শান্তি প্রিয় রায় চৌধুরী
কাশ্মীরের শ্রীনগরের গলি থেকে বুমরাহর বদলি। হ্যাঁ, গল্পটা বলছিলাম কাশ্মীরে সোনার ছেলে আকিব নবীকে নিয়ে। যদি বলি গলি থেকে রাজপথে, এটাও কিন্তু একেবারেই ঠিক হবে। শ্রীনগর থেকে বারামুলা, ৫০ কিলোমিটারের বেশি পথ। কাশ্মীরের এই প্রান্তিক জনপদে ক্রিকেট মাঠ বলতে তেমন বিশেষ কিছুই ছিল না। সেখানকার সরু গলি গুলোতে রান-আপ নেওয়ার মতো সোজা জায়গাও ছিল না বললেই চলে।
শীত ও বর্ষাতে খেলা তো বন্ধই থাকত। সেই জায়গা থেকে ভারতীয় দলে। এ তো অলীক স্বপ্ন। আর এই রকম একটা জায়গা থেকেই উঠে এসেছেন আকিব নবী দার, যিনি আজ ভারতের কোন বিশ্ব ক্রিকেটের সেরা পেস বোলার যশপ্রীত বুমরার অনুপস্থিতিতে ডাক পেয়েছেন শ্রীলঙ্কা সফরের জন্য ভারতের টেস্ট দলে। হবে দুটি টেস্ট ম্যাচ, যে টেস্ট ম্যাচ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট সিরিজ।
ক্রিকেট নয়, ছোটবেলায় বারামুলার অলিতে গলিতে নবী ফুটবলটাই শুরু করে ছিলেন। বলা যেতে পারে নবীর প্রথম ভালোবাসা ছিল ফুটবল। কিন্তু পাড়ার কিছু ছেলে আর টিভির পর্দায় ক্রিকেট খেলাটা দেখে তার ক্রিকেটের প্রতি প্রেম জমে যায়। তাই একদিন খেলার ছলে হাতে টেনিস বল নিয়ে বল করা শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে জোরে বল করার নেশা তাঁকে টেনে নিয়ে যায় ক্রিকেটের দিকে।
কিন্তু ক্রিকেট পরিকাঠামোহীন এই বারামুলা শহরে বেড়ে ওঠা এই ছেলের জন্য এই পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। ২০১৬-১৭ সালের কথা। বারামুলার এক ছোট মাঠে টেনিস বল ক্রিকেটের এক ম্যাচে তাঁর লড়াকু ইনিংস নজর কাড়ে প্রতিপক্ষ অধিনায়কের। সেই অধিনায়ক তাঁকে সুযোগ করে দেন বিসিসি রেডস ক্লাবে। ক্রিকেট খেলাটা এই ক্লাবে ভালই চলতো।তখনো তিনি মূলত ব্যাটিং অলরাউন্ডার। বছরের পর বছর অনুশীলন আর অধ্যবসায়ে সেই ব্যাটসম্যান থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় এক পেসার।
তার জীবনের সেরা সুযোগ দেয়া আসে ২০১৯-২০ মরসুমে। এই বছর থেকে জম্মু ও কাশ্মীরের হয়ে রঞ্জি ট্রফিতে প্রথম শ্রেণির অভিষেক হয় নবীর। ঝাড়খন্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচে প্রথম ইনিংসে উইকেটশূন্য থেকেও দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে দলকে জেতান ইনিংস ব্যবধানে। ২০২৪-২৫ রঞ্জি মরসুমে মাত্র ১৩.৯৩ গড়ে নেন ৪৪ উইকেট।
তারপর আসে ২০২৫-২৬ মরসুম। এই মরসুমই ছিল নবীর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বর্ণময় অধ্যায়। ১৭ ইনিংসে ৬০ উইকেট, গড় ১২.৬৫ নিয়ে হয়ে ওঠেন গোটা রঞ্জি মরসুমের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি এবং টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়। বাংলার বিপক্ষে সেমিতে ৯ উইকেট নিয়ে জম্মু-কাশ্মীরকে পৌঁছে দেন তাদের ৬৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রঞ্জির ফাইনালে। সেখানে ৫৪ রানে ৫ উইকেট নিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরকে এনে দেন দলটির ইতিহাসের প্রথম রঞ্জি ট্রফি শিরোপাও। তার হাত ধরেই জম্মু ও কাশ্মীরের ক্রিকেটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
গত দুই মরসুমে মোট ১০৪ উইকেট, প্রথম শ্রেণিতে সব মিলিয়ে ৪৩ ম্যাচে ১৬২ উইকেট, গড় ১৮.৬৩m সংখ্যাগুলো নিজেই বলে দেয় ধারাবাহিকতার গল্প। মাঝে ২০২৫ সালের দলীপ ট্রফিতে ইস্ট জোনের বিপক্ষে টানা চার বলে চার উইকেট নিয়ে হয়ে যান প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এই কীর্তি গড়া মাত্র পাঁচজন ভারতীয় ক্রিকেটারের একজন। অথচ এই পারফরম্যান্স করেও বহুদিন ধরে আইপিএলের দরজা বন্ধ ছিল তাঁর। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ মরসুমে দিল্লি ক্যাপিটালস তাঁকে দলে টানে।
সম্প্রতি ভারত ‘এ’ দলের শ্রীলঙ্কা সফরে দুই ম্যাচে ছয় উইকেট নিয়ে নির্বাচকদের নজরে আরও ভালোভাবে পড়ে যান নবী। সেই নজর কাড়া পারফরমেন্সের জন্য এবার তার কাছে এল সেই ফোনকল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে কার্ডিফে চোট পাওয়া হাঁটুর সমস্যা কাটিয়ে উঠতে না পারা বুমরা ছিটকে গেলেন শ্রীলঙ্কা সফরের টেস্ট দল থেকে। তাঁর জায়গায় নাম লেখা হলো ২৯ বছর বয়সী আকিব নবীর।
পারভেজ রসুল আর উমরান মালিকের পর নবী হলেন জম্মু ও কাশ্মীর থেকে সিনিয়র ভারতীয় দলে ডাক পাওয়া তৃতীয় ক্রিকেটার, তবে লাল বলের ক্রিকেটে তিনিই প্রথম। টেস্ট অভিষেক হলে তিনিই হবেন জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম টেস্ট ক্রিকেটার। ১৫ আগস্ট গল থেকে শুরু হবে দুই টেস্টের সিরিজ, দ্বিতীয় টেস্ট ২৩ আগস্ট কলম্বোয়। তার আগে ৭ আগস্ট কলম্বোয় হবে তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচ।
শ্রীলঙ্কায় যদি তার টেস্ট অভিষেক হয়, তাহলে জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেট ইতিহাসে খোদাই হয়ে যাবে তার নাম।শ্রীলঙ্কা সফরের টেস্ট সিরিজে ভারতের জাতীয় দলে প্রথমবার ডাক পেয়েছেন জম্মু ও কাশ্মীরের পেসার আকিব নবি। তাঁর এই ঐতিহাসিক সাফল্যে পুরো উপত্যকা জুড়ে বইছে খুশির জোয়ার ও উৎসবের আমেজ।
বারামুলা থেকে শুরু করে পুরো জম্মু-কাশ্মীর জুড়ে উৎসব মুখর পরিবেশ। ক্রিকেটপ্রেমীরা মিষ্টি বিতরণ ও উদযাপনে মেতে উঠেছেন। ১৫ আগস্ট থেকে এই উৎসবের মাত্রাটা আরো বাড়বে। কারণ ওই দিন থেকেই টিভির পর্দায় চোখ থাকবে জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটপ্রেমীদের। সাধারণ এক স্কুল শিক্ষকের ছেলে আকিবের এই উত্থান স্থানীয় যুবসমাজ ও উদীয়মান ক্রিকেটারদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
এদিকে জম্মু-কাশ্মীরের পেসার আকিব নবি-র ভারতের টেস্ট দলে ডাক পাওয়ায় উচ্ছ্বসিত ও গর্বিত জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেট মহল। একে তাঁর দীর্ঘ পরিশ্রম ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের উপযুক্ত স্বীকৃতি হিসেবে দেখছে জম্মু ও কাশ্মীর ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন এবং স্থানীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা। বারামুলার মতো প্রান্তিক অঞ্চল থেকে উঠে আসা নবিকে এখন উপত্যকার উদীয়মান ও তরুণ ক্রিকেটারদের কাছে এক জীবন্ত উদাহরণ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।