উম্মাহর আনুগত্য না দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা? বদলে যাওয়া বিশ্বে মুসলিম পরিচয়ের নতুন বাস্তবতা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 18 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
আমির সুহেল ওয়ানি

ইরানের নতুন আধ্যাত্মিক নেতা সৈয়দ মোজতবা হোসেইনি খামেনেই ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ অবসানের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সময় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছিলেন। ইরানের জনগণের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি চারবার ‘জাতি’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, ইরানি জাতির স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই তিনি সমঝোতা স্মারকে সম্মতি দিয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে তাঁর ভিন্ন মত ছিল।
 
‘জাতি’ শব্দটির ওপর তাঁর এই জোর দেওয়ার মধ্যে তাঁর বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছিল। এর মাধ্যমে এই বৃহত্তর উপলব্ধিই প্রকাশ পেয়েছিল যে, অন্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হয়।আধুনিক প্রেক্ষাপটে মুসলিম রাজনৈতিক চেতনার দিকে তাকালে এই বার্তার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি আনুগত্য এবং জাতিরাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্যকার টানাপোড়েনের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
 
প্রতীকী ছবি
 
ভারতের মতো বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাসকারী মুসলিমদের মধ্যে এই টানাপোড়েন বিশেষভাবে দৃশ্যমান। একটি ধারণা রয়েছে যে, মুসলিমদের প্রথমে উম্মাহর প্রতি আনুগত্য রয়েছে এবং তার পর আসে নিজেদের দেশের প্রতি আনুগত্য।
 
একটি ইসলামি দেশের আধ্যাত্মিক নেতার কাছ থেকে আসা সৈয়দ মোজতবা হোসেইনি খামেনেইয়ের এই বক্তব্য বাস্তব জগতে মুসলিমদের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে একটি আকর্ষণীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। ঐতিহাসিকভাবে সপ্তম শতকের আরবে হজরত মুহাম্মদ-এর নেতৃত্বে ইসলামের গঠনপর্বে উম্মাহর ধারণার উদ্ভব হয়েছিল।
 
মদিনার প্রাথমিক মুসলিম সম্প্রদায় শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় সমাবেশ ছিল না; বরং অভিন্ন বিশ্বাস ও পারস্পরিক দায়িত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক-রাজনৈতিক সত্তাও ছিল। ধ্রুপদি ইসলামী ধারণায় উম্মাহ, অর্থাৎ ভূখণ্ডের পরিবর্তে বিশ্বাসের বন্ধনে আবদ্ধ বিশ্বাসীদের একটি সার্বজনীন সম্প্রদায়, এমন এক বিশ্বে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যেখানে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রায়শই ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।
 
বিখ্যাত ‘মদিনার সনদ’ এমন একটি সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা আংশিকভাবে বিশ্বাসের ভিত্তিতে, আবার চুক্তি ও নাগরিক দায়িত্বের ভিত্তিতেও সংজ্ঞায়িত হয়েছিল। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই সনদে মদিনার মুসলিম ও ইহুদি গোত্রগুলিকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, যদিও প্রত্যেক গোষ্ঠীকে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় বজায় রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এর একটি ধারায় বলা হয়েছে: “বনু আওফের ইহুদিরা বিশ্বাসীদের সঙ্গে একটি সম্প্রদায়; ইহুদিদের জন্য তাদের ধর্ম এবং মুসলিমদের জন্য তাদের ধর্ম।” সেই সময় ও পরিস্থিতিতে এই প্রস্তাব সত্য হলে, ভারতীয় প্রেক্ষাপটেও এর প্রাসঙ্গিকতা থাকা উচিত। ইতিহাসের সূচনালগ্নে উম্মাহর ধারণার মধ্যে যে নৈতিক ও নাগরিক, উভয় মাত্রাই ছিল, এই প্রাথমিক ব্যবস্থা তারই একটি উদাহরণ।
 
দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে খ্রিস্টান, ইহুদি ও হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ গ্রিক দর্শনকে আরবি ও ফারসি ভাষায় অনুবাদ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, যাতে মুসলিম পণ্ডিতরা তা থেকে উপকৃত হতে পারেন। বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা মুসলিম চেতনার গঠন ও বিবর্তনে অবদান রেখেছিলেন এবং এই বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না।
 
প্রাথমিক যুগে হজরত মুহাম্মদ ও তাঁর সাহাবিরা যখন পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করছিলেন, তখন উম্মাহর ধারণার বাস্তব রাজনৈতিক অর্থ ছিল, কারণ ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে ইসলামী সাম্রাজ্যগুলি বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি সার্বজনীন মুসলিম সম্প্রদায়ের ধারণা শক্তিশালী নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতীক হিসেবে টিকে ছিল, যদিও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বিভিন্ন রাজবংশ ও রাষ্ট্রের মধ্যে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। লক্ষণীয় বিষয় হল, মুসলিম রাজনৈতিক বিকাশ তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল তখনই, যখন সম্প্রদায়টি ঐক্যবদ্ধ না হয়ে বিভক্ত ছিল।
 
প্রতীকী ছবি
 
মধ্যযুগে মুসলিম রাজনৈতিক ঐক্য বাস্তবতার চেয়ে বেশি ছিল আকাঙ্ক্ষার বিষয়। অটোমান সাম্রাজ্য, পারস্যের সাফাভি রাষ্ট্র এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুঘল সাম্রাজ্যের মতো সাম্রাজ্যগুলি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল স্বাধীনভাবে শাসন করত এবং প্রায়শই সামরিক ও আদর্শগতভাবে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। এই বিভাজন সত্ত্বেও বৃহত্তর ইসলামি সম্প্রদায়ের প্রতীকী ধারণা টিকে ছিল, কারণ সেই সময়ের রাজনৈতিক ব্যবস্থা জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি। আধুনিক অর্থে আনুগত্য ছিল জাতীয় নয়; বরং প্রধানত রাজবংশীয়, সাম্রাজ্যিক বা ধর্মীয়। বিভিন্ন শাসকের অধীনে বসবাস করেও মুসলিমরা নিজেদের এমন একটি সভ্যতাগত পরিসরের অংশ হিসেবে কল্পনা করতে পারতেন, যা তীর্থযাত্রা, জ্ঞানচর্চা ও বাণিজ্যের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
 
আধ্যাত্মিক স্তরে হজরত মুহাম্মদ বিশ্বাসীদের পারস্পরিক সহমর্মিতার মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁরা “একটি দেহের মতো: যখন একটি অঙ্গ কষ্ট পায়, তখন গোটা দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে সাড়া দেয়” (সহিহ আল-বুখারি, সহিহ মুসলিম)। এই উপমাটি কোনও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কর্তৃত্বের পরিবর্তে নৈতিক সংহতির ওপর জোর দেয়। আধুনিক জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার উত্থান এই পরিস্থিতিকে আমূল বদলে দেয়।
 
সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র এবং নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাগরিকত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মুসলিমরা যে পরিবেশে বসবাস করেন এবং নিজেদের দায়িত্বকে যেভাবে বোঝেন, তা মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে। আজ মুসলিমদের, বিশেষ করে ভারতীয় মুসলিমদের সামনে যে চ্যালেঞ্জ, তা শুধু ধর্মতাত্ত্বিক নয়, বরং সভ্যতাগতও, কীভাবে একটি আন্তঃদেশীয় ধর্মীয় চেতনাকে জাতীয়তা, নাগরিকত্ব এবং সাংবিধানিক অন্তর্ভুক্তির বাস্তব রাজনৈতিকতার সঙ্গে সমন্বয় করা যায়।
 
সমসাময়িক বিশ্বে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রাধান্য বিস্তার করেছে, তার বৌদ্ধিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উৎস মূলত ওয়েস্টফেলিয়ার শান্তিচুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। ওয়েস্টফেলিয়ান কাঠামো এমন একটি নীতি প্রতিষ্ঠা করেছিল, যেখানে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারিত সীমান্তের মধ্যে ভূখণ্ডভিত্তিক ও সার্বভৌম হবে। সময়ের সঙ্গে এই ব্যবস্থা আধুনিক জাতীয়তাবাদের ধারণায় রূপ নেয়, যেখানে নাগরিকরা ভূখণ্ড, ইতিহাস, ভাষা এবং সাংবিধানিক অন্তর্ভুক্তির ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক পরিচয় ভাগ করে নেন।
 
উনিশ ও বিশ শতকে জাতীয়তাবাদের উত্থান শুধু ইউরোপকেই নয়, মুসলিম বিশ্বকেও নতুনভাবে গড়ে তোলে। ইউরোপের মুসলিমরা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেন এবং অধিকাংশই নিজেদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেন। সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হয় এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বহু নতুন জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে।
 
এই নতুন রাজনৈতিক কাঠামোয় বসবাসকারী মুসলিমদের কাছে এই পরিবর্তনের ফলে পরিচয়ের পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক আইন স্বীকৃত জাতিরাষ্ট্রগুলির হাতে যখন সার্বভৌমত্ব ন্যস্ত, তখন উম্মাহ আর রাজনৈতিক একক হিসেবে কাজ করতে পারেনি। ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ফ্রান্স মুসলিমদের ইসলাম ত্যাগ না করলে নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করেছিল। এমনকি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলিতেও জাতীয় পরিচয় ক্রমশ আন্তঃদেশীয় ধর্মীয় সংহতিকে ছাপিয়ে যেতে থাকে। তুর্কিরা নিজেদের প্রধানত তুরস্কের সঙ্গে, ইন্দোনেশীয়রা ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে, মিশরীয়রা মিশরের সঙ্গে এবং পাকিস্তানিরা পাকিস্তানের সঙ্গে পরিচিত করতে শুরু করেন। প্রতিটি রাষ্ট্র নিজস্ব জাতীয় বয়ান, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও কৌশলগত স্বার্থ গড়ে তোলে। ফলে বাস্তবে উম্মাহর ঐক্য মূলত প্রতীকী হয়েই থাকে; ধর্মীয় আচার ও আবেগগত সংহতির মাধ্যমে তা প্রকাশ পায়, অভিন্ন রাজনৈতিক কর্তৃত্বের মাধ্যমে নয়।
 
প্রতীকী ছবি
 
ভারতের মুসলিমদের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময় আনুগত্যের প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন স্বাধীনতার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার অধীনে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়কে একত্রিত করেছিল। বহু মুসলিম নেতা এই সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং এমন এক যৌথ জাতীয়তাবাদী ভাবনার গঠনে অবদান রাখেন, যেখানে বহুত্ববাদ ও অভিন্ন নাগরিকত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এই ভাবনা ভারতের সংবিধানে প্রকাশ পায়, যেখানে ধর্ম নির্বিশেষে সমান অধিকার ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
 
ইসলামি নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকেও সাংবিধানিক নাগরিকত্বের প্রতি দায়বদ্ধতাকে চুক্তি ও অঙ্গীকার পালনের বিষয়ে কোরআনের গুরুত্বের মাধ্যমে বোঝা যেতে পারে। কোরআনে বিশ্বাসীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করো” (কোরআন ৫:১), এবং আবার বলা হয়েছে, “যখন তোমরা অঙ্গীকার করো, তখন আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো” (কোরআন ১৬:৯১)। এই অর্থে সাংবিধানিক ব্যবস্থার অধীনে নাগরিকত্বকে এমন একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, যার জন্য আনুগত্য ও দায়িত্ববোধ প্রয়োজন।
 
তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আঘাত পরিচয় ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করে। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির ঘটনা ভারতে থেকে যাওয়া মুসলিমদের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বকে জটিল করে তোলে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ভারতকেই নিজেদের মাতৃভূমি হিসেবে বেছে নিয়ে তার গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি নিজেদের অঙ্গীকারবদ্ধ রাখলেও ধর্মীয় সংহতি ও জাতীয় নাগরিকত্বের মধ্যকার ধারণাগত টানাপোড়েন মাঝে মাঝে রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরে এসেছে। বিশ্বায়নের যুগে, যেখানে সংবাদমাধ্যম প্যালেস্টাইন থেকে সিরিয়া এবং অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল পর্যন্ত দূরবর্তী ঘটনাগুলিকে মুহূর্তের মধ্যে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, বহু মুসলিম নিজেদের জাতীয় সীমানার বহু দূরের সংগ্রামের সঙ্গেও আবেগগতভাবে একাত্ম বোধ করেন। মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিচয় স্বাভাবিক হলেও, কখনও কখনও এটি নৈতিক সহানুভূতি ও রাজনৈতিক আনুগত্যের মধ্যকার পার্থক্যকে অস্পষ্ট করে দিতে পারে।
 
প্রথমত, বৈশ্বিক ব্যবস্থা সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, যেখানে বৈধতার ভিত্তি ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তে ভূখণ্ডভিত্তিক শাসন ও নাগরিকত্ব। আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সবই এই কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হয়। উম্মাহর ঐক্যকে বাস্তবভাবে ধারণ করতে পারে, এমন কোনও অতিরাষ্ট্রীয় ইসলামি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ নেই। এমনকি মুসলিম সংহতির প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করা সংস্থাগুলিও, যেমন অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (OIC), মূলত কূটনৈতিক মঞ্চ হিসেবে কাজ করে; বাধ্যতামূলক কর্তৃত্বসম্পন্ন রাজনৈতিক ইউনিয়ন হিসেবে নয়।
 
দ্বিতীয়ত, মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক উম্মাহর ধারণাকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কঠিন করে তোলে। মুসলিমরা ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও জাতীয় স্বার্থের দিক থেকে ব্যাপকভাবে ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক ও মরক্কো সম্মিলিত ইসলামি কর্মসূচির পরিবর্তে নিজেদের কৌশলগত হিসাব অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ করে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলির নিজেদের মধ্যকার সংঘাতও এই বিভাজনকে স্পষ্ট করে। এই বাস্তবতাগুলি দেখায় যে, আজ উম্মাহর ঐক্য মূলত আধ্যাত্মিক ও নৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক নয়।
 
তৃতীয়ত, আধুনিক নাগরিকত্ব এমন কিছু দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত, যা আন্তঃদেশীয় পরিচয়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকরা ভোটদান, নাগরিক অংশগ্রহণ, জনপরিসরে বিতর্ক এবং সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনে অংশ নেন। এই দায়িত্বগুলির জন্য যে দেশে একজন বসবাস করেন, সেই দেশের কল্যাণ, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির প্রতি দায়বদ্ধতা প্রয়োজন। ভারতীয় মুসলিমদের ক্ষেত্রে এর অর্থ হল ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও বহুত্ববাদী চেতনাকে শক্তিশালী করার জন্য বৌদ্ধিক, নৈতিক ও নাগরিক শক্তি নিয়োগ করা।
 
প্রতীকী ছবি
 
কোরআন নিজেও মানবসমাজের বহুত্ব এবং জাতির অস্তিত্বকে ঐশ্বরিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে স্বীকার করে: “হে মানবজাতি! আমি তোমাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো” (কোরআন ৪৯:১৩)। এই আয়াত নিশ্চিত করে যে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্য ঐশ্বরিক ঐক্যের বিরোধী নয়; বরং তারই একটি প্রকাশ।
 
প্রকৃতপক্ষে, বহু ইসলামি পণ্ডিত যুক্তি দিয়েছেন যে দেশপ্রেম ধর্মীয় নিষ্ঠার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলামের নৈতিক শিক্ষায় ন্যায়বিচার, বিশ্বস্ততা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং চুক্তির প্রতি সম্মানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যে নীতিগুলি স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্বশীল নাগরিকত্বকে সমর্থন করে। কোরআন বিশ্বাসীদের দৃঢ়ভাবে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয়: “হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহর জন্য ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, তোমাদের পিতা-মাতা বা আত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়” (কোরআন ৪:১৩৫)।
 
একইসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থানকারী মানুষের প্রতি দয়া ও ন্যায়বিচারের উৎসাহও দেওয়া হয়েছে: “যারা ধর্মের কারণে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ও ন্যায়পরায়ণ হতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না” (কোরআন ৬০:৮)। বহুত্ববাদী সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য এই শিক্ষাগুলি একটি শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি প্রদান করে।
 
নিজের মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাও মানুষের স্বাভাবিক অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি থেকে উদ্ভূত হয়। হজরত মুহাম্মদ যখন মদিনায় হিজরতের সময় মক্কা ছেড়ে যেতে বাধ্য হন, তখন তিনি তাঁর জন্মভূমির প্রতি গভীর টান প্রকাশ করে বলেছিলেন: “আল্লাহর কসম, তুমি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ভূমি; তোমার মানুষ আমাকে বহিষ্কার না করলে আমি তোমাকে ছেড়ে যেতাম না” (সুনান আত-তিরমিজি)। এই বক্তব্য দেখায় যে নিজের মাতৃভূমির প্রতি টান একটি স্বাভাবিক ও বৈধ মানবিক অনুভূতি, যা ধর্মীয় নিষ্ঠার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
 
বিশেষ করে ভারতীয় মুসলিমদের ক্ষেত্রে জাতীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অর্থ উম্মাহর আধ্যাত্মিক ধারণাকে পরিত্যাগ করা নয়। উম্মাহ একটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন হিসেবে বিশ্বের মুসলিমদের মধ্যে অভিন্ন ধর্মীয় আচার, দাতব্য চিন্তা এবং জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে সংযোগ বজায় রাখতে পারে। যে বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন, তা হল এই বন্ধন যেন নাগরিকত্বের বাস্তব রাজনৈতিক দায়িত্বকে অতিক্রম করে না যায়। এমন এক বিশ্বে, যেখানে শাসন, আইন ও নিরাপত্তা জাতীয় কাঠামোর মধ্যে সংগঠিত, সেখানে একটি অতিরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক উম্মাহ পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা ঐক্যের পরিবর্তে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
 
এর পাশাপাশি, ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় পরিচয় ও জাতীয় আনুগত্য কীভাবে সুরেলাভাবে সহাবস্থান করতে পারে, তা প্রদর্শনের একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করে। ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষ শাসন, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই নাগরিক কাঠামোয় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভারতীয় মুসলিমরা শুধু দেশের অগ্রগতিতেই অবদান রাখেন না, বরং সহাবস্থানের এমন একটি বৃহত্তর মডেলও তুলে ধরেন, যা ইসলাম ও আধুনিকতা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।
 
প্রতীকী ছবি
 
সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে ইসলামি শিক্ষাও এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করে। হজরত মুহাম্মদ সামাজিক অঙ্গীকার পালনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছিলেন: “মুসলিমরা তাদের শর্তের প্রতি আবদ্ধ” (সুনান আবু দাউদ)। তাই একটি সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে দায়িত্বশীলভাবে বসবাস করা নাগরিক দায়িত্ব এবং ইসলামি নীতি, উভয়ের প্রতিই বিশ্বস্ততার প্রতিফলন।
 
সুতরাং উম্মাহ ও জাতীয়তার মধ্যকার দ্বন্দ্ব মূলত ধর্মতাত্ত্বিক সংকটের চেয়ে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন। যে বিশ্ব ধ্রুপদি রাজনৈতিক উম্মাহর ধারণাকে জন্ম দিয়েছিল, তা অনেকাংশেই বিলুপ্ত হয়েছে এবং তার জায়গা নিয়েছে জাতি ও নাগরিকত্বভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। এই পরিবর্তনকে স্বীকার করার অর্থ ইসলামের আধ্যাত্মিক সার্বজনীনতাকে খর্ব করা নয়; বরং সমসাময়িক রাজনৈতিক জীবনের বাস্তবতার মধ্যে মুসলিম পরিচয়কে স্থাপন করা। ভারতীয় মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় সততা বজায় রেখে জাতীয় অন্তর্ভুক্তিকে গ্রহণ করা কোনও আপস নয়; বরং এটি একটি পরিণত সমন্বয়, যেখানে ভারসাম্যপূর্ণ ও গঠনমূলক উপায়ে বিশ্বাস এবং মাতৃভূমি উভয়কেই স্বীকার করা হয়।
 
সাম্প্রতিক ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি পক্ষকে জড়িয়ে সংঘাতের বৃদ্ধি সমসাময়িক উম্মাহর মূলত তাত্ত্বিক চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করেছে। গাজায় নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ, ব্যাপক বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র আবেগঘন বৈশ্বিক ক্ষোভ সত্ত্বেও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলির প্রতিক্রিয়া মূলত কূটনৈতিক বিবৃতি, মানবিক আবেদন এবং প্রতীকী নিন্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলি ইসরায়েলের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জোরালো বিবৃতি দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
 
কিন্তু এই ঘোষণাগুলি মাটিতে খুব সামান্যই অর্থবহ যৌথ পদক্ষেপে পরিণত হয়েছে। বারবার বাগাড়ম্বরপূর্ণ ঐক্যের কথা বলা হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভাজন, কৌশলগত সতর্কতা এবং পরস্পরবিরোধী জাতীয় স্বার্থই প্রতিফলিত হয়েছে। কিছু দেশ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, অন্যরা ভূ-রাজনৈতিক জোটের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে এবং অনেকে সরাসরি সংঘাত এড়িয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় আন্তঃদেশীয় ধর্মীয় সংহতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে।
 
ইরান এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে তার বিরোধীদের ঘিরে তৈরি হওয়া ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এই বৈপরীত্যকে আরও গভীর করেছে। একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণের পরিবর্তে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলি আদর্শগত, সাম্প্রদায়িক ও কৌশলগত বিভাজনের রেখায় বিভক্ত রয়েছে। সংঘাত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়শই সেই একই সভ্যতাগত পরিসরের মধ্যে ঘটে চলেছে, যাকে উম্মাহর ধারণা ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করে। এমনকি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ঘিরে সংকটের মুহূর্তেও প্রতিক্রিয়াগুলি সম্মিলিত দায়িত্বের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
 
এই ঘটনাগুলি একটি কঠিন বাস্তবতাকে সামনে আনে: উম্মাহ একটি শক্তিশালী নৈতিক ও আবেগগত ধারণা হিসেবে এখনও কার্যকর হলেও আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এর প্রাতিষ্ঠানিক সংহতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই। বাস্তবে জাতিসত্তা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ঐক্যবদ্ধ মুসলিম সম্প্রদায়ের আদর্শকে অনেকটাই ছাপিয়ে গেছে। ফলে উম্মাহ একটি জীবন্ত রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তে অভিন্ন বিশ্বাসের প্রতীকী প্রকাশে পরিণত হয়েছে।
 

 
এই অর্থে মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তার ভবিষ্যৎ সম্ভবত উম্মাহ বনাম জাতির এই দ্বৈততার বাইরে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই নিহিত। ইসলামের নৈতিক ভিত্তি ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবিক সংহতিকে উৎসাহিত করে, যে মূল্যবোধগুলি জাতীয় সমাজকে শক্তিশালী করতে পারে, তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে নয়। মুসলিমরা যখন নিজেদের দেশকে শুধুমাত্র বসবাসের স্থান হিসেবে না দেখে একটি অভিন্ন নৈতিক প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করবেন, তখন দেশপ্রেম নিজেই একটি নৈতিক দায়বদ্ধতায় পরিণত হবে। ভারতীয় মুসলিমদের জন্য ভারতের প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে আধ্যাত্মিক বন্ধন বজায় রাখা আধুনিক বিশ্বে আত্মবিশ্বাস, স্থিতিশীলতা ও অর্থবহ অংশগ্রহণের একটি পথ তৈরি করতে পারে।
 
সমসাময়িক বাস্তবতার একটি সংযত বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে, ধ্রুপদি রাজনৈতিক উম্মাহর ধারণা আধুনিক বিশ্বে অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। সহধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহমর্মিতা, যা অভিন্ন মানবতার একটি অংশ হিসেবে কাম্য, বজায় রাখা যেতে পারে। তবে পরিবর্তিত বিশ্ববাস্তবতায় দেশের এবং দেশের মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।


শেহতীয়া খবৰ