শান্তপ্রিয় রায় চৌধুরী
২১ বছর বয়সেই পশ্চিম মেদিনীপুরের আফরিন জাবি একজন দূরপাল্লার সাঁতারু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইংলিশ চ্যানেল ও পুলক প্রণালী সফলভাবে অতিক্রম করার পর, তিনি এখন ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলের ক্যাটালিনা চ্যানেল অতিক্রম করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আফরিন জাবি পশ্চিম মেদিনীপুরের মেদিনীপুর শহরের বাসিন্দা এবং মেদিনীপুর সুইমিং ক্লাবের সদস্য। তবে, তাঁর পৈতৃক বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়গপুর-২ ব্লকের চৌপিনা গ্রামে।
আফরিন জাবি
আজ আফরিন শুধু মেদিনীপুর বা বাংলার দূরপাল্লার সাঁতারের উজ্জ্বল তারকা নন, তিনি ভারতের অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল মুক্তজল সাঁতারু হিসেবেও নিজের ছাপ রাখছেন।
পশ্চিম মেদিনীপুরের এই তরুণ সাঁতারু ইতোমধ্যেই সফলভাবে ইংলিশ চ্যানেল এবং ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যবর্তী পাল্ক প্রণালী অতিক্রম করেছেন। এখন তার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাটালিনা চ্যানেল। আশা করা হচ্ছে, তিনি এই বছরের ২২শে সেপ্টেম্বর এই চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করবেন।
এর আগে, ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই তিনি সফলভাবে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেন। এরপর, এই বছরের ৯ মে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যবর্তী পাল্ক প্রণালী সফলভাবে অতিক্রম করা হয়।
আফরিন জাবি
এই যাত্রা রাজ্য ও জাতীয় স্তর থেকে শুরু হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দূরপাল্লার সাঁতারের যাত্রা শুরু করার অনেক আগেই আফরিন রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিলেন।
সে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বয়স-ভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় বেশ কয়েকটি পদক জিতেছে। সে রাজ্য স্তরের বয়স-ভিত্তিক সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপেও বেশ কয়েকটি পদক জিতেছে। সে স্কুল স্তরের সাঁতার প্রতিযোগিতাতেও ভালো ফল করেছে।
এই সফলতার ভিত্তিতে তাঁকে দুইবার জাতীয় জলক্রীড়া চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তিনি তিনবার সর্বভারতীয় আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় অ্যাকুয়াটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
তিনি জাতীয় স্কুল গেমস ফেডারেশন আয়োজিত প্রতিযোগিতা এবং মর্যাদাপূর্ণ খেলো ইন্ডিয়া কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করে পদক জিতেছেন।
আফরিন জাবি
আন্তর্জাতিক দূরপাল্লার সাঁতারের মঞ্চে পা রাখার আগেই আফরিন জাতীয় পর্যায়ে তার প্রতিভা দেখিয়েছিলেন। তিনি গঙ্গায় অনুষ্ঠিত বিশ্বের দীর্ঘতম ৮১ কিলোমিটার ম্যারাথনে মহিলাদের বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি ১৩ কিমি, ২১ কিমি এবং ২৪ কিমি উন্মুক্ত জলে সাঁতার সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।
সাঁতারের পাশাপাশি তিনি পড়াশোনাতেও সমানভাবে পারদর্শী।
আফরিন শুধু খেলাধুলাতেই নয়, পড়াশোনাতেও উন্নতি করেছে। সে বর্তমানে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে পড়াশোনা করছে। এর আগে সে মেদিনীপুর কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিল এবং বিভিন্ন সাঁতার প্রতিযোগিতায় বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছে।
ইংলিশ চ্যানেল ও পাল্ক প্রণালী জয় করা সত্ত্বেও, এই প্রতিভাবান সাঁতারু তার উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সাথে, তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার পরবর্তী সাঁতারের চ্যালেঞ্জের জন্য কঠোর প্রশিক্ষণও অব্যাহত রেখেছেন।
আর্থিক চ্যালেঞ্জের সাথে লড়াই
আফরিনের ক্রীড়া ও শিক্ষাজীবনের সাফল্যের পথ সহজ ছিল না। তাকে অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে এবং এখনও তিনি নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন।
আফরিন একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে। সে পরিবহন ব্যবসায়ী শেখ পিয়ার আলীর কন্যা। পিয়ার আলীর পক্ষে তার মেয়ের পড়াশোনা ও সাঁতার প্রশিক্ষণের খরচ জোগানো ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রতিটি আন্তর্জাতিক ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে কয়েক লক্ষ ডলার খরচ হতে পারে। ফলে, সেই টাকা জোগাড় করাই এখন পরিবারটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
একদিকে আমাকে নিশ্চিত করতে হবে যেন আমার মেয়ে নিয়মিত তার প্রশিক্ষণ চালিয়ে যেতে পারে, অন্যদিকে আমাকে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগানও দিতে হবে। আমার ছোট ব্যবসা থেকে এত বিশাল খরচ বহন করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনকি শহরে থেকেও আমার মেয়ে যেন 'সাত সমুদ্র' জয়ের যাত্রা চালিয়ে যেতে পারে।
আফরিন জাবি
আফরিনের বাবা শেখ পিয়ার আলী এবং মা সাবিনা পারভিন তাকে সম্ভাব্য সব উপায়ে সাঁতারের এই যাত্রায় সমর্থন ও উৎসাহ দিয়ে আসছেন। আফরিন বলেন, 'কনি' ছবিতে তার চরিত্র খিদ্দার মতোই তার বাবা পিয়ারো তার জীবনের এক পথপ্রদর্শক শক্তি। সাঁতারের সময় প্রবল স্রোতের সম্মুখীন হলেও তার বাবা সবসময় তাকে "লড়াই করো জাবি, লড়াই করো!" বলে উৎসাহিত করেন।
'সাত সমুদ্র' জয়ের স্বপ্ন
আফরিন জাবি, যিনি বাংলা ও ভারতের গর্বের উৎস হয়ে উঠেছেন, পশ্চিম মেদিনীপুরের 'নির্বাচনী আইকন' হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছেন। ইংলিশ চ্যানেল ও পুলক প্রণালী জয়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাটালিনা চ্যানেল অতিক্রম করাই তাঁর পরবর্তী বড় লক্ষ্য। কিন্তু তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য এর চেয়েও অনেক বড়।
আফরিন বলেন, "আমার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বিশ্বের সাতটি সবচেয়ে কঠিন প্রণালী বা জলপথ অতিক্রম করে 'সাত সমুদ্র' জয় করা এবং একটি বিশ্ব রেকর্ড স্থাপন করা।"
এই মুহূর্তে, তরুণ উন্মুক্ত-জলের সাঁতারু তার পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ক্যাটালিনা চ্যানেল জয়ের এই নতুন যাত্রার জন্য তিনি সকলের আশীর্বাদ ও শুভকামনা চেয়েছেন।