পণ্ডিত নেহরু, খামেইনি এবং পরিবর্তিত বিশ্বের বাস্তবতা

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 2 h ago
পণ্ডিত নেহরু, খামেইনি এবং পরিবর্তিত বিশ্বের বাস্তবতা
পণ্ডিত নেহরু, খামেইনি এবং পরিবর্তিত বিশ্বের বাস্তবতা

মালিক আসগর হাশমী

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেইনি আর এই পৃথিবীতে নেই। তাঁর মৃত্যুর পর পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে জটিল হয়ে গেছে। ইসরায়েল ও আমেরিকার যৌথ অভিযানের ফলে ইরানকে নিশানা করা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরীয় দেশসমূহ (গালফ দেশসমূহ) এর ওপর মিসাইল এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার প্রভাব মুসলিম বিশ্বেও বিভাজন সৃষ্টি করেছে। মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ এবং ওআইসি-এর মতো সংগঠনসমূহ ইরানের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংযুক্ত আরব আমিরাত-এর শাসকদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটি পরিবর্তিত বৈশ্বিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

কিন্তু এই তীব্র উত্তেজনা এবং যুদ্ধের খবরের মাঝে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিন্ন ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে। মানুষ খামেইনির সেই পুরনো ভিডিওগুলো ব্যাপকভাবে শেয়ার করছে, যেখানে তাঁকে ভারত এবং পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর প্রশংসা করতে দেখা গেছে। ভারতের প্রতি খামেইনির দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় একরকম ছিল না। তিনি একাধিকবার কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সমালোচনা করেছেন, যার কারণে ভারতের বড় অংশের মানুষ তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। তবুও, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পণ্ডিত নেহরুর প্রতি খামেইনির মনে একটি বিশেষ ধরনের সম্মান ছিল।

খামেইনি প্রায়শই ইরানের যুবসমাজকে সম্বোধন করার সময় ভারতকে উল্লেখ করতেন। তিনি চাইতেন যে ইরানের যুবক-যুবতীরা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং নেহরুর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে খামেইনি নেহরুর বিখ্যাত গ্রন্থ বিশ্ব ইতিহাসের কিছু ঝলক পড়ার দৃঢ় প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, যদি কেউ বুঝতে চায় কিভাবে পশ্চিমা দেশগুলো সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে ভারতকে দাসত্বে রাখেছিল এবং লুটপাট করেছিল, তবে তাকে অবশ্যই নেহরুর লেখা পড়া উচিত।

 

সাংবাদিক, সমাজকর্মী এবং বলিউড শিল্পীরাও এই ভিডিওটি যথেষ্ট আগ্রহের সঙ্গে শেয়ার করেছেন। চলচ্চিত্র সমালোচক কে আর কের ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন যে একজন শিক্ষিত মানুষই জ্ঞান ও শিক্ষার মূল্য বুঝতে পারে। অন্যদিকে সাংবাদিক গোবিন্দ প্রতাপ সিং লিখেছেন যে খামেইনি খুবই বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছিলেন কিভাবে ইংরেজরা ভারতে এসে নিজের ‘দুর্নীতি ও শাসন’ চালিয়েছিল, এবং নেহরু কিভাবে তা সুন্দরভাবে তার বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভিডিও শেয়ার করার পেছনে একটি রাজনৈতিক বার্তাও নিহিত আছে। বিরোধী শিবির এবং নেহরুর সমর্থকরা মনে করেন, যখন সমগ্র বিশ্ব নেহরুর দূরদর্শিতা এবং পাণ্ডিত্য স্বীকার করছে, তখন ভারতের একাংশ মানুষ এখনও তাকে অবমূল্যায়ন করছে। খামেইনির এই ভাষণ বর্তমান সময়ে নেহরুর উত্তরাধিকারের উপর চলমান বিতর্ককে নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।

খামেইনি এবং প্রধানমন্ত্রী মোদীর সম্পর্কের কথা বলতে গেলে, এটি অনেকাংশে কূটনৈতিক এবং আন্তরিকতার মিশ্রণ ছিল। দুই নেতার সাক্ষাৎকারের বহু ছবি আজও ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। চাবাহার বন্দরের মতো প্রকল্প দুটো দেশকে কাছাকাছি আনার কাজে সাহায্য করেছিল। কিন্তু খামেইনির মৃত্যু এবং তার পর ইরানের আক্রমণাত্মক সামরিক নীতির কারণে ভারতও সতর্কভাবে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। ইরান যখন উপসাগরীয় দেশগুলোর উপর আক্রমণ চালায়, তখন ভারতের জন্য নিজের প্রাচীন বন্ধু সংযুক্ত আরব আমিরাতও সৌদি আরবদের পাশে থাকা অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে।

আজ যখন উপসাগরীয় দেশগুলো ইরান থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে, ভারতের কূটনীতি নিজের কল্যাণ এবং বিশ্বশান্তির প্রতি লক্ষ্য রেখে এগোচ্ছে। ভারত ইরানের আক্রমণের পর সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী সংযুক্ত আরব আমিরাত-এর শাসকদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন, যা এই কৌশলগত পদক্ষেপেরই অংশ। ভারত চাইছে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আগুন বেশি ছড়িয়ে না পড়ুক, কারণ সেখানে লাখ লাখ ভারতীয় বসবাস করছে এবং ভারতের শক্তি নিরাপত্তাও সেই অঞ্চলের উপর নির্ভরশীল।

 

খামেইনির মৃত্যুর পর এখন ইরানের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা বড় প্রশ্ন। কিন্তু তার পুরনো মন্তব্যগুলো ভারতীয় সমাজে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। একদিকে কঠোরপন্থী মতাদর্শ ও যুদ্ধের তাণ্ডব, অন্যদিকে নেহরুর বই ও ইতিহাসের শিক্ষা। খামেইনির নেহরুপ্রেমই প্রমাণ করে যে আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, জ্ঞান এবং সংগ্রামের গল্প সীমা অতিক্রম করে মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। ইরান ও ভারতের সম্পর্ক এখন কেমন হবে, তা সময়ই দেখাবে, কিন্তু নেহরুর সেই বিশ্ব ইতিহাসের কিছু ঝলক ইরান থেকে ভারত পর্যন্ত আজও প্রাসঙ্গিক।