ধর্মের সীমানা পেরিয়ে মানবতার সেবায় সুফি দর্শনের এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান খানকাহ মুনেমিয়া

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 16 h ago
ধর্মের সীমানা পেরিয়ে মানবতার সেবায় সুফি দর্শনের এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান খানকাহ মুনেমিয়া
ধর্মের সীমানা পেরিয়ে মানবতার সেবায় সুফি দর্শনের এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান খানকাহ মুনেমিয়া
 
মাহফুজ আলম | পাটনা

বর্তমান সময়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য, শিক্ষার অভাব, সামাজিক বিভাজন এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার মতো নানা সংকট সমাজকে নানাভাবে প্রভাবিত করছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে খানকাহগুলোর ভূমিকা কেবল আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং মানবসেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। এই ধারারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ খানকাহ মুনেমিয়া। ধর্ম বা সম্প্রদায়ের ভেদাভেদ না করে দরিদ্র মানুষের সহায়তা, অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপের মাধ্যমে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও জাতীয় ঐক্যের মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান।
 
এই উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে, যখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মানবকল্যাণ ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে নিজেদের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে, তখন তারা একটি শান্তিপূর্ণ, শিক্ষিত এবং সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
 
খানকাহ মুনেমিয়া
 
শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
 
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খানকাহগুলো আধ্যাত্মিক সাধনা, মানবসেবা এবং সামাজিক সম্প্রীতির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সুফি সাধক ও তাঁদের খানকাহগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্ম, জাত, সম্প্রদায় কিংবা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সকল মানুষের সেবা করা। তাঁদের নিঃস্বার্থ মানবসেবা, অনুকরণীয় চরিত্র এবং মানবিক আচরণের মাধ্যমে সুফিরা সব ধর্ম ও সমাজের মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছিলেন।
 
সেই গৌরবময় ঐতিহ্য আজও অক্ষুণ্ণ রেখেছে পাটনা সিটির খানকাহ মুনেমিয়া মিঠান ঘাট। এই মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডকে আরও সুসংগঠিত করতে ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সামাজিক, ধর্মীয়, শিক্ষামূলক, সাহিত্যিক ও জনকল্যাণমূলক সংগঠন ‘সিলসিলা’। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই সংগঠন শত শত শিক্ষার্থী এবং হাজার হাজার রোগীকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে আসছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জাতীয় সংহতি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠাই এর প্রধান লক্ষ্য। 
 
সংগঠনটি পরিচালিত হয় খানকাহ মুনেমিয়া মিঠান ঘাটের সাজ্জাদা নশীন এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা ড. শামীমুদ্দিন আহমদ মুনেমি-এর পৃষ্ঠপোষকতায়। সংগঠনের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক মাসুদুর রহমান। আওয়াজ – দ্য ভয়েস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক মাসুদুর রহমান জানান, সিলসিলার সব কার্যক্রমই জনসাধারণের সহযোগিতায় পরিচালিত হয়। তাঁদের লক্ষ্য শুধু শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণে সহায়তা করাও।
 
খানকাহ মুনেমিয়াতে মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রী
 
ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি শিক্ষা
 
অধ্যাপক মাসুদুর রহমানের মতে, একটি শিক্ষিত সমাজই ইতিবাচকভাবে চিন্তা করতে, গঠনমূলক সিদ্ধান্ত নিতে এবং দেশ ও সমাজের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে নিরক্ষরতা সমাজকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়, কুসংস্কার ও ক্ষতিকর সামাজিক প্রথাকে উৎসাহিত করে এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বিশ্বজুড়েই জ্ঞানকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়। ইসলামে জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মানুষের জন্য একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। তাই প্রতিটি শিশু ও প্রত্যেক ব্যক্তিকে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত। পাশাপাশি সমাজ ও বিভিন্ন সংগঠনেরও দায়িত্ব রয়েছে, যাতে অর্থনৈতিক সংকট কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
 
এই লক্ষ্য পূরণে সিলসিলা প্রতি বছর প্রায় একশো শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী এবং পেশাগত শিক্ষায় অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীরাও। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের শিক্ষার্থীদের স্কুল ফি, পরীক্ষার ফি, কোচিং ব্যয়, ভর্তি ফি এবং অন্যান্য শিক্ষাসংক্রান্ত খরচ বহনে সহায়তা করা হয়। মাধ্যমিক স্তর থেকে স্নাতক পর্যন্ত এই সহায়তা অব্যাহত থাকে, যাতে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ না হয়ে যায়।
 
উচ্চশিক্ষায় সমান সুযোগ
 
আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বহু মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ হারায়। অধ্যাপক মাসুদুর রহমানের মতে, একটি মাত্র সংগঠনের পক্ষে এই সমস্যা সম্পূর্ণভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে আন্তরিক উদ্যোগ অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সিলসিলা এমবিবিএস, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডিপ্লোমাসহ বিভিন্ন পেশাগত কোর্সে ভর্তি হতে ইচ্ছুক মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। তিনি জানান, সংগঠনটি সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক অনুদান গ্রহণ করে না। সমাজের সচেতন ও উদার মানুষ স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করেই এই কল্যাণমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সাহায্য করেন।
 
কারিগরি শিক্ষার প্রসার
 
অধ্যাপক মাসুদুর রহমানের মতে, আধুনিক জীবনে প্রযুক্তি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তাই কম্পিউটার শিক্ষা আজ সময়ের দাবি। এই প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে ২০১৮ সালে সিলসিলা একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। এখানে মাত্র ৫০০ টাকার নামমাত্র ফিতে ছয় মাসের ডি.সি.এস. কোর্স পরিচালিত হয়। সব ধর্মের শিক্ষার্থীরাই এখানে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। যাঁরা এই সামান্য ফি দেওয়ার সামর্থ্যও রাখেন না, তাঁদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
 
খানকাহ মুনেমিয়াতে আন্তঃধর্মীয় মতবিনিময় অনুষ্ঠান
 
শিক্ষার পাশাপাশি চরিত্র গঠন
 
সিলসিলার বিশ্বাস, শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়; বরং একজন শিক্ষার্থীর নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং মানবিক বিকাশের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মৌলানা ড. শামীমুদ্দিন আহমদ মুনেমির তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে এবং ইসলামের নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন করতে নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। নিবন্ধ প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতা, ইসলামি জ্ঞানভিত্তিক নৈর্ব্যক্তিক ও বর্ণনামূলক পরীক্ষা নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। সফল শিক্ষার্থীদের পুরস্কার ও সম্মাননার মাধ্যমে উৎসাহিত করা হয়, যা তাঁদের আত্মবিশ্বাস, সচেতনতা এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে সহায়তা করে। অধ্যাপক মাসুদুর রহমানের মতে, শিক্ষিত সমাজ ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়।
 
অসচ্ছল মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা
 
সিলসিলার পরিচালকদের মতে, আর্থিক অসচ্ছলতা কিংবা স্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেক মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। এই সমস্যা মোকাবিলায় প্রতি সপ্তাহে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন করা হয়, যেখানে সব ধর্মের মানুষ কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা রোগীদের পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থাও করে দেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও সিলসিলা ত্রাণ ও মানবিক সহায়তামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং বহু পরিবারের পাশে দাঁড়ায়। এছাড়া রোগী পরিবহন এবং মৃতদেহ বহনের জন্য অত্যন্ত স্বল্প খরচে অ্যাম্বুলেন্স সেবা প্রদান করা হয়। যেসব পরিবার অর্থ পরিশোধে অক্ষম, তাঁদের জন্য এই সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এই উদ্যোগগুলো সমাজসেবায় খানকাহগুলোর ঐতিহ্যবাহী মানবিক ভূমিকারই ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ।
 
ভ্রাতৃত্ব ও জাতীয় সম্প্রীতির বার্তা
 
সিলসিলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো আন্তঃধর্মীয় সংলাপ কর্মসূচি, যেখানে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ একত্রিত হন। এই কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমে পারস্পরিক আলোচনা, ভুল ধারণা দূরীকরণ এবং একে অপরের প্রতি বোঝাপড়া ও শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পায়। অধ্যাপক মাসুদুর রহমানের ভাষায়, খানকাহগুলো কখনোই শুধু শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করেনি; বরং বাস্তব কাজের মাধ্যমে জাতীয় সংহতি ও সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে এসেছে।
 
তাঁর মতে, শান্তি, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্মান ভারতের সভ্যতার অন্যতম বড় শক্তি। আর সুফি প্রতিষ্ঠানগুলো বরাবরই এই মূল্যবোধকে তৃণমূল পর্যায়ে রক্ষা ও বিকশিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি আরও বলেন, ন্যায়বিচার এবং ভালোবাসার পরিবেশ ছাড়া কোনো সভ্য সমাজ গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। খানকাহ মুনেমিয়া মিঠান ঘাট আজও সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য তার দরজা উন্মুক্ত রেখেছে এবং প্রয়োজনমতো মানসিক ও বাস্তব সহায়তা দিয়ে চলেছে।
 
কম্পিউটার ক্লাস এবং অধ্যাপক মাসুদুর রহমান
 
সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম
 
সিলসিলা নিয়মিতভাবে প্রখ্যাত আলেম, চিন্তাবিদ এবং সাহিত্যিকদের স্মরণে সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করে, যাঁরা জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সংগঠনটি ধর্মীয়, শিক্ষামূলক ও সাহিত্যবিষয়ক বিভিন্ন বইও প্রকাশ করে। এই বইগুলো স্কুলের শিক্ষার্থী, তরুণ সমাজ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিতরণ করা হয়, যাতে নতুন প্রজন্ম ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে পারে।

অন্যান্য জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ
 
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি প্রয়োজনে সিলসিলা আর্থিক ও আইনি সহায়তাও প্রদান করে। অধ্যাপক মাসুদুর রহমান জানান, সংগঠনটি প্রচলিত অর্থে জনসাধারণের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে না। সংগঠনের সদস্য এবং সমাজের দানশীল ব্যক্তিদের স্বেচ্ছা অনুদানেই শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। রমজান মাসে সদকা ও জাকাত গ্রহণ করা হয় এবং সেই অর্থ বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে ব্যয় করা হয়।
 
খানকাহ মুনেমিয়া মিঠান ঘাটের প্রাঙ্গণেই সিলসিলার কার্যালয় অবস্থিত, যেখান থেকে সব কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতি বছর শহরের সব প্রধান মুসলিম সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে সিলসিলা একটি অভিন্ন রমজান সময়সূচি প্রস্তুত করে। দীর্ঘদিন ধরে এই ঐকমত্যভিত্তিক সময়সূচি প্রকাশিত ও অনুসৃত হয়ে আসছে, যা মুসলিম সমাজের মধ্যে ঐক্য, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সমন্বয়ের প্রতি সংগঠনটির অঙ্গীকারের প্রতিফলন।