জল, জঙ্গল আর সীমান্ত: সুন্দরবনে কাঁটাতারের বেড়া, নিরাপত্তার নতুন অধ্যায়

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
সুন্দরবন সীমান্তে ৯০ কিলোমিটার জুড়ে কাঁটাতারের পরিকল্পনা ভারতের
সুন্দরবন সীমান্তে ৯০ কিলোমিটার জুড়ে কাঁটাতারের পরিকল্পনা ভারতের
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী

ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কাঁটাতারের বেড়া, সীমান্ত চৌকি আর বিএসএফের টহল। কিন্তু দেশের এমনও একটি সীমান্ত রয়েছে, যেখানে এতদিন নিরাপত্তার প্রধান ভরসা ছিল না কংক্রিট বা কাঁটাতার, ছিল প্রকৃতিই। জোয়ার-ভাটার নদী, অসংখ্য খাঁড়ি, কাদামাটি আর ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্য ঘেরা সেই সীমান্তের নাম সুন্দরবন। দীর্ঘদিন ধরে এই দুর্গম ভূপ্রকৃতি যেমন অনন্য প্রাকৃতিক ঢাল তৈরি করেছে, তেমনি সীমান্ত সুরক্ষার ক্ষেত্রেও সৃষ্টি করেছে একাধিক জটিলতা। সেই প্রেক্ষাপটেই সুন্দরবনের স্থলভাগে ধাপে ধাপে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।
 
পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় জমি সীমান্ত সুরক্ষা বিভাগের হাতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেখানে স্থলভাগ রয়েছে সেখানে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হবে এবং জলপথে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই প্রকল্প সফল হলে তা শুধু সুন্দরবনের জন্য নয়, দেশের অন্যান্য দুর্গম সীমান্ত এলাকার জন্যও একটি কার্যকর মডেল হয়ে উঠতে পারে।
 
সুন্দরবনের বন্য বিস্ময়ের অনন্য ঝলক
 
সুন্দরবন শুধু একটি বনাঞ্চল নয়; এটি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র। প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই অরণ্যের প্রায় ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে এবং প্রায় ৪,২৬৩ বর্গকিলোমিটার ভারতে অবস্থিত। ভারতীয় সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে রয়েছে জনবসতিপূর্ণ দ্বীপ, নদী-খাঁড়ি, কৃষিজমি এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এর মধ্যেই রয়েছে সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান ও সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ, যা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল। ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এই অঞ্চলের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
 
কিন্তু এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই সীমান্ত রক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থেকেছে। ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের অধিকাংশ স্থলভাগে কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও সুন্দরবনের বড় অংশ নদী ও জলপথনির্ভর। জোয়ারের সময় নদীর গতিপথ বদলে যায়, কোথাও নতুন চর জেগে ওঠে, কোথাও আবার ভাঙনে বিলীন হয়ে যায় পুরনো জমি। ফলে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ যেমন কঠিন, তেমনি নিয়মিত নজরদারিও হয়ে ওঠে অত্যন্ত জটিল।
 
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের সুযোগ নিয়ে অতীতে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, গবাদিপশু পাচার, মাদক পরিবহণসহ বিভিন্ন সীমান্ত-সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ বহুবার সামনে এসেছে। জলপথের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং দুর্গম অরণ্য অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীদের চলাচল সহজ করেছে। তাই যেখানে স্থলভাগ রয়েছে সেখানে কাঁটাতারের বেড়া এবং জলপথে উন্নত নজরদারির সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন প্রশাসনের লক্ষ্য।
 
সুন্দরবনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়ে বিএসএফের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার
 
তবে আধুনিক সীমান্ত সুরক্ষা আর শুধু কাঁটাতারের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রযুক্তিই এখন এই ব্যবস্থার প্রধান শক্তি। থার্মাল ক্যামেরা, নাইট ভিশন ডিভাইস, সেন্সরভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, ড্রোন এবং দ্রুতগতির জলযান ইতিমধ্যেই সীমান্ত পাহারার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সুন্দরবনের মতো দুর্গম অঞ্চলে এই প্রযুক্তি নিরাপত্তা বাহিনীকে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে উল্লেখযোগ্যভাবে সহায়তা করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থলভাগে বেড়া এবং নদীপথে প্রযুক্তিনির্ভর টহলের এই যুগপৎ ব্যবস্থা ভবিষ্যতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
 
তবে নিরাপত্তার প্রশ্নের পাশাপাশি সমান গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশের ভারসাম্য। সুন্দরবন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, লবণজলের কুমির, চিত্রা হরিণ, নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখি এবং বিপুল সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের আবাস এই অঞ্চল। তাই অবকাঠামো নির্মাণের সময় বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল, জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক প্রবাহ এবং ম্যানগ্রোভ অরণ্যের পরিবেশগত ভারসাম্য যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
 
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা। সুন্দরবনের বহু পরিবার কৃষিকাজ, মৎস্যচাষ, মধু সংগ্রহ এবং বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের ফলে জমিতে যাতায়াত, কৃষিকাজ কিংবা দৈনন্দিন চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম চালু হলে তার প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের জীবনে। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে স্থানীয় মানুষের মতামত, প্রয়োজন এবং জীবিকার বিষয়টিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
 
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে প্রথম ভাসমান সীমান্ত চৌকি, মোতায়েন মহিলা বিএসএফ জওয়ানরা
 
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়াতেও উঠে এসেছে আশা ও উদ্বেগ, দুই-ই। হিঙ্গলগঞ্জের এক কৃষকের কথায়, "সীমান্ত আরও সুরক্ষিত হলে চোরাচালান ও অপরাধ কমবে, রাতে অন্তত কিছুটা নিশ্চিন্তে থাকতে পারব। তবে আমাদের জমিতে যাতায়াত যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেই ব্যবস্থাও প্রশাসনকে করতে হবে।" আবার গোসাবার এক মৎস্যজীবীর বক্তব্য, "নিরাপত্তা বাড়ানো জরুরি, কিন্তু নদীপথে মাছ ধরতে যাওয়া বা দৈনন্দিন জীবিকায় যেন অযথা সমস্যার সৃষ্টি না হয়, সেটাও দেখতে হবে।" স্থানীয়দের একাংশের মতে, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে গ্রামবাসীদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা এবং বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে প্রকল্পটি আরও গ্রহণযোগ্য হবে।
 
এদিকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও এই উদ্যোগে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সুন্দরবনে সীমান্ত সুরক্ষা জোরদারের কাজে বিএসএফকে রাজ্য সরকার সমস্ত রকম প্রশাসনিক সহযোগিতা করবে। জমি হস্তান্তর, প্রয়োজনীয় সমন্বয় এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ রক্ষা, সব ক্ষেত্রেই রাজ্য সরকার ইতিবাচক ভূমিকা নেবে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
 
সীমান্তবর্তী বহু বাসিন্দা অবশ্য আশাবাদী। তাঁদের বিশ্বাস, নিরাপত্তা জোরদার হলে সীমান্ত-সংক্রান্ত অপরাধ কমবে, প্রশাসনিক নজরদারি বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবন আরও নিরাপদ হবে। অন্যদিকে, কিছু মানুষের উদ্বেগ জমি অধিগ্রহণ, চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক বিধিনিষেধকে ঘিরে। ফলে প্রকল্পের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের মধ্যে কতটা ভারসাম্য রক্ষা করা যায় তার ওপর।
সুন্দরবনের কাঁটাতারের বেড়া তাই কেবল একটি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প নয়; এটি ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার এক নতুন পরীক্ষা। জল, জঙ্গল এবং জনজীবনের জটিল সমীকরণের মধ্যে দাঁড়িয়ে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ে, কার্যকর নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের আস্থা। যদি এই তিনের সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হয়, তবে সুন্দরবনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য কঠিন ভৌগোলিক সীমান্ত এলাকাতেও অনুসরণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
 
জল আর জঙ্গলের এই অনন্য ভূখণ্ডে কাঁটাতারের বেড়া শুধু একটি সীমারেখা নির্মাণ করবে না; বরং বদলে দিতে পারে সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের ভাবনার ধরন। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান বজায় রেখেই আধুনিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার যে প্রয়াস শুরু হয়েছে, সেটিই হয়তো আগামী দিনের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নতুন দর্শনের ভিত্তি হয়ে থাকবে।


শেহতীয়া খবৰ