গঙ্গার বুকে যোগের মহাউৎসব: বিশ্বমঞ্চে নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশের প্রস্তুতিতে বাংলা

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 4 d ago
" বিশ্ব যোগ দিবস " ও " পশ্চিমবঙ্গ দিবস" উপলক্ষে গঙ্গা বক্ষে নৌকায় যোগ প্রদর্শনীর মহড়া চলছে
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

গঙ্গা শুধু একটি নদী নয়, বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার চিরন্তন প্রতীক। সেই গঙ্গার বুকেই এবার তৈরি হতে চলেছে এক অভিনব ইতিহাস। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস এবং প্রথমবারের মতো সরকারি উদ্যোগে উদযাপিত পশ্চিমবঙ্গ দিবসকে ঘিরে রাজ্যজুড়ে যখন উৎসবের আবহ, তখন কলকাতার গঙ্গাবক্ষে আয়োজন করা হচ্ছে নজিরবিহীন এক যোগ কার্নিভালের। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ নৌকায় একযোগে যোগাভ্যাসের মাধ্যমে বিশ্বরেকর্ড গড়ার লক্ষ্য নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন।
 
২০ জুন অনুষ্ঠিত হতে চলা এই বিশেষ আয়োজনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। মিলেনিয়াম পার্ক, বাবুঘাট, প্রিন্সেপ ঘাট, বেলুড় এবং দক্ষিণেশ্বর-সহ গঙ্গার দুই তীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছড়িয়ে পড়বে যোগচর্চার আবহ। নদীর বুকে সারিবদ্ধ নৌকাগুলিতে অংশগ্রহণকারীরা একসঙ্গে যোগাভ্যাসে সামিল হলে তা শুধু দৃষ্টিনন্দনই হবে না, বরং ভারতীয় যোগচর্চার ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় যোগ করতে পারে।
 
রাজ্যের প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের প্রতিনিধিরাও। কারণ, চলমান নদীর বুকে নৌকায় একযোগে যোগাভ্যাসের নজির এর আগে ভারতীয় জলপথে প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে কলকাতার গঙ্গা এবার হরিদ্বার, ঋষিকেশ কিংবা বারাণসীর মতো ঐতিহ্যবাহী যোগকেন্দ্রগুলিকেও নতুনভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে চলেছে।
 
তবে এই অনুষ্ঠান শুধুমাত্র রেকর্ড গড়ার প্রচেষ্টা নয়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের এক বৃহত্তর বার্তা। রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ, যোগিরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী, স্বামী যুক্তেশ্বর গিরি কিংবা পরমহংস যোগানন্দের মতো মহাপুরুষদের সাধনভূমি হিসেবে বাংলার এক সমৃদ্ধ যোগ-ঐতিহ্য রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্য কিছুটা আড়ালে চলে গেলেও, নতুন প্রজন্মের সামনে তাকে আবার তুলে ধরার প্রয়াস হিসেবেও দেখা হচ্ছে এই উদ্যোগকে।
গঙ্গার দুই তীরকে কেন্দ্র করে দিনভর উৎসবের পরিকল্পনাও রয়েছে। সন্ধ্যায় ড্রোন শো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আলোকসজ্জায় সেজে উঠবে নদীপাড়। হাওড়া ব্রিজ থেকে বিদ্যাসাগর সেতুর মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে বিশেষভাবে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নদীর ধারে বসবাসকারী মানুষ থেকে শুরু করে পর্যটক— সকলের কাছেই এটি হয়ে উঠতে পারে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
 
এরই মধ্যে পর্যটন দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগগুলি প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। নিরাপত্তা ও পরিকাঠামোগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় চলছে। নৌপরিবহন সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনায়ও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একাধিক সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় এই বিশাল আয়োজন বাস্তবায়িত হবে বলে জানা গিয়েছে।
২১ জুন আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে কলকাতার রেড রোডেও বৃহৎ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। তার ঠিক আগের দিন গঙ্গার বুকে এই ভাসমান যোগ উৎসব কার্যত গোটা উদযাপনের সূচনা করবে। ফলে এবারের যোগ দিবস শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি হয়ে থাকবে না; বরং বাংলার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, নদীমাতৃক ঐতিহ্য এবং বিশ্বজনীন যোগদর্শনের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হবে।
 
বিশ্বরেকর্ড গড়া যাবে কি না, তার উত্তর মিলবে ২০ জুন। তবে তার আগেই বলা যায়, গঙ্গার বুকে ৫০০ নৌকার এই যোগ কার্নিভাল বাংলাকে নতুনভাবে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। যোগ, নদী, সংস্কৃতি এবং মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে তৈরি হতে চলেছে এমন এক দৃশ্য, যা হয়তো আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের নতুন পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠবে।