শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
দিদির বাল্যবিবাহ আটকাতে পারেনি সে। সেই অসহায়তার স্মৃতি আজও তাড়া করে মুর্শিদাবাদের কিশোরী মনিজা খাতুনকে। কিন্তু সেই আক্ষেপে থেমে যায়নি তার জীবন। বরং সেই যন্ত্রণা থেকেই নিয়েছিল এক কঠিন প্রতিজ্ঞা—নিজের চোখের সামনে আর কোনও মেয়ের বাল্যবিবাহ হতে দেবে না। বয়স এখনও স্কুল পেরোয়নি, হাতে বই-খাতা; অথচ সেই বয়সেই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে একের পর এক মেয়ের পাশে দাঁড়াচ্ছে মনিজা। নিজের গ্রামেই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে কিশোরীদের এক ভরসার নাম।
মুর্শিদাবাদের গজধরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী মনিজা। ২০২৫ সালের জুনে তাঁর সাহসিকতার একটি ঘটনা সামনে আসে। এক ১৪ বছরের সহপাঠী কাঁদতে কাঁদতে এসে জানায়, পরিবারের তরফে তার বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সে বিয়ে করতে চায় না। তার ইচ্ছে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে চুপ করে থাকেনি মনিজা। সরাসরি চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এ ফোন করে খবর দেয় সে।
নিজের বাড়িতে মনিজা খাতুন
এরপর প্রশাসন ও পুলিশ হস্তক্ষেপ করে। বন্ধ হয় সেই বিয়ে। একটি কিশোরীর ভবিষ্যৎ রক্ষা পায়। কিন্তু মনিজার কাছে সেটিই শেষ নয়, বরং শুরু। নিজের দিদির বাল্যবিবাহ ঠেকাতে না পারার যে কষ্ট এতদিন বুকের মধ্যে ছিল, সহপাঠীর বিয়ে আটকানোর পর সেই কষ্ট যেন নতুন অর্থ পায়। বুঝতে পারে, সময়মতো প্রতিবাদ করলে অন্তত অন্য কোনও মেয়ের জীবন একই পথে এগিয়ে যাওয়া আটকানো সম্ভব।
তারপর থেকেই বাল্যবিবাহের খবর পেলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে মনিজা। কখনও সহপাঠী, কখনও পরিচিত কিশোরী—যেখানে খবর পেয়েছে, সেখানেই বিষয়টি প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ইতিমধ্যেই নিজের স্কুলের সহপাঠী-সহ বহু নাবালিকার বাল্যবিবাহ রুখতে মনিজা ভূমিকা নিয়েছে। তাঁর এই ভূমিকার স্বীকৃতিও মিলেছে জেলা প্রশাসনের তরফে। সম্প্রতি ‘কন্যাশ্রী যোদ্ধা’ সম্মানপ্রাপ্ত ১৮ জন মেয়ের মধ্যে মনিজাও একজন।
তবে এই লড়াই শুধু সাহসের নয়, একাকীত্বেরও। যে মেয়েদের বিয়ে বন্ধ করার জন্য প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছিল মনিজা, তাদের কয়েকজনের সঙ্গেই পরে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাল্যবিবাহ বন্ধ হওয়া দুই সহপাঠী এখনও স্কুলে এলেও তাঁর সঙ্গে আর কথা বলে না। কিন্তু তাতেও পিছিয়ে আসেনি সে।
মায়ের সঙ্গে মনিজা
কারণ মনিজার কাছে বাল্যবিবাহ রোখা মানে শুধু একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া নয়। একটি মেয়েকে তার নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। যে বয়সে নিজের পড়াশোনা, বন্ধু আর ভবিষ্যৎ নিয়েই ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সেই মনিজা বুঝেছে—একটি ফোন কলও কখনও একটি জীবনকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে।
মুর্শিদাবাদে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রশাসন, স্থানীয় সংগঠন এবং তরুণদের সম্মিলিত উদ্যোগের কথাও ইতিমধ্যেই বিভিন্ন খবরের শিরোনাম হয়েছে। কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েতকে বাল্যবিবাহমুক্ত করার উদ্যোগের পিছনে স্থানীয় স্তরের সচেতনতা এবং তরুণদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই বৃহত্তর লড়াইয়েরই এক মুখ মনিজা।
তবে মনিজার গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর বয়স নয়, তাঁর সিদ্ধান্ত। কোনও পদ নেই, প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই, নেই বড় কোনও সংগঠনের পরিচয়। আছে শুধু অন্যায়ের সামনে চুপ না থাকার সাহস। নিজের দিদিকে বাঁচাতে পারেনি—এই আক্ষেপকে দুর্বলতা না বানিয়ে সেটাকেই শক্তিতে পরিণত করেছে সে।
মনিজা খাতুন
আজ তাই মনিজা শুধু একজন স্কুলছাত্রী নয়। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে নিজের চারপাশের মেয়েদের সতর্ক করে চলা এক তরুণ কণ্ঠ। তাঁর লড়াই হয়তো শুরু হয়েছিল একটি ফোন দিয়ে, কিন্তু সেই ফোনের ওপারে পৌঁছেছিল একটি বার্তা—বয়স কম হলেই প্রতিবাদের অধিকার কমে যায় না।
নিজের দিদির বিয়ের দিন যে মেয়েটি অসহায় ছিল, সেই মেয়েটিই আজ অন্য মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে বলছে—“আর নয়।” সেই সাহসই মনিজা খাতুনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।