বাণিজ্য করিডরের যুগে কি ভারতের উত্থান অনিবার্য?

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 12 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
  রাজীব নারায়ণ

বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এক নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তন ঘটছে। যুদ্ধ, দখলদারি কিংবা মতাদর্শের সংঘর্ষ নয়, বরং অর্থনীতি, বাণিজ্য, মুদ্রা, বাজার এবং বন্দরকে ঘিরেই গড়ে উঠছে নতুন বিশ্বব্যবস্থা। ইউরোপের রেলপথ, উপসাগরীয় অঞ্চলের বন্দর কিংবা মধ্য এশিয়ার মরুভূমি, সবখানেই চলছে প্রভাব বিস্তারের নতুন প্রতিযোগিতা। এই লড়াই ভূখণ্ড দখলের জন্য নয়, বরং সংযোগব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের জন্য। বাণিজ্যপথ, লজিস্টিক করিডর, জ্বালানি পাইপলাইন, বন্দর ও নৌপথ আজ এমন শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা একসময় সামরিক জোটের মাধ্যমে অর্জিত প্রভাবের সমতুল্য।
 
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতা কেবল একটি কূটনৈতিক সমঝোতা নয়। এটি এমন এক ভূরাজনৈতিক রূপান্তরের ইঙ্গিত, যেখানে ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্য, লজিস্টিকস ও সংযোগব্যবস্থা মতাদর্শগত কঠোরতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুদ্ধরেখার চেয়ে বাণিজ্যপথের গুরুত্ব বাড়বে। সামরিক ঘাঁটির জন্য সংরক্ষিত কৌশলগত মূল্য এখন বন্দরেরও হবে। অর্থনৈতিক করিডর রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়ে দ্রুত কূটনীতিকে রূপ দেবে। আর এই পরিবর্তন থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ভারতের।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারত আত্মতুষ্টিতে ভুগতে পারে। পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে বিদ্যমান উত্তেজনাপূর্ণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি, প্রতিরোধক্ষমতা এবং আধুনিকীকরণ ভারতের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু চলমান বৈশ্বিক পরিবর্তন ভারতকে এক অসাধারণ ভূরাজনৈতিক সুযোগ এনে দিয়েছে, যদি দেশটি তার জনসংখ্যাগত শক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, বৃহৎ বাজার এবং কৌশলগত নমনীয়তাকে কাজে লাগাতে পারে। বহু দশকের মধ্যে সম্ভবত এই প্রথম ভারতের ভৌগোলিক অবস্থানই তার অন্যতম বড় সম্পদ হয়ে উঠেছে।
 
অর্থনীতির টানে বদলে যাচ্ছে বিশ্বরাজনীতি
 
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি প্রমাণ করে যে অর্থনৈতিক স্বার্থ এখন সামরিক সংঘাতকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। বছরের পর বছর পশ্চিম এশিয়ার সংঘর্ষ তেলের বাজার, নৌপথ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কিন্তু অস্থিতিশীলতার অর্থনৈতিক মূল্য এতটাই বেড়ে যায় যে তা উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর অভিঘাত দূরবর্তী অর্থনীতিগুলোকেও স্পর্শ করেছে। ফলে অবধারিতভাবেই অর্থনীতি ভূরাজনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে।
 
বর্তমান বিশ্ব সেই অস্থিরতার মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে। ইতিহাস বলে, বাজার অনিশ্চয়তাকে কূটনীতির চেয়েও দ্রুত শাস্তি দেয়। বিনিয়োগকারীরা সবসময় স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতাকে পুরস্কৃত করে। মুদ্রাস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির চাপে থাকা দেশগুলো উপলব্ধি করছে যে অর্থনৈতিক টিকে থাকার জন্য কৌশলগত সংযম অপরিহার্য। এই পরিবর্তন বিশ্বব্যবস্থাকে মতাদর্শগত সংঘাত থেকে সরিয়ে অর্থনৈতিক বাস্তববাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
 
প্রতীকী ছবি
 
ভারতের অবস্থান, ভারতের শক্তি
 
এই রূপান্তরের সময়ে ভারতের গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে নয়, তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও। ভারত ইন্দো-প্যাসিফিক, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ইউরেশিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত, যা তাকে বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি কৌশলগত কেন্দ্রে পরিণত করেছে। ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্তকারী বাণিজ্যপথগুলো ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এসে মিলিত হয়। বৈশ্বিক বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রবাহ ভারতের উপকূলের কাছ দিয়েই অতিক্রম করে। মহাদেশগুলোকে সংযুক্তকারী বিভিন্ন প্রকল্প ভারতকে ভূরাজনৈতিক সম্ভাবনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। একসময় নীতিনির্ধারকেরা ভৌগোলিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতেন। আজ সেই একই ভৌগোলিক অবস্থান অর্থনৈতিক সুযোগে পরিণত হচ্ছে।
 
চাবাহার বন্দর প্রকল্প একসময় এই পরিবর্তনের প্রতীক ছিল। এখন ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডরের মতো উদ্যোগগুলো নতুন বাস্তবতাকে তুলে ধরছে, বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা আজ অবকাঠামো ও লজিস্টিকসের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, প্রচলিত সামরিক সংঘাতের মাধ্যমে নয়। একবিংশ শতাব্দীর নেতারা করিডর নির্মাণ করছেন ঠিক ততটাই আগ্রাসীভাবে, যতটা আগের প্রজন্ম সামরিক জোট গড়ে তুলেছিল।
 
নমনীয় কূটনীতির নতুন মূল্য
 
বর্তমান অস্থির আন্তর্জাতিক পরিবেশে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির প্রবণতাগুলো হঠাৎ করেই অত্যন্ত দূরদর্শী বলে মনে হচ্ছে। বহু বছর ধরে নয়াদিল্লির কৌশলগত স্বাধীনতাকে ‘অস্পষ্টতা’ বলে সমালোচনা করা হয়েছে। ভারত একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, মস্কো, তেহরান, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি ঠিক এই নমনীয়তাকেই পুরস্কৃত করছে। ভবিষ্যৎ কঠোর জোটের নয়, বরং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বের।
 
প্রতীকী ছবি
 
ভারত ভূরাজনীতির একটি মৌলিক সত্য বুঝতে পেরেছে, ভূগোল মতাদর্শের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলায়, সরকার আসে-যায়, জোট পরিবর্তিত হয়। কিন্তু বাণিজ্যপথ, জ্বালানির চাহিদা এবং ভৌগোলিক বাধ্যবাধকতা স্থায়ী। এ কারণেই পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের কূটনীতি এত গুরুত্বপূর্ণ। এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, মুদ্রাস্ফীতি, প্রবাসী আয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় কৌশলগত নমনীয়তা আর কূটনৈতিক বিলাসিতা নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রয়োজন।
 
করিডর-কেন্দ্রিক বিশ্বের প্রতিযোগিতা
 
আগামী কয়েক দশকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হবে সংযোগব্যবস্থা। চীন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের মাধ্যমে এই বিষয়টি অনেক আগেই উপলব্ধি করেছিল। বন্দর, রেলপথ এবং অবকাঠামো অর্থায়নের মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিক সংযোগকে বিশ্বজুড়ে চীনা প্রভাবের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। এখন অন্যান্য শক্তিধর দেশও নিজেদের বিকল্প কাঠামো তৈরি করছে। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়।
 
অবকাঠামো কেবল উন্নয়নের উপকরণ নয়, এটি ভূরাজনৈতিক শক্তিরও উৎস। ভবিষ্যতের মানচিত্র মতাদর্শগত ব্লকের পরিবর্তে অর্থনৈতিক করিডর দ্বারা নির্ধারিত হবে। ভারতের জন্য এটি যেমন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি জরুরিতাও সৃষ্টি করছে। নয়াদিল্লি শুধু জনসংখ্যাগত সম্ভাবনা বা অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভর করতে পারে না। ভারতের দীর্ঘমেয়াদি উত্থান নির্ভর করবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে নিজেকে যুক্ত করতে পারে তার ওপর। আধুনিক প্রতিযোগিতা শুধু সীমান্ত রক্ষার নয়; করিডর, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং প্রবেশপথ সুরক্ষারও। অর্থনৈতিক ভূগোলই এখন প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র।
 
প্রতীকী ছবি
 
ভারতের সামনে সম্ভাবনা ও সতর্কবার্তা
 
তবে এই পরিবর্তনের মধ্যে উদ্বেগের কারণও রয়েছে। ভূগোলের প্রত্যাবর্তন মানেই সংঘাতের অবসান নয়। ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ বাস্তব এবং তাৎক্ষণিক। অস্থির প্রতিবেশী অঞ্চলে সামরিক প্রস্তুতির গুরুত্ব ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে। অর্থনৈতিক আশাবাদের জন্য কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতাকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না। কিন্তু উদীয়মান বৈশ্বিক ব্যবস্থার শিক্ষা স্পষ্ট, যেসব দেশ সংযুক্ত থাকবে, তারা বিচ্ছিন্ন ও মতাদর্শগতভাবে কঠোর দেশগুলোর চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হতে পারে।
 
ভবিষ্যৎ হয়তো তাদের নয়, যারা স্থায়ীভাবে কোনো এক পক্ষ বেছে নেয়। বরং ভবিষ্যৎ তাদের, যারা বিভিন্ন শিবিরের সঙ্গে কথা বলতে পারে, জটিলতা সামলাতে পারে এবং এমন বাণিজ্য, জ্বালানি ও সংযোগের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে যা রাজনৈতিক অস্থিরতাকেও অতিক্রম করে টিকে থাকে। ভারত সেই ভূমিকা পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উপাদানই ধারণ করে। ভৌগোলিক অবস্থান তাকে উদীয়মান বাণিজ্যিক কাঠামোর কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। জনসংখ্যা দিয়েছে পরিসর, মানবসম্পদ দিয়েছে প্রতিযোগিতামূলক শক্তি, বিশাল বাজার দিয়েছে অর্থনৈতিক আকর্ষণ এবং কৌশলগত স্বাধীনতা দিয়েছে কূটনৈতিক নমনীয়তা। এখন চ্যালেঞ্জ হলো এই সুবিধাগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে রূপান্তর করা।
 
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভূগোল সভ্যতার উত্থান ও পতন নির্ধারণ করেছে। পরে একসময় মতাদর্শ তার গুরুত্বকে আড়াল করেছিল। কিন্তু এখন, যখন বাণিজ্যপথ আবার গুরুত্ব ফিরে পাচ্ছে, সংযোগ সংঘাতকে ছাপিয়ে যাচ্ছে এবং অর্থনীতি ভূরাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে, তখন ভূগোল আবারও ভাগ্য নির্ধারণের শক্তি হয়ে উঠতে পারে। আর সেই প্রত্যাবর্তনশীল ভূগোলের যুগে ভারত হয়তো আবিষ্কার করবে তার কৌশলগত কেন্দ্রিকতার প্রকৃত অর্থনৈতিক আকর্ষণশক্তি।
 
(লেখক একজন প্রবীণ সাংবাদিক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।)