মাস্কাটে সুলতান হাইথাম বিন তারিক আল-এর সাথে লুলু গ্রুপের এম.এ ইউসুফ আলি-এর সাক্ষাতের একটি মুহূর্তে
শঙ্কর কুমার
গত কয়েক বছরে গালফ দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অভূতপূর্ব গভীরতা ও বিস্তার লাভ করেছে। বিশেষত গত এক দশকে এই সম্পর্ক নতুন উদ্দীপনা ও তাৎপর্য অর্জন করলেও, বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সেতু নির্মাণের অনেক আগেই লক্ষ লক্ষ ভারতীয় প্রবাসী তাদের শ্রম, উদ্যোগ ও জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই বন্ধনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।
বিশেষ করে গালফ অঞ্চলে ভারতীয় ব্যবসায়িক নেতারা ভারতের জন্য যে বিপুল সদিচ্ছা (goodwill) তৈরি করেছেন, তার ফলেই সরকারিভাবে সম্পর্ক জোরদার হওয়ার সময় সহযোগিতা চুক্তি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং মানুষে-মানুষে সংযোগ অনেক সহজ হয়েছে।
লুলু গ্রুপের এম এ ইউসুফ আলি
আজ লুলু গ্রুপের এম এ ইউসুফ আলি, ল্যান্ডমার্ক গ্রুপের মিকি জগতিয়ানি, সোভা গ্রুপের পিএনসি মেনন, ডিএম গ্রুপের ড. আজাদ মুপেন, ড্যানিউব গ্রুপের রিজওয়ান সাজান এবং স্টার গ্রুপের সৈয়দ সালাহুদ্দিন, এই নামগুলো গালফ দেশগুলোতে প্রায় ঘরে ঘরে পরিচিত।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ওমান, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতে বিস্তৃত তাদের ব্যবসা শুধু স্বাগতিক দেশগুলোর অর্থনীতিতে অবদান রাখছে না, একই সঙ্গে বিশ্বমঞ্চে ভারতের মর্যাদা ও অবস্থান শক্তিশালী করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ভারতীয় উদ্যোক্তাদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি
ভারত যখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে, তখন ভারতীয় প্রবাসীদের গুরুত্ব ভারত এবং স্বাগতিক, উভয় দেশের কাছেই বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে গালফ অঞ্চলের ভারতীয় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়িক নেতারা ওই অঞ্চলের বাণিজ্য ও শিল্পে গভীর ছাপ রেখে চলেছেন এবং ক্রমশ ভারতের সফট পাওয়ার কূটনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
ডিএম গ্রুপের ড. আজাদ মুপেন
গালফ দেশজুড়ে ভারতীয় মালিকানাধীন ব্যবসার সংখ্যা গত কয়েক বছরে বহুগুণে বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দুবাই চেম্বার অব কমার্সের এক নতুন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ভারত থেকে ৯,০৩৮ জন নতুন ব্যবসায়িক নেতা চেম্বারের সদস্য হয়েছেন।
একইভাবে, সৌদি আরবে বর্তমানে ৩,০০০-এরও বেশি ভারতীয় উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। রিয়াদে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৩ পর্যন্ত সৌদি আরবে ভারতের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিনিয়োগগুলি নির্মাণ, টেলিকমিউনিকেশন, তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক পরিষেবা, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ওষুধ শিল্প, পরামর্শ ও ব্যবস্থাপনা খাতে বিস্তৃত।
ওমান, যেখানে ছয় লক্ষেরও বেশি ভারতীয় বসবাস করেন, সেখানে ৬,০০০-এর বেশি ভারতীয় উদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে, যাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ আনুমানিক ৭.৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এই উপস্থিতি নয়াদিল্লি ও মাস্কাটের মধ্যে শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১০.৬১৩ বিলিয়ন ডলার।
গালফার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনট্র্যাক্টিং-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. পি মোহাম্মদ আলি, কেভি গ্রুপের আবদুল ওয়াহিদ এ কে
ওমানে ভারতীয় সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন অন্যতম প্রভাবশালী ও খ্যাতনামা ব্যবসায়িক গোষ্ঠী হলো খিমজি রামদাস গ্রুপ। এই গোষ্ঠীর প্রধান কানাক্সি খিমজিকে ওমানের সুলতান ‘শেখ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। কথিত আছে, কানাক্সি খিমজি ছিলেন সেই ‘হিন্দু শেখ’, যিনি একসময় ওমানের সুলতানকে ঋণ প্রদান করতেন।
এছাড়াও পিএনসি মেনন, গালফার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনট্র্যাক্টিং-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. পি মোহাম্মদ আলি, কেভি গ্রুপের আবদুল ওয়াহিদ এ কে, মুস্তাফা সুলতান এন্টারপ্রাইজেসের রাজীব শর্মা এবং আল মাহা সিরামিকসের রাজীব সিং, ওমানের ব্যবসায়িক পরিমণ্ডল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
গালফ দেশগুলোর উন্নয়নে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের অবদান
একইভাবে, কাতারে প্রায় ২০,০০০ ভারতীয় উদ্যোক্তাকে নিয়ে গঠিত ব্যবসায়িক সম্প্রদায় দেশটির শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামোর পেছনে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। নির্মাণ, রিয়েল এস্টেট, পরিকাঠামো, খুচরো বাণিজ্য, উৎপাদন, আতিথেয়তা ও পরিষেবা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অবদান কাতার ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কাতারের উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে, যখন পরিকাঠামো নির্মাণ ছিল জাতীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রবিন্দু, তখনই বহু ভারতীয় উদ্যোক্তা সেখানে পাড়ি জমান। আজ তারা দেশটির বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলির কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
আরপি গ্রুপের কর্ণধার রবি পিল্লাই
অন্যদিকে, বাহরাইনে ভারতীয় উদ্যোক্তারা প্রমাণ করেছেন যে নয়াদিল্লি ও মানামার অর্থনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করতে তারা কোনো প্রচেষ্টাই বাকি রাখবেন না। বাহরাইনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এই ব্যবসায়ীরা তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও উৎপাদন খাতে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি গড়ে তুলেছেন। বাহরাইন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর ২০২০ পর্যন্ত দেশে ৭,৫০০-এরও বেশি ভারতীয় মালিকানাধীন বা যৌথ উদ্যোগের সংস্থা নথিভুক্ত ছিল।
আরপি গ্রুপের কর্ণধার রবি পিল্লাই ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাহরাইনের রাজা হামাদ বিন ইসা আল খলিফার কাছ থেকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মান ‘মেডেল অব এফিসিয়েন্সি’ লাভ করেন। রাজকীয় আদেশে বলা হয়, “এই সম্মান রাজ্যের জন্য ড. পিল্লাইয়ের অসামান্য অবদান, বিশেষত শোধনাগার পরিচালনা, স্থানীয় সম্প্রদায় উন্নয়ন এবং বাহরাইনের বৈশ্বিক অবস্থান সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে, রাজা মহোদয়ের গভীর কৃতজ্ঞতার প্রতিফলন।” ১২ বিলিয়ন ডলারের টার্নওভার নিয়ে আজ আরপি গ্রুপ শুধু বাহরাইনেই নয়, সমগ্র জিসিসি অঞ্চলে উদ্যোক্তাগত নেতৃত্বের প্রতীক।
কেসিসি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনট্র্যাক্টিং কোম্পানির কে জি আব্রাহাম ও অটোমোবাইল খাতে সুপরিচিত কুলদীপ সিং লাম্বা
কুয়েতে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দৃঢ় অবস্থান
কুয়েতে ভারতীয় ব্যবসায়িক সম্প্রদায় বিশেষ করে খুচরো বাণিজ্য ও ডিস্ট্রিবিউশন খাতে শক্ত ভিত গড়ে তুলেছে। কেসিসি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনট্র্যাক্টিং কোম্পানির কে জি আব্রাহাম, অটোমোবাইল খাতে সুপরিচিত কুলদীপ সিং লাম্বা, জনপ্রিয় মুঘল মহল রেস্তোরাঁ চেনের নেপথ্যে থাকা অশোক কালরা, জতিন্দর সুরি ও মুকেশ কুমার, কিটকো গ্রুপের ধীরজ ওবেরয় এবং জশানমাল ন্যাশনাল কোম্পানির টনি জশানমাল, এই নামগুলো কুয়েতের বাজারে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন। তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো ধারাবাহিক মানসম্পন্ন পণ্য ও পরিষেবা।
বাণিজ্য ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে ভারতীয়দের এই বিস্তৃত উপস্থিতিই আজ ভারত–গালফ সম্পর্কের মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে। বাজার, সংস্কৃতি ও সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে তারা একদিকে যেমন মানুষে-মানুষে সম্পর্ককে দৃঢ় করেছেন, তেমনই অন্যদিকে স্বাগতিক দেশগুলোর উন্নয়ন দর্শনের সঙ্গেও নিজেদের ভূমিকা নিখুঁতভাবে মিলিয়ে নিয়েছেন।
(লেখক একজন স্বাধীন সাংবাদিক, যিনি আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি নিয়ে লেখালেখি করেন।)