শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী
কাদামাটি আর শ্যাওলা ঘেরা এক চিলতে পুকুর। গ্রামের আর দশটা বাচ্চার মতো জোয়া জন্নাত সেখানে সাঁতার কেটেছিল মাত্র ৫ বছর বয়সে। কিন্তু এ পথে তার আসাটা সম্ভব হয়েছে তার মা নাসিমা বিবির জন্য। কারণ তিনি তার দুই ছেলেমেয়েকে জলে নামিয়ে ছিলেন সাঁতার শেখানোর জন্য। পরবর্তীকালে তার ছেলে সাঁতারে আসতে পারেনি, কিন্তু মেয়ে জন্নাত পারলেন সাঁতারকে জয় করতে। ছোটবেলায় অন্যদের মতো সে শুধু জলে হাত-পা ছড়াত না, সে যেন জলের সঙ্গে কথা বলত।
জন্নাতের বাবা সেখ মেহতাব আলী এবং মা নাসিমা বিবি বুঝতে পেরেছিলেন মেয়ের জলের প্রতি টানটা। জন্নাতের বয়স যখন ৯-১০ হবে, তখন জেলা স্তরের একটি ওপেন ওয়াটার প্রতিযোগিতার কথা জানতে পারেন তার বাবা মেহতাব আলী। কোনো প্রথাগত প্রশিক্ষণ ছাড়াই, সস্তা একটা সুতির ফ্রক পরে জন্নাত নেমে পড়েছিল সেই প্রতিযোগিতায়। সেদিন সবাইকে চমকে দিয়ে সে প্রথম স্থান অধিকার করে।সেখানেই জন্নাতকে স্থানীয় কোচেরা আবিষ্কার করেন। তারা সবাই জন্নাতের ভেতরের আগুনটা দেখতে পেয়েছিলেন।
মেয়ের সাফল্য দেখে জন্নাতের বাবা-মা উৎসাহিত হলেন। চিন্তা করলেন মেয়েকে বড় সাঁতারু করার। তাঁর বাবা-মা তাঁকে স্থানীয় লেক গার্ডেন্স এর রবীন্দ্র সরোবরের সুইমিং ক্লাবের ভর্তি করে দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তার সাঁতারু হয়ে ওঠার লড়াই। এখন সে বেহালার পূর্ব রেলওয়ে সুইমিং একাডেমীর কোচ আকবর আলী মীরের প্রশিক্ষণে আছে। আকবর আলী মীর একজন জাতীয় সাঁতারু। এই আকবর আলী মীরের হাত ধরে সে ছটা জুনিয়র ন্যাশনাল করে ফেলেছে। প্রতিটি ন্যাশনালেই মোটামুটি ভালো সাফল্য অর্জন করেছে।
কোচ এবং প্রাক্তন আন্তর্জাতিক সাঁতারু আকবর আলী মীর উদীয়মান সাঁতারু জোয়া জন্নাত-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী, তিনি বলেছেন, জোয়া জন্নাত মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তার অসামান্য প্রতিভা প্রমাণ করেছে এবং ইতিমধ্যে ছটি জুনিয়র ন্যাশনালে অংশ নিয়েছে।
জন্নাতের লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে কোচের মূল মূল্যায়নগুলো হল -
কোচ আকবর আলী মীরের দক্ষ নির্দেশনায় জোয়া জান্নাত কড়া অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মীর মনে করেন, জোয়ার যে ধরনের জেদ এবং পরিশ্রম করার ক্ষমতা রয়েছে, তাতে তার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও বড় সাফল্য সে এনে দিতে পারে। কেভিএস জাতীয় সাঁতার মিটে ১০০ মিটার বাটারফ্লাই এবং ২০০ মিটার ইন্ডিভিজুয়াল মেডলিতে প্রথম স্থান অর্জন করে সে নিজের জাত চিনিয়েছে, যা কোচের এই আস্থার মূল কারণ।
ফিরে দেখা জন্নাতের শুরুর দিনগুলোর দিকে:
কলকাতা লেক গার্ডেনসের মেয়ে জন্নাতদের সংসারে রয়েছে আর্থিক অভাব। বাবা শেখ মেহেতাব আলী কাজ করেন স্থানীয় এক কেবল সংস্থায়। কোন রকমে চারজনের সংসারটা চলে। এর উপর মেয়ের সাঁতারের ভালো মানের কস্টিউম এবং পুষ্টিকর খাবারের অভাব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। তাই ছোট্ট মেয়ে জন্নাতের পক্ষে ঝাঁ-চকচকে সুইমিং পুল আর আধুনিক পরিকাঠামোয় প্রথম প্রথম মানিয়ে নিতে বেশ কষ্ট হয়েছিল। ভোর চারটের কনকনে ঠাণ্ডায় পুলে নামা, কড়া ডায়েট আর কঠোর ফিজিক্যাল ট্রেনিং, সব মিলিয়ে শরীর ও মন ভেঙে পড়তে চাইত। তার ওপর ছিল আধুনিক কস্টিউম আর গগলস ব্যবহারের অনভ্যস্ততা।

অ্যাকাডেমির কিছু ছেলে মেয়ে তার সাধারণ পোশাক দেখে ওর দিকে চেয়ে থাকত। কিন্তু এই বয়সেই যে জন্নাতের লক্ষ্য ছিল স্থির। প্রতিদিন রাতে যখন তার পেশিগুলো যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যেতে চাইত, তখন সে চোখ বন্ধ করে তার বাবা ও মায়ের তাঁকে নিয়ে তাঁদের স্বপ্ন দেখার কথাটা সে ভাবত আর ভাবত ছোটবেলায় ছোট পুকুরটায় সাঁতার দেওয়ার কথা। সে জানত, জেতার কোনো বিকল্প তার কাছে নেই। কঠোর পরিশ্রমের ফল মিলতে শুরু করল। রাজ্যের বিভিন্ন জুনিয়র স্তরের ও স্কুল গেমস প্রতিযোগিতা গুলোতে জন্নাত যখন একের পর এক সাফল্য পেতে শুরু করল। তাঁর টাইমিং দিন দিন উন্নত হতে থাকল।
জোয়া জান্নাত যেভাবে জাতীয় স্তরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন:
কেভিএস ন্যাশনাল স্পোর্টস মিট (২০২৪-২৫): এই জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় জোয়া অসামান্য পারফরম্যান্স দেখিয়ে সকলের নজর কাড়েন। প্রতিযোগিতায় তার প্রধান অর্জনগুলো ছিল:
** ১০০ মিটার বাটারফ্লাই ইভেন্টে প্রথম স্থান (স্বর্ণপদক)।
** ২০০ মিটার ইন্ডিভিজুয়াল মেডলে ইভেন্টে প্রথম স্থান (স্বর্ণপদক)।
** ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোক ইভেন্টে দ্বিতীয় স্থান (রৌপ্যপদক)।
** ৪x১০০ মিটার ফ্রি স্টাইল রিলে ইভেন্টে তৃতীয় স্থান (ব্রোঞ্জপদক)।
জোয়া জন্নাত
এসজিএফআই অনূর্ধ্ব-১৪ দলে সিলেকশন:
কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় সংগঠনের (কেভিএস) জাতীয় স্তরে এই নজরকাড়া সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই তিনি ভারতের স্কুল গেমস ফেডারেশন পরিচালিত অনূর্ধ্ব-১৪ বালিকা সাঁতার দলে নির্বাচিত হন।স্কুল স্তরের চমৎকার প্রশিক্ষণ, কঠোর পরিশ্রম এবং ব্যাক-টু-ব্যাক পদক জয়ের মাধ্যমেই জোয়া জান্নাত ভারতের বয়সভিত্তিক (অনূর্ধ্ব ১৪/১৫) সাঁতার অঙ্গনে একজন সম্ভাবনাময় অ্যাথলেট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
কলকাতা বালিগঞ্জের পিএম শ্রী কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী
জোয়া জন্নাত খেলাধুলার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাকেও সমানভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তাঁর আগামী দিনের প্রধান লক্ষ্য ও পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে রয়েছে,আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা এবং ভারতের জাতীয় সাঁতার দলের হয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া এবং দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনা।