ইমাম-এ-হিন্দ রাম: আল্লামা ইকবালের চোখে মর্যাদা পুরুষোত্তমের মহিমা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
ইমাম-এ-হিন্দ রাম: আল্লামা ইকবালের চোখে মর্যাদা পুরুষোত্তমের মহিমা
ইমাম-এ-হিন্দ রাম: আল্লামা ইকবালের চোখে মর্যাদা পুরুষোত্তমের মহিমা
 
গাউস শিবানী

ভারতীয় উপমহাদেশের মহান চিন্তাবিদ ও কবিদের মধ্যে আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ধর্ম, সংস্কৃতি, মানবতা এবং আধ্যাত্মিকতাকে এক বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছিলেন। যদিও তিনি একজন ধর্মনিষ্ঠ মুসলিম এবং ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রবল সমর্থক ছিলেন, তবুও অন্যান্য ধর্মের মহান ব্যক্তিত্ব ও ভাবধারার প্রতিও তিনি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। যখনই তিনি তাঁদের শিক্ষা ও চিন্তাকে প্রশংসার যোগ্য বলে মনে করেছেন, তখনই তিনি তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন।

হিন্দু ব্যক্তিত্বদের মধ্যে যাঁদের প্রতি ইকবাল গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন মর্যাদা পুরুষোত্তম ভগবান রাম, এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার নাম ও কর্ম ভারতের প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে পরিচিত এবং যার কাহিনি বিশ্বের বহু অঞ্চলে জানা যায়। ইকবাল অসাধারণ শ্রদ্ধার সঙ্গে রামকে স্মরণ করেছেন এবং তাঁকে শুধু একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়, বরং ভারতের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
 
আল্লামা ইকবাল (বাঁদিকে), ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে
 
ভগবান রাম কে ছিলেন?
 
ভগবান রামের কাহিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতে প্রচলিত। যদিও রামায়ণ একটি মহাকাব্য, তবুও গল্প বলা, অভিনয় এবং মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে রামের কাহিনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে। রামায়ণ এই কাহিনির প্রধান সাহিত্যিক উৎস এবং মুঘল যুগে এটি ফারসি ভাষায়ও অনূদিত হয়েছিল।
 
রামায়ণ অনুসারে, শ্রী রামচন্দ্র ছিলেন অযোধ্যার রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র। তাঁর বিবাহ হয়েছিল সীতার সঙ্গে, যিনি তাঁর পুণ্য ও সতীত্বের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। পিতার পর রামের সিংহাসনে বসার কথা ছিল। কিন্তু তাঁর সৎমা কৈকেয়ী নিজের পুত্র ভরতকে রাজা করতে চেয়েছিলেন এবং রামকে বনবাসে পাঠান।
 
রামের ছোট ভাই লক্ষ্মণ এবং তাঁর স্ত্রী সীতা তাঁর সঙ্গে বনে যান। বনবাসের সময় লঙ্কার রাজা রাবণ সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে যায়। হনুমান ও তাঁর বাহিনীর সহায়তায় রাম সীতাকে উদ্ধার করেন। ১৪ বছরের বনবাস শেষে তিনি অযোধ্যায় ফিরে আসেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে ভরত রামের কাঠের খড়ম সিংহাসনে স্থাপন করে রাজ্য পরিচালনা করেন, যা তাঁর ভাইয়ের ন্যায্য অধিকারকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরেছিল।
 
রামের বীরত্ব, মানবিকতা এবং পিতামাতার ইচ্ছার প্রতি তাঁর অটল আনুগত্য তাঁর কাহিনির কেন্দ্রীয় বিষয়। এ কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাঁর কাহিনি ভারতীয় সংস্কৃতির গভীরে স্থান করে নিয়েছে এবং প্রতি বছর দশেরা উপলক্ষে রামলীলা হিসেবে মঞ্চস্থ হয়। রামের কাহিনি ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডসহ বহু দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
 
রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের বনবাসের একটি চিত্র
 
ইকবালের কাছে রাম ছিলেন বাস্তব ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব
 
আল্লামা ইকবাল রামকে একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করতেন এবং শুধু কবিতায় নয়, গদ্যেও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। আসরার-এ-খুদি গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন,  “যে ‘অর্থের বধূ’ (আরুস-এ-মাআনি)-র পর্দা শ্রীকৃষ্ণ, শ্রী রাম এবং রামানুজ উন্মোচন করতে চেয়েছিলেন, শ্রীশঙ্করের যুক্তির মোহে সেই বধূ আবার আবৃত হয়ে যায় এবং শ্রীকৃষ্ণের সম্প্রদায় সেই নবজাগরণের ফল থেকে বঞ্চিত হয়।” এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে ইকবাল শ্রী রাম ও শ্রীকৃষ্ণকে নিছক কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে দেখেননি। বরং তিনি তাঁদের ভারতীয় দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের বৃহত্তর পরিসরে স্থান দিয়েছিলেন।
 
ইকবাল হিন্দু দর্শনের দুটি ধারার মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেছিলেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রী রাম এবং রামানুজের সঙ্গে সম্পর্কিত শিক্ষাগুলি জীবন, নৈতিকতা, কর্ম এবং ঈশ্বরের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্কের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর দৃষ্টিতে, এই ব্যক্তিত্বরা মানবজাতিকে আধ্যাত্মিক উন্নতি, প্রেম, আত্মত্যাগ এবং বাস্তব জীবনের মাধ্যমে ঈশ্বরের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার শিক্ষা দিয়েছেন। ইকবাল এই গভীর আধ্যাত্মিক সত্যকে আরুস-এ-মাআনি বা “অর্থের বধূ” বলে বর্ণনা করেছিলেন, এক এমন চিরন্তন সত্য, যা মানবজীবনকে অর্থ ও উদ্দেশ্য প্রদান করতে পারে।
 
ইকবালের কবিতা ‘রাম’
 
ইকবালের কবিতায় রামের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা বিশেষভাবে স্পষ্ট। ইকবালের দৃষ্টিতে, কোনো কাল্পনিক চরিত্রকে তিনি কখনোই ইমাম-এ-হিন্দ, অর্থাৎ “ভারতের নেতা”, এর মতো উচ্চ মর্যাদার উপাধিতে ভূষিত করতেন না।
বাং-এ-দারা কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘রাম’ এই শ্রদ্ধার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ। এতে ইকবাল রামকে শুধু একজন শ্রদ্ধেয় হিন্দু ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়, বরং ভারতের সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক মহান ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরেছেন।
 
তিনি কবিতার শুরুতে লিখেছেন, 
 
“লব্‌রেজ হ্যায় শরাব-এ-হকিকত সে জাম-এ-হিন্দ
সব ফালসাফি হ্যায়ঁ খিত্তা-এ-মাগরিব কে রাম-এ-হিন্দ”
 
ইকবাল এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে সত্যের মদে পরিপূর্ণ একটি পেয়ালা হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই চিত্রকল্পে রাম সেই ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হন।
 
রামলীলার একটি দৃশ্য
 
দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিতে তিনি রামের মর্যাদাকে আরও উঁচুতে নিয়ে গিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে, পাশ্চাত্যের দার্শনিকরাও ভারতের রামের মহত্ত্বের সামনে তুচ্ছ মনে হয়। এখানে শুধু দার্শনিক জ্ঞানের কথা বলা হয়নি, বরং রামের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উচ্চতার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইকবালের কাছে রামের গুরুত্ব বিমূর্ত চিন্তার বাইরে গিয়ে নৈতিকতা, নেতৃত্ব এবং মানবিক আচরণের ক্ষেত্রেও বিস্তৃত ছিল।
 
আরও একটি বিখ্যাত শেরে তিনি লিখেছেন, 
 
“হ্যায় রাম কে উজুদ পে হিন্দোস্তান কো নাজ
আহল-এ-নজর সমঝতে হ্যায়ঁ উসকো ইমাম-এ-হিন্দ”
 
উর্দু কবিতায় ভগবান রামকে নিয়ে রচিত শ্রেষ্ঠ পঙ্‌ক্তিগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম বলে বিবেচিত হয়। ইকবাল রামকে ইমাম-এ-হিন্দ বলেছেন। এখানে ‘ইমাম’ শব্দটিকে সংকীর্ণ ধর্মীয় অর্থে বোঝার প্রয়োজন নেই; বরং এটি একজন পথপ্রদর্শক, নেতা এবং নৈতিক দিকনির্দেশকের ভাব প্রকাশ করে। এই অভিব্যক্তির মাধ্যমে ইকবাল রামকে ভারতীয় সভ্যতার সেইসব মহান ব্যক্তিত্বের সারিতে স্থান দিয়েছেন, যাঁদের চরিত্র ও আচরণ সমাজের জন্য একটি নৈতিক আদর্শ তৈরি করেছে।
 
ইকবাল আরও লিখেছেন, 
 
“হ্যায় ইস কে শান-এ-করামত সে হিন্দোস্তান কা চিরাগ
শাম-এ-হিন্দোস্তান সে ভি রোশন হ্যায় সাহর-এ-হিন্দ”
 
এখানে রামকে “পথনির্দেশের প্রদীপ” বা চিরাগ-এ-হিদায়ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা তাঁর চরিত্র ও শিক্ষার মাধ্যমে ভারতের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনকে আলোকিত করে। এই চিত্রকল্প ইকবালের সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন, যেখানে সত্যিকারের মহান ব্যক্তিরা তাঁদের চরিত্র ও আচরণের মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করেন।
 
কবিতার শেষাংশে রামের শারীরিক সাহস এবং অন্তর্গত গুণাবলির প্রশংসা করা হয়েছে, 
 
“তলোয়ার কা ধনী থা, শুজাআত মে ফার্দ থা
পাকিজ়গি মে আওর জোশ-এ-মোহব্বত মে ফার্দ থা”
 
ইকবাল রামকে তলোয়ারের অধিকারী এবং বীরত্বে অতুলনীয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু তাঁর প্রশংসা কেবল সামরিক শক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সমানভাবে রামের পবিত্রতা এবং প্রেমের উদ্দীপনার উপরও জোর দিয়েছেন।
 
পাকিজ়গি অর্থ পবিত্রতা, যা মহৎ চরিত্র, সত্যনিষ্ঠা, সততা এবং নৈতিক অখণ্ডতার দিকে ইঙ্গিত করে। জোশ-এ-মোহব্বত বা প্রেমের উদ্দীপনা বলতে বোঝায় করুণা, সহমর্মিতা, আত্মত্যাগ এবং ভক্তি। সুতরাং ইকবালের উপস্থাপনায় রামের মহত্ত্ব কেবল একজন যোদ্ধা হিসেবে তাঁর দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁর চরিত্রের গুণাবলি এবং মানবিকতার গভীরতার মধ্যেই তাঁর প্রকৃত মহত্ত্ব নিহিত।
 
থাইল্যান্ডে রামলীলার একটি দৃশ্য
 
রামের ব্যক্তিত্ব
 
ইকবালের রামের উপস্থাপনা তাঁকে শুধু একজন ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। তিনি রামকে সত্য, আত্মত্যাগ, ন্যায়, ভক্তি, ধৈর্য এবং উচ্চ নৈতিক চরিত্রের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। পিতামাতার প্রতি আনুগত্য, নিজের কথা রাখা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং নিজের জনগণের সেবা, রামের প্রচলিত চরিত্রচিত্রণে এই গুণগুলিই গুরুত্বপূর্ণ। আর ইকবালও এই গুণগুলিকেই প্রকৃত মহত্ত্বের লক্ষণ হিসেবে দেখেছিলেন।
 
খুদি বা আত্মসত্তার ধারণা ইকবালের দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে। খুদি বলতে শুধু স্বার্থপরতা বা নিজের কথা ভাবাকে বোঝায় না। এর অর্থ হলো চরিত্র, আত্মসংযম, আত্মত্যাগ এবং সত্যের অনুসরণে অটল থাকার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও নৈতিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটানো। ইকবালের ব্যাখ্যায়, রামের মধ্যে এই গুণগুলির অনেকগুলিই বিদ্যমান ছিল। তাই তাঁর জীবন ইকবালের কাছে সেই নৈতিক শক্তি ও আত্মশৃঙ্খলার এক উদাহরণ হয়ে উঠেছিল, যাকে তিনি গভীরভাবে মূল্য দিতেন।
 
ফলে ইকবালের ‘রাম’ কবিতা শুধু একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়। এটি ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধারও একটি উদাহরণ। রামকে ইমাম-এ-হিন্দ হিসেবে সম্মান জানিয়ে ইকবাল তাঁকে এমন একজন মহান নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, যার গুরুত্ব কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
 
এই কবিতা ইকবালের বুদ্ধিবৃত্তিক উদারতার সাক্ষ্য বহন করে এবং তাঁর সেই বিশ্বাসকে তুলে ধরে যে, প্রকৃত মহত্ত্বের মাপকাঠি ধর্মীয় পরিচয় নয়; বরং চরিত্র, নৈতিকতা, সাহস, আত্মত্যাগ এবং মানবতার সেবার মধ্যেই প্রকৃত মহত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায়।


শেহতীয়া খবৰ