে রয়েছে। আমার স্বামী অত্যন্ত সুন্দরভাবে দুই পরিবারকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছেন।" জীবন যেন ধীরে ধীরে পরিপূর্ণতার দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু ২০২২ সালে আবারও এক গভীর শোকের মুখোমুখি হন জিনাত কাইফি। তাঁর তিন বোনের একজন আকস্মিকভাবে মারা যান। জিনাত কাইফি বলেন, "ওই শোক আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারিনি। আমি গভীর বিষণ্নতায় ডুবে গিয়েছিলাম।" সেই কঠিন সময় থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে তাঁর প্রায় এক বছর সময় লেগেছিল। তিনি বলেন, "আমার ছেলে সেই কঠিন সময়ে সবসময় আমার পাশে ছিল। ধীরে ধীরে সেও আমাকে আবার জীবনমুখী করে তুলেছিল।"
 
আজ জিনাত কাইফি আবারও সাংবাদিকতার নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। জীবনের প্রতিটি বাঁকে তিনি যে সাহস, আত্মমর্যাদা, স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং নিজের পরিচয়কে কখনও বিসর্জন না দেওয়ার মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, সেটিই তাঁর দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে বড় শক্তি। শৈশবে পরিবারের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত এক বাগদান থেকে শুরু করে নিজের ইচ্ছাশক্তির জোরে সেই শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসা, সাংবাদিকতার কঠিন জগতে নিজের দক্ষতা ও সাহসের পরিচয় দেওয়া, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও অপমানের বিরুদ্ধে মাথা নত না করা, একের পর এক ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের পরও নিজের আত্মসম্মানকে অটুট রাখা এবং ব্যক্তিগত জীবনের গভীরতম শোক কাটিয়ে আবার নতুন করে উঠে দাঁড়ানো, জিনাত কাইফির জীবন যেন সংগ্রাম, সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের এক জীবন্ত দলিল।
 
তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রা শুধু একজন সফল সাংবাদিক বা সাহিত্যিকের গল্প নয়; এটি এমন এক নারীর কাহিনি, যিনি প্রতিটি প্রতিকূলতাকে সামনে থেকে মোকাবিলা করেছেন এবং কখনও নিজের স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা কিংবা পরিচয়ের সঙ্গে আপস করেননি। জীবনের যত আঁকাবাঁকাই আসুক না কেন, তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস থাকলে প্রতিটি বাঁকই নতুন পথের সূচনা হয়ে উঠতে পারে।