‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’-এর পডকাস্ট “দ্বীন অউর দুনিয়া” য় সাকিব সালিমের সঙ্গে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মুবিন জাহরা
নয়াদিল্লি
নারীদের ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাঁদের সকলকে ধর্মতত্ত্ববিদ হতে হবে না, তবে ধর্ম নিজে পড়ে বোঝার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ সচেতন ও জ্ঞানসম্পন্ন নারীই সঠিক-ভুল বিচার করতে পারেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে সক্ষম হন।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মুবিন জাহরা ‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’-এর বিশেষ পডকাস্ট “দ্বীন অউর দুনিয়া” (Deen aur Duniya)-য় সাকিব সালিমের সঙ্গে আলোচনায় এই মত প্রকাশ করেন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভারতের মুসলিম নারীদের বর্তমান সমস্যা এবং উন্নতির সম্ভাব্য পথ।
ড. সৈয়দ মুবিন জাহরা
ড. জাহরা বলেন, ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের জন্য নারীদের শুধু অন্যের কথার উপর নির্ভর করে থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, “শুধু শুনে সন্তুষ্ট থেকো না, নিজে পড়ো এবং বোঝো।” ‘ইকরা’ (Read)-র আহ্বান স্মরণ করিয়ে তিনি জানান, সবাইকে আলেম হতে হবে না, কিন্তু পড়াশোনা ও বোঝার অভ্যাস থাকা জরুরি। কোনো প্রশ্ন দেখা দিলে তা নিজে পড়ে জানার চেষ্টা করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, নারীদের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতে পারেন এমন ধর্মীয় নেতৃত্বেরও প্রয়োজন রয়েছে। হজরত জয়নাব বিনতে আলির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, তাঁর কণ্ঠ না থাকলে কারবালার যুদ্ধের ইতিহাস আজ যেভাবে জানা যায়, সেভাবে হয়তো সংরক্ষিত হতো না। এসব উদাহরণ ইসলামের ইতিহাসে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার সাক্ষ্য বহন করে।
বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় বহু ক্ষেত্রে মেয়েরা ছেলেদের থেকেও এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সমস্যা শুরু হয় যখন পড়াশোনা শেষ হয়ে বাস্তব জীবনের দায়িত্ব সামনে আসে। বহু মেয়ে স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরোলেও জীবনের এক সময়ে সংসারের দায়িত্বে জড়িয়ে পড়ে, ফলে তাঁদের স্বপ্ন ও পেশাগত সম্ভাবনা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়।
ড. জাহরার মতে, এটি শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল নয়, বরং সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন। ছোটবেলা থেকেই ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা প্রত্যাশা তৈরি করা হয়। ছেলেদের বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহ দেওয়া হয়, অথচ মেয়েদের প্রায়শই সীমিত লক্ষ্যেই আটকে রাখা হয়। এই মানসিকতাই তাঁদের শিক্ষা ও কর্মজীবনের পথ নির্ধারণ করে দেয়।
একই সঙ্গে তিনি ইতিবাচক পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করেন। বিশেষ করে মুসলিম সমাজে এখন বহু অভিভাবক তাঁদের কন্যাদের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। বহু নারী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন এবং শিক্ষকতা-সহ নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তবুও, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্পোরেট নেতৃত্বের জায়গায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনও কম।
সাকিব সালিম ও ড. সৈয়দ মুবিন জাহরা
ড. জাহরা জানান, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নারী-পুরুষ বৈষম্যের চিত্র এক নয়। উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং রাজস্থানের মতো রাজ্যে এই ব্যবধান ১৮ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। অন্যদিকে কেরলের মতো দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে এই ফারাক অনেক কম, প্রায় ২.২ শতাংশ। এই পার্থক্য শুধু পরিসংখ্যান নয়, সামাজিক মানসিকতা, শিক্ষার ইতিহাস এবং সংস্কার আন্দোলনের ফল।
পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ তুলে তিনি বলেন, এই রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক সংস্কার ও শিক্ষার ঐতিহ্য রয়েছে। নারীশিক্ষা, সতীদাহ প্রথা বিলোপ এবং বিধবা বিবাহের মতো আন্দোলনে নারী-পুরুষ উভয়ের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এর থেকেই বোঝা যায়, সমাজ একসঙ্গে এগিয়ে এলে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব হয়।
তিনি বলেন, “প্রশ্নটা নারীরা কী চান, তা নয়, তাঁদের জন্য কী সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে, সেটাই আসল বিষয়।” নারীরা সবসময়ই বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে চেয়েছেন, কিন্তু সামাজিক বাধা তাঁদের পথ রুদ্ধ করেছে। ভারতের বিমান পরিবহণ ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান মহিলা পাইলটের সংখ্যা প্রমাণ করে, সুযোগ পেলে নারীরা যে কোনো ক্ষেত্রেই সাফল্য অর্জন করতে পারেন।
ড. জাহরা চিকিৎসা ক্ষেত্রের উদাহরণও দেন। বিপুল সংখ্যক নারী এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হলেও বিশেষায়ন এবং সুপার-স্পেশালাইজেশনের স্তরে তাঁদের সংখ্যা কমে যায়। অনেকেই গাইনোকোলজি, পেডিয়াট্রিক্স এবং অ্যানেস্থেসিয়ার মতো শাখায় বেশি যাচ্ছেন, কিন্তু সার্জারি, কার্ডিওলজি বা নিউরোসার্জারির মতো ক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম।
তাঁর মতে, এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক কারণ বা রোগীদের পছন্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। একই পরিস্থিতি পুরুষদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, তবুও মর্যাদাপূর্ণ বিশেষ শাখাগুলিতে তাঁরাই বেশি দৃশ্যমান। সমস্যার শিকড় রয়েছে সামাজিক কাঠামো ও অসম সুযোগের মধ্যে।
তিনি এক মহিলা চিকিৎসকের মন্তব্যের উল্লেখ করেন, যিনি একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলে বলেছিলেন যে এমন সব প্যানেলই পুরুষ-প্রধান। ড. জাহরা বলেন, “সমস্যা দক্ষতার নয়, প্রতিনিধিত্বের।” নারীরা যোগ্য ও সক্ষম হলেও তাঁদের নেতৃত্বের সুযোগ কম দেওয়া হয়। ফলে এক অদৃশ্য বাধা তাঁদের অগ্রগতিকে আটকে রাখে।
ইসলামের ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে ড. মুবিন জাহরা বলেন, হজরত জয়নাবের বিবরণ না থাকলে বিশ্ব কারবালার প্রকৃত সত্য জানতে পারত না। তিনি আরও বলেন, রাজিয়া সুলতানা, পণ্ডিতা রামাবাই, রানি লক্ষ্মীবাই, হাব্বা খাতুন এবং মীরাবাই তাঁদের নিজ নিজ সময়ে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি বলেন, “আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমরা নারীদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখি না, বরং নির্দিষ্ট লিঙ্গভূমিকায় বেঁধে রাখি। এই চিন্তাধারা না বদলালে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।” এদিকে সাকিব সালিম বলেন, বহু ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন।
জবাবে ড. জাহরা বলেন, পরিবর্তন শুধু আইন বা শিক্ষার মাধ্যমে আসে না। পরিবর্তন তখনই আসে, যখন পরিবার ও সমাজ নিজেদের মানসিকতা বদলায় এবং নারীদের সীমাবদ্ধ ভূমিকায় না দেখে সমান মর্যাদার মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে। একই সঙ্গে নারীর আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও এই পরিবর্তনের মূল ভিত্তি।