কণ্ঠে স্মৃতি, কথায় আবেগ: রেডিও দুনিয়ার প্রিয় মুখ আরজে সাইমা রহমান

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 7 h ago
সাইমা রহমান
সাইমা রহমান
 
অনিকা মাহেশ্বরী / নয়াদিল্লি

রেডিওর জগতে নিজের আলাদা কণ্ঠস্বর ও মুগ্ধকর উপস্থাপনার জন্য পরিচিত সাইমা রহমান, যিনি সকলের কাছে আরজে সাইমা (RJ Saima) নামে জনপ্রিয়। আজও তিনি সেইসব কণ্ঠের অন্যতম, যাঁকে শুনলেই শ্রোতাদের মনে এক বিশেষ অনুভূতি জাগে। তাঁর অনুষ্ঠান শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের জীবন, স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ‘পুরানি জিন্স’, ‘উর্দু কি পাঠশালা’, সাদাত হাসান মান্টোর গল্প নিয়ে বিশেষ পর্ব কিংবা চিরসবুজ গানের আসর, প্রতিটি অনুষ্ঠানে তিনি অতীতকে জীবন্ত করে তোলেন এবং একই সঙ্গে নতুন ভাবনার দিশা দেখান।
 
অনেকেই জানেন না, যখন একটি বেসরকারি রেডিও স্টেশন তাঁকে ‘পুরানি জিন্স’ অনুষ্ঠানটির প্রস্তাব দেয়, তখন পুরনো হিন্দি গান সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল খুবই সীমিত। তিনি মাত্র দুটি গান জানতেন, একটি তাঁর বাবা গাইতেন, “তু হিন্দু বনেগা না মুসলমান বনেগা, ইনসান কি আউলাদ হ্যায় ইনসান বনেগা”, এবং অন্যটি তাঁর মা গুনগুন করতেন, “চাঁদনি রাত হ্যায়, প্যার কি বাত হ্যায়।” এর একটি বড় কারণ ছিল, সে সময় তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওর ‘যুব বাণী’ অনুষ্ঠানে কাজ করতেন, যেখানে তাঁর পরিচয় বেশি ছিল মাইকেল জ্যাকসন, এলভিস প্রেসলি, হুইটনি হিউস্টন ও ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রার মতো পশ্চিমী শিল্পীদের সঙ্গীতের সঙ্গে। তখন তিনি ভাবতেও পারেননি, এই অনুষ্ঠানই তাঁর জীবনকে নতুন মোড় দেবে।
 
সাইমা রহমান
 
সাইমা রহমানের জন্ম ২৫ ডিসেম্বর ১৯৮৫ সালে নাইজেরিয়ায়। সেখানে তাঁর বাবা ওজাইর-এ-রহমান শিক্ষকতার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে সাইমা বলেন, “যখন আমার বয়স প্রায় দেড় বছর, আমরা ভারতে ফিরে আসি এবং দিল্লিতেই আমার বেড়ে ওঠা। আমি গুরু হরকৃষ্ণ পাবলিক স্কুলে পড়েছি, যা ছিল একটি শিখ স্কুল। সেখানে আমি ও আমার ভাইবোনরাই ছিলাম একমাত্র মুসলিম ছাত্রছাত্রী। আমি গুরুমুখী পড়তে, লিখতে ও বলতে শিখেছিলাম, যা পরে আমার তৃতীয় ভাষা হয়ে ওঠে। গান গাইতে আমার খুব ভালো লাগত, তাই স্কুলের প্রার্থনায় প্রধান গায়িকা ছিলাম। আমি শবদ ও কীর্তন গেয়েছি এবং বিভিন্ন গুরুদ্বারে কীর্তন প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিয়েছি।”
 
তিনি জানান, স্কুলে একমাত্র মুসলিম ছাত্রছাত্রী হওয়ায় তাঁদের কথা বলার ধরন অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা ছিল, যা অনেক সময় শিক্ষকদের কাছে মজার মনে হতো। কিছু শিক্ষক মজা করে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতেন, যাতে তিনি আরও বেশি কথা বলেন।
 
তবে কয়েকজন শিক্ষক তাঁকে কটাক্ষও করতেন এবং অসংবেদনশীল প্রশ্ন করতেন। যেমন, মুসলমানরা কি ঔরঙ্গজেবের উপাসনা করে? তখন ছোট হওয়ায় বিষয়টি বুঝতে না পেরে তিনি একবার মাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যা তাঁর মাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। আরেকবার এক শিক্ষক ঈদুল আজহা নিয়ে তাঁকে অপমান করে প্রশ্ন করেছিলেন, পশু কোরবানি করতে মুসলমানদের লজ্জা লাগে না? এই ঘটনা তাঁকে এতটাই আঘাত করেছিল যে তিনি কেঁদে ফেলেন। তবে তিনি বলেন, অধিকাংশ শিক্ষক ও সহপাঠীর কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছেন, তা এসব তিক্ত অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
 
সাইমা রহমান
 
দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় সাইমা একটি আন্তঃস্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। বিষয় ছিল, “যৌন শিক্ষা কি বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত?” তিনি প্রস্তাবের পক্ষে কথা বলেন, যা সে সময়ে সাহসী পদক্ষেপ বলে মনে করা হতো। দিল্লির নামী স্কুলগুলির ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে তিনি বিজয়ী হন। সেই মুহূর্তেই তিনি বুঝতে পারেন, কথা বলা তাঁর খুব প্রিয় এবং ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিতে দক্ষ হওয়া তাঁর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
 
স্কুলজীবন থেকেই সঙ্গীতের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। সঙ্গীতের সঙ্গে এই সম্পর্ক তাঁর শৈশবকে সৃজনশীল পথে এগিয়ে দেয়। শুদ্ধ উচ্চারণ, ভদ্র উপস্থাপনা, কণ্ঠের সতেজতা এবং ছন্দময় সুর, সব মিলিয়ে সাইমা রহমান এক সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যের প্রতীক, যা শ্রোতাদের হৃদয়ে সাড়া তোলে।
 
রেডিও শোনা তাঁদের পরিবারের নিত্যদিনের অভ্যাস ছিল। বাড়িতে নিয়মিত রেডিও অনুষ্ঠান শোনা হতো, আর সেই পরিবেশেই সাইমার মনে স্বপ্ন জন্মায়, একদিন তিনি সংবাদ পাঠিকা হবেন। রেডিওতে ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠে যখন বলা হতো, “দিস ইজ অল ইন্ডিয়া রেডিও, দ্য নিউজ রিড বাই…”, এবং প্রতিবার আলাদা নাম শোনা যেত, তখন তিনি বিস্মিত হতেন। এই কৌতূহল থেকেই রেডিও ও সংবাদ পাঠের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়।
 
ধীরে ধীরে তিনি বাড়িতে সংবাদপত্র জোরে পড়ে অনুশীলন শুরু করেন। শব্দের শুদ্ধতা, স্পষ্ট উচ্চারণ ও ভাষার সৌন্দর্যের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে তিনি যেন এক রেডিও সংবাদ পাঠিকার মতো অনুশীলন করতেন। শুরু করতেন, “দিস ইজ অল ইন্ডিয়া রেডিও, দ্য নিউজ রিড বাই সাইমা রহমান”, তারপর পত্রিকার খবর ও শিরোনাম পড়তেন। এই অভ্যাস থেকেই তিনি বুঝতে পারেন, সংবাদ পাঠ তিনি ভীষণ ভালোবাসেন এবং শব্দ ও কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণের অসাধারণ শক্তি রয়েছে।
 
সাইমা রহমান
 
তাঁর জীবনের প্রথম বড় সুযোগ আসে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময়, যখন তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওর ‘যুব বাণী’ অনুষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ পান। এটাই ছিল রেডিও জগতে তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ। সেখানে কাজ করতে করতেই তিনি নিজের দক্ষতা আরও উন্নত করেন এবং পরে ইংরেজি সংবাদ পাঠিকা হন।
 
শিক্ষাজীবনে সাইমা দিল্লির অন্যতম সেরা কলেজ মিরান্ডা হাউস থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক হন। পরে তিনি সমাজকর্মে স্নাতকোত্তর ও এমফিল সম্পন্ন করেন। পড়াশোনা শেষ করে কিছুদিন শিক্ষকতাও করেন। তখন তিনি একই সঙ্গে শিক্ষকতা ও রেডিও, দুটি পথেই এগোচ্ছিলেন।
 
তবে এই অধ্যায় দীর্ঘদিন চলেনি। তিনি প্রায় ছয় মাস শিক্ষকতা করেন, কিন্তু সেই সময়েই তাঁর অনুষ্ঠান ‘পুরানি জিন্স’ বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। অনুষ্ঠানটি শ্রোতাদের বিপুল ভালোবাসা অর্জন করে এবং সাইমা রহমান জাতীয় স্তরে সেরা রেডিও জকি পুরস্কার পান। শেষ পর্যন্ত তাঁকে শিক্ষকতা ও রেডিওর মধ্যে একটি পথ বেছে নিতে হয়। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, শেখা চলতেই থাকবে, কিন্তু রেডিওই তাঁকে বেশি টানছে। তাই তিনি নিজেকে পুরোপুরি রেডিওর জগতে উৎসর্গ করেন।
 
‘পুরানি জিন্স’ তাঁকে রেডিও দুনিয়ায় স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়। অনুষ্ঠানটির মূল বিষয় ছিল বলিউডের সোনালি যুগের গান ও স্মৃতি। তিনি যখন বলতেন, “আপনিও যদি আমার মতো বলিউডের সোনালি যুগের বড় ভক্ত হন, তাহলে স্বাগতম সেই অনুষ্ঠানে, যার নাম ‘পুরানি জিন্স’”, তখন শ্রোতারা যেন সময়ের স্রোত পেরিয়ে অতীতে ফিরে যেতেন। তাঁর উপস্থাপনা, কবিতা এবং স্মৃতিমেদুর গল্প বলার ভঙ্গি অনুষ্ঠানটিকে অসাধারণ জনপ্রিয় করে তোলে।
 
রেডিও জকি হওয়ার পাশাপাশি সাইমা রহমান সামাজিক বিষয়েও স্পষ্ট মত প্রকাশের জন্য পরিচিত। তিনি নিজের পরিচিতি ও জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে সমাজে সচেতনতা বাড়ান এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেন।
 

ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। ভাষার সৌন্দর্য এবং শুদ্ধ উচ্চারণের প্রতি তাঁর বরাবরের আকর্ষণ রয়েছে। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি ‘উর্দু কি পাঠশালা’ অনুষ্ঠান শুরু করেন। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি হাজার হাজার শ্রোতাকে উর্দু ভাষা ও তার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এখানে তিনি প্রায়ই উর্দু শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করেন এবং তার সাংস্কৃতিক গভীরতা তুলে ধরেন।
 
কর্মজীবনে আরজে সাইমা বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ২০২০ সালে সমাজে সম্প্রীতি ও ইতিবাচক সংলাপ প্রতিষ্ঠার জন্য মূল্যবোধভিত্তিক সাংবাদিকতায় তাঁকে গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থী পুরস্কার দেওয়া হয়। এর আগে ২০০৪ সালে তিনি সেরা আরজে হিসেবে রাপা পুরস্কার পান। ‘পুরানি জিন্স’ এবং ‘হার মর্জ কি দাওয়া’-র মতো জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি শ্রোতাদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
 
আজও আরজে সাইমা এফএম রেডিওতে সক্রিয় এবং বন্ধুর মতো শ্রোতাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। অসংখ্য মানুষের কাছে তাঁর কণ্ঠ শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এক অনুভূতি, এক এমন কণ্ঠস্বর, যা স্মৃতি, কবিতা, সঙ্গীত এবং জীবনের অভিজ্ঞতাকে একসূত্রে বেঁধে চলেছে।