মানুষ-বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানকে মডেল করে পুরুলিয়ায় রাজ্যের প্রথম অভয়ারণ্য, ৩৬০৯ হেক্টরজুড়ে নতুন প্রকল্প

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 3 h ago
মানুষ-বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানকে মডেল করে পুরুলিয়ায় রাজ্যের প্রথম অভয়ারণ্য, ৩৬০৯ হেক্টরজুড়ে নতুন প্রকল্প
মানুষ-বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানকে মডেল করে পুরুলিয়ায় রাজ্যের প্রথম অভয়ারণ্য, ৩৬০৯ হেক্টরজুড়ে নতুন প্রকল্প
 
কলকাতা

জঙ্গল থাকবে, বন্যপ্রাণ থাকবে, পাশাপাশি থাকবে মানুষের বসতিও, এই সহাবস্থানকেই ভিত্তি করে জঙ্গলমহলে গড়ে উঠতে চলেছে রাজ্যের প্রথম অভয়ারণ্য। পুরুলিয়ার কোটশিলা ও ঝালদা বনাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে এই মেগা প্রকল্প। বিশেষত্ব হল, অভয়ারণ্য তৈরির জন্য কোনও গ্রামবাসীকেই ভিটেমাটি ছাড়তে হবে না।
 
কোটশিলা বনাঞ্চলের সিমনি ও নোয়াহাতু বিট এবং ঝালদা বনাঞ্চলের কলমা বিটের ২১টি মৌজা মিলিয়ে মোট ৩৬০৯.৪০ হেক্টর এলাকাজুড়ে প্রস্তাবিত এই অভয়ারণ্য গড়ে উঠবে। মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানই হবে প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
 
সাধারণত অভয়ারণ্য তৈরির ক্ষেত্রে সংরক্ষিত এলাকা থেকে গ্রাম সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু পুরুলিয়ার এই পরিকল্পনায় সেই পথে হাঁটছে না বনদপ্তর। বরং ২০২২ সাল থেকে চিতাবাঘের সঙ্গে সহাবস্থান করে আসা স্থানীয় মানুষজনের অভিজ্ঞতাকেই সংরক্ষণের মডেল হিসেবে সামনে রাখা হচ্ছে।
 
গত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই এলাকার গ্রামগুলিতে চিতাবাঘের আনাগোনা রয়েছে। মাঝেমধ্যেই গবাদি পশু শিকার হলেও ক্ষতিপূরণ পাওয়া ছাড়া গ্রামবাসীদের মধ্যে বন্যপ্রাণী নিয়ে বড় ধরনের বিরূপতা তৈরি হয়নি। স্থানীয়দের বক্তব্যও স্পষ্ট, জঙ্গলে চিতাবাঘ থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। বনদপ্তরের মতে, বন্যপ্রাণী নিয়ে স্থানীয় মানুষের এই মানসিকতাই প্রস্তাবিত অভয়ারণ্যের অন্যতম বড় শক্তি।
 
ইতিমধ্যেই অভয়ারণ্য তৈরির ডিটেলস প্রজেক্ট রিপোর্ট (ডিপিআর) অরণ্য ভবনে জমা পড়েছে। প্রস্তাবিত এলাকা ঘুরে দেখেছেন পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছেও তিনি আবেদন জানিয়েছেন। অরণ্য ভবন সূত্রে খবর, প্রস্তাবটি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন। সবুজ সংকেত মিললে চলতি আর্থিক বছরের মধ্যেই অভয়ারণ্যের সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হতে পারে।
 
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার পুরুলিয়া সফরে মুখ্যমন্ত্রী এলে প্রশাসনিক বৈঠকে এই প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতোর কথায়, পুরুলিয়ার বনাঞ্চল বর্তমানে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তার সংরক্ষণ আরও শক্তিশালী হবে।
 
চিতাবাঘ থেকে হানি ব্যাজার, সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের ঠিকানা
 
কোটশিলা ও ঝালদার এই বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল বহুদিন ধরেই হাতির করিডর হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি ভাল্লুকের উপস্থিতিও রয়েছে। ২০২২ সালের শুরুতে জঙ্গলে গবাদি পশুর মৃতদেহ উদ্ধারের পর ফের চিতাবাঘের অস্তিত্ব সামনে আসে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়ে চিতাবাঘের ছবি। তারপর থেকে এলাকায় তাদের নিয়মিত বিচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
 
পুরুলিয়া বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলের সঙ্গে সংযুক্ত এই এলাকায় আনুমানিক ছ’টি পূর্ণবয়স্ক চিতাবাঘ এবং তিনটি শাবক রয়েছে। রয়েছে প্রায় ১০টি স্লথ বিয়ার। বিশ্বের অন্যতম বিরল ও সাহসী প্রাণী হানি ব্যাজারের সংখ্যাও প্রায় ৫০। এছাড়া মরীচিকা বিড়ালের ১০টি আবাসস্থল চিহ্নিত হয়েছে।
 
প্যাঙ্গোলিন, হায়না, বার্কিং ডিয়ার, সজারু এবং বন্য শূকরও এই বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের অংশ। শুধু তাই নয়, ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলের সঙ্গে সংযোগ থাকায় এই এলাকা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের ‘সাইলেন্ট করিডর’ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। পায়ের ছাপ, মূত্র এবং গাছের গায়ে নখের আঁচড়ের মতো একাধিক চিহ্ন পেয়েছে বনদপ্তর।
 
১৮৮ হেক্টরজুড়ে ঔষধি উদ্ভিদের সম্ভার
 
প্রস্তাবিত অভয়ারণ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ঝালদা বনাঞ্চলের কলমা বিট। সেখানে প্রায় ১৮৮.২৭ হেক্টর এলাকা জুড়ে রয়েছে ঔষধি উদ্ভিদ। সংরক্ষণ প্রকল্পে এই অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
 
শুধু বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ নয়, প্রকৃতি ও পর্যটনকেও এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকাঠামোর মধ্যে রয়েছে নেচার ট্রেইল, বার্ড ট্রেইল, ট্রেকিং রুট, জলাধার, ওয়াচ টাওয়ার, ইকো গাইড, রক ক্লাইম্বিং, ক্যাম্পিং এবং প্রকৃতি পাঠশালা। পর্যটকদের জন্য জিপসি সাফারির পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে প্রজাপতি উদ্যান তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে।
 
সেওতি জলপ্রপাত এবং এলাকার শিবমন্দিরকে ঘিরেও ইকো-ট্যুরিজমের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মতি ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়েই এই পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
 
নজরদারিতে থাকবে ১৫টি যৌথ বন পরিচালন কমিটি
 
অভয়ারণ্যের সংরক্ষণ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে ১৫টি যৌথ বন পরিচালন কমিটি। প্রস্তাবিত এলাকায় আবাসস্থল সংরক্ষণ, অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ও দাবানল নিয়ন্ত্রণ, জল ও মাটি সংরক্ষণ এবং নিয়মিত বন্যপ্রাণ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।
 
এর পাশাপাশি তৈরি হবে নির্দিষ্ট গবেষণা ও নজরদারি অঞ্চল। সেখানে স্থায়ী ভেজিটেশন প্লট, ক্যামেরা ট্র্যাপ এবং জলবায়ু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
 
বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নও এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। সিমনি এলাকার বাসিন্দা অজিত কিসকু ও দামোদর কিসকুদের কথায়, অভয়ারণ্য তৈরি হলে সেটি তাঁদের কাছে পুরস্কারের মতো হবে। তাঁদের আশা, পর্যটন ও প্রকৃতিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লে বদলে যেতে পারে এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতিও।
 
মানুষকে সরিয়ে নয়, মানুষকে সঙ্গে নিয়েই বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ, পুরুলিয়ার প্রস্তাবিত এই অভয়ারণ্য সেই মডেলকেই সামনে আনতে চলেছে।


শেহতীয়া খবৰ