সাহিত্যের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে কাশ্মীরের সমৃদ্ধ লোককলা: তরুণ লেখিকা ও অনুবাদক ওনাইজা দ্রাবুর ব্যতিক্রমী যাত্রা
এহসান ফাজিলি / শ্রীনগর
সাহিত্য ও ভাষার মাধ্যমে সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে সচেষ্ট কাশ্মীরের এক প্রতিভাবান নৃতত্ত্ববিদ, লেখিকা ও অনুবাদক ওনাইজা দ্রাবু। গত সাত শতকের কাশ্মীরি সাহিত্যকে একত্রিত করে সম্প্রতি তাঁর প্রকাশিত ‘দ্য বিগ বুক অব কাশ্মীরি লিটারেচার’ গ্রন্থটি সাহিত্য মহলে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কবিতা, গান, নাটক ও গল্পে সমৃদ্ধ এই বৃহৎ সংকলন শুধু কাশ্মীরের সমৃদ্ধ লোককলা ও সাহিত্যকেই তুলে ধরেনি, বরং নিজের শিকড়ের প্রতি এক তরুণ লেখিকার গভীর অনুরাগ ও সাহিত্যসাধনাকেও বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছে।
ওনাইজা দ্রাবুর সাম্প্রতিক গ্রন্থ ‘দ্য বিগ বুক অব কাশ্মীরি লিটারেচার’ গত মাসে শ্রীনগরে প্রকাশিত হয়। গত সাত শতকের ৩০টি কাশ্মীরি সাহিত্যকর্ম নিয়ে তৈরি এই সংকলন তরুণ লেখিকা ও গ্রন্থকারকে প্রশংসা এনে দিয়েছে। গত দুই দশকে একাধিক বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কাশ্মীরি ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্মের এই সংকলনে রয়েছে কবিতা, গান, নাটক ও গল্প।
ওনাইজা দ্রাবু
নিজের লেখালেখির মাধ্যমে ওনাইজা দ্রাবু ভাষা ও সাহিত্যের সাহায্যে তাঁর চারপাশের পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা করেন। কাশ্মীরি লোককথার পুনর্কথন নিয়ে তাঁর প্রথম বই ‘দ্য লিজেন্ড অব হিমাল নাগরাই’ ২০১৯ সালে ‘স্পিকিং টাইগার’ প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়। এই বইয়ে কাশ্মীরি সংস্কৃতির যে প্রতিফলন ঘটেছে, তা তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে। ‘হিমাল ও নাগরাই’ এক অমর সর্পরাজকুমার ও এক মানব রাজকন্যাকে ঘিরে প্রচলিত ধ্রুপদি কাশ্মীরি লোককথা।
‘দ্য বিগ বুক অব কাশ্মীরি লিটারেচার’ লেখার পিছনে কী ভাবনা কাজ করেছিল, জানতে চাওয়া হলে ওনাইজা দ্রাবু ‘আওয়াজ দ্য ভয়েস’-কে জানান, কাশ্মীরি সাহিত্য পড়ে সময় কাটানোর প্রতি তাঁর আগ্রহই এই কাজের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, লেখক বশারত পীরের পরামর্শে তাঁর সম্পাদক মৌতুশি মুখোপাধ্যায় এই সংকলন তৈরির ভাবনা সামনে আনেন।
ওনাইজা বলেন, “কাশ্মীরি সাহিত্য সম্পর্কে আমার জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই বইটির কাঠামো নির্ধারণ করেছিলাম। প্রথমে একজন পাঠক হিসেবে আমি যে ধরনের লেখা পড়তে পছন্দ করব, তার ভিত্তিতে বইটির সূচিপত্র তৈরি করি। পাশাপাশি সম্পাদক হিসেবেও আমার কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল।”
তিনি আরও জানান, কাশ্মীরি ভাষার অন্তর্নিহিত কাব্যিক সৌন্দর্য ও ছন্দকে বইটির কেন্দ্রে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর কথায়, “আমি চেয়েছিলাম, সব ধরনের সাহিত্যধারা যেন এই বইয়ে জায়গা পায়। প্রচলিত প্রকাশনা ব্যবস্থার মধ্যে এবং তার বাইরেও যাঁরা লেখালেখি করেছেন, তাঁদের বিভিন্ন রচনাকে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলাম। পাশাপাশি অনুবাদকদের বৈচিত্র্য এবং অনুবাদের বিভিন্ন শৈলীকেও তুলে ধরতে চেয়েছি। তাই এই বই অনুবাদক ও বিভিন্ন সাহিত্যধারার এক মেলবন্ধন।”
ওনাইজা দ্রাবু
এই কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন, সে প্রসঙ্গে ওনাইজা বলেন, “রচনাগুলি সংগ্রহ করা তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। তবে গত কয়েক বছর ধরে সেগুলি সংকলন করার জন্য আমাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে।” তিনি জানান, কাশ্মীরি, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় লেখা সাহিত্য এবং তার ইতিহাস পড়ার মধ্য দিয়েই এই কাজের সূচনা হয়েছিল। পরে অনুবাদকদের যুক্ত করা হয়। এই কাজে অধ্যাপক নীরজা মাট্টুর মতো পথপ্রদর্শকের সহায়তা পাওয়াও তাঁর কাছে সৌভাগ্যের বিষয় ছিল। প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি তাঁর পরামর্শ নিয়েছেন।
ওনাইজা বলেন, “বহু বছর ধরে পড়াশোনা করার সুবাদে আমার কাছে এমন কিছু বই জমা ছিল, যেগুলিকে ভিত্তি করে কাজ শুরু করতে পেরেছিলাম। আমি কালচারাল অ্যাকাডেমি, কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রীনগরের পাবলিক লাইব্রেরি, সাহিত্য অকাদেমি এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত সংগ্রহের সাহায্য নিয়েছি। অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি, যাঁরা আমাকে বিভিন্ন তথ্য ও উপাদানের উৎস খুঁজে পেতে সাহায্য করেছেন।”
ওনাইজা দ্রাবু জানান, “রচনাগুলি খুঁজে বের করার চেয়েও কঠিন ছিল সেগুলির কপিরাইটের অধিকারীদের সন্ধান করা, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা এবং কথা বলা। রোমাঞ্চকর নানা অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব গল্পে ভরা এই প্রক্রিয়ায় গত কয়েক বছরে লেখকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমার ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে লেখকদের নাতি-নাতনিদের সঙ্গেও পরিচয় হয়েছে। তাঁরা জীবনে প্রথমবারের মতো ইংরেজিতে তাঁদের দাদু-ঠাকুমা বা ঠাকুরদা-দিদিমার লেখা পড়ার সুযোগ পেয়েছেন।”
ওনাইজার সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ‘টিল্টেড অ্যাক্সিস প্রেস’ থেকে প্রকাশিত ‘ভায়োলেন্ট ফেনোমেনা: ২১ এসে অন ট্রান্সলেশন’ গ্রন্থে তাঁর লেখা একটি প্রবন্ধ। এ ছাড়াও ‘অ্যাসিম্পটোট জার্নাল’, ‘গুয়ের্নিকা’ এবং ‘ইনভার্স জার্নাল’-সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য ও শিল্পকলা বিষয়ক নিউজলেটার ‘ডাক’-এর সহ-সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে নৃতত্ত্বের প্রয়োগ নিয়ে কাজ করা একটি পরামর্শদাতা সংস্থা পরিচালনা করেন তিনি। শ্রীনগর ও লখনউতে থেকে দূরবর্তী পদ্ধতিতে কাজ করেন ওনাইজা।
ওনাইজা দ্রাবু
“আমি বরাবরই বই পড়তে ভালোবাসতাম। ছোটবেলা থেকেই পড়ার প্রতি আমার গভীর আগ্রহ ছিল। তাই সব সময় লেখালেখি করতে চেয়েছি,” ‘আওয়াজ দ্য ভয়েস’-কে বলেন ওনাইজা। স্কুলজীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁর প্রথম প্রবন্ধ ‘গ্রেটার কাশ্মীর’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর মতে, সেটাই ছিল লেখালেখির জগতে তাঁর যাত্রার সূচনা। এর পর নিজের পেশাগত কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকাশনার জন্য মাঝেমধ্যে লিখতে শুরু করেন তিনি। ওনাইজার কথায়, “অনেকটা দেরিতে, আমার কুড়ির দশকের শেষের দিকে কাশ্মীরি লোককথা নতুন করে লেখার সুযোগ সামনে আসে। তার পর একের পর এক সুযোগ আসতে থাকে।”
শ্রীনগরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা ওনাইজার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চিকিৎসক ও প্রকৌশলীর মতো পেশাদার ব্যক্তিরা রয়েছেন। তিনি প্রেজেন্টেশন কনভেন্টে স্কুলের পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকেই দশম শ্রেণির পরীক্ষা পাশ করেন। মাধ্যমিকের পর দিল্লিতে গিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। লেখালেখির প্রতি আগ্রহের পাশাপাশি ইংল্যান্ড থেকে নৃতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও লাভ করেন তিনি। স্নাতক স্তরে ব্যবসায় শিক্ষা এবং স্নাতকোত্তর স্তরে নৃতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন ওনাইজা।
কাশ্মীরের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে লেখার দক্ষতা বিকাশের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ওনাইজা দ্রাবু বলেন, “আমার মনে হয়, শুধু কাশ্মীরের তরুণ-তরুণীরাই নয়, গোটা বিশ্বের যুবসমাজকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হবে। নিজের লেখা ঘষেমেজে উন্নত করার জন্য ChatGPT-র মতো সরঞ্জামের সাহায্য নেওয়া আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু তা না করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই নিজেদের দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।”
কাশ্মীরের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে বার্তা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি জানি না, তাঁদের বার্তা দেওয়ার মতো যোগ্যতা আমার আছে কি না। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় যা দেখি এবং তাঁদের সঙ্গে কথোপকথনের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়, আমাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হাতেই রয়েছে।”
নিজের লক্ষ্যে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের ভূমিকা সম্পর্কে ওনাইজা বলেন, “আমি কী কাজ করি, তা আমার বাবা-মা কখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। তা সত্ত্বেও তাঁরা সব সময় আমাকে সমর্থন করেছেন। আমি এমন একটি পরিবার থেকে এসেছি, যেখানে পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই আমার এই ব্যতিক্রমী পেশা বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত অন্যদের বোঝানো তাঁদের পক্ষে সব সময় সহজ ছিল না। তবুও আমার এই পথচলার কৃতিত্ব আমি তাঁদেরই দিতে চাই। কারণ, তাঁরাই আমাকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে আমার ঠাকুমার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
ওনাইজা ইংরেজি, উর্দু ও কাশ্মীরি, তিনটি ভাষাতেই দক্ষ। তবে কাশ্মীরি ভাষায় পড়তে ও লিখতে তিনি অনেক পরে, কলেজে পড়ার সময় শিখেছিলেন। জীবনের যে কোনও ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া এবং দক্ষতা অর্জনের জন্য তাঁর পরিবার প্রথম থেকেই ইংরেজি শেখার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল।