ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদের অভিশাপ: মিথ দূরীকরণ, শান্তির চেতনার পুনরুজ্জীবন

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 17 d ago
ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদের অভিশাপ: মিথ দূরীকরণ, শান্তির চেতনার পুনরুজ্জীবন
ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদের অভিশাপ: মিথ দূরীকরণ, শান্তির চেতনার পুনরুজ্জীবন
 
আমির সুহাইল ওয়ানি

দিল্লির সাম্প্রতিক বোমা বিস্ফোরণ শুধু প্রাণহানি ঘটায়নি, এটি আবারও আমাদের সমাজের নৈতিক বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে এক চিন্তাজনক প্রবণতা দেখা যায়, তথ্য যাচাইয়ের আগে উত্তেজনাপূর্ণ সংবাদ শিরোনাম, অনুমানভিত্তিক মন্তব্য, এবং কয়েকজনের অপরাধকে গোটা মুসলিম সমাজ বা ইসলামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। একজন মুসলিম সন্দেহভাজনের নাম সামনে আসতেই ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদের পুরনো বিতর্ক আবারও মাথাচাড়া দেয়, যেন এক ধর্মের শিক্ষাই সহিংসতার উৎস।  এটি এক বিকৃতি, যা সংশোধন দাবি করে; তথ্য, বিশ্বাস এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে।

ইসলাম তার শব্দমূল ও সারবস্তু; দুই দিক থেকেই শান্তি, দয়া ও আত্মিক সম্প্রীতির ধর্ম। “ইসলাম” শব্দটি এসেছে আরবি মূল “স-ল-ম” (s-l-m) থেকে, যার অর্থ শান্তি, নিরাপত্তা এবং আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পণ। এর সম্ভাষণ, “আসসালামু আলাইকুম” (তোমার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক)-প্রতিদিনের জীবনে শুভকামনা ও সম্প্রীতির আহ্বান।

কুরআনের বার্তা স্পষ্ট, “হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান কর, আল্লাহর সাক্ষ্য বহন কর, যদিও তা তোমাদের নিজেদের কিংবা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেই যায়।” (কুরআন ৪:১৩৫)

এই নৈতিক নীতিকে নবী মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনে বাস্তবায়িত করেছিলেন। তিনি এমন এক যুগে নৈতিক বিপ্লব এনেছিলেন, যেখানে গোত্রীয় প্রতিশোধের পরিবর্তে মানবিকতা ও করুণা প্রতিষ্ঠিত হয়। মক্কা বিজয়ের সময়, যারা তাঁকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল ও নিপীড়ন করেছিল, সেই একই নগরীতে প্রবেশ করে তিনি ঘোষণা দেন, “যাও, তোমরা মুক্ত।” ইতিহাসে এটি ক্ষমা ও মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
 
 
দিল্লির বোমা বিস্ফোরণ
 
কুরআন স্বীকার করে যে কখনও সংঘাত অনিবার্য হতে পারে, কিন্তু তারও সীমা নির্ধারণ করে দেয়, “যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, তোমরা আল্লাহর পথে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো; কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (কুরআন ২:১৯০)

যুদ্ধকালেও নবী (সা.) দয়া ও সংযমের আদেশ দিয়েছিলেন। তিনি নিষেধ করেছিলেন নারী, শিশু, বৃদ্ধ, সন্ন্যাসী বা অযোদ্ধাদের হত্যা করতে, এমনকি বৃক্ষ কেটে ফেলার প্রতিও সতর্ক করেছিলেন। তাঁর সেনাবাহিনীকে তিনি বলেছিলেন, “কোনও নারী, শিশু বা বৃদ্ধকে হত্যা করো না। ফলদ বৃক্ষ ধ্বংস করো না, বসতবাড়ি নষ্ট করো না।” (সুনান আবু দাউদ, ২৬১৪)

কুরআনের নীতিও একইভাবে স্পষ্ট, “ধর্মের ব্যাপারে কোনও জবরদস্তি নেই।” (কুরআন ২:২৫৬)

বিশ্বাস ইসলাম মতে একটি স্বাধীন পছন্দের বিষয়, ভয় বা বলপ্রয়োগে তা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। নবী (সা.) বলেছেন, “সেই ব্যক্তিই প্রকৃত মুসলমান, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে।” (সহিহ বুখারি, ১০) এবং আরও বলেছেন, “যে অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।” (সুনান আন-নাসাঈ, ৩৯৮৭)

এই শিক্ষাগুলি ইসলামি নৈতিকতা ও আইনশাস্ত্রের মূলভিত্তি। যারা নিরপরাধ হত্যা করে, তারা ইসলামকে রক্ষা করছে না,বরং অস্বীকার করছে।
 

সন্ত্রাসবাদের কোন ধর্ম নেই
 
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামি আলেম ও ফকিহরা (আইনজ্ঞ) অরাজকতা, বিদ্রোহ (বাগি) ও অযৌক্তিক সহিংসতাকে নিন্দা করেছেন। কুরআনে বলা হয়েছে, “যে কেউ একটি প্রাণ হত্যা করে, যদি না তা প্রাণের বিনিময়ে হয় বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে, তাহলে সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে একজনকে বাঁচায়, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে বাঁচাল।” (কুরআন ৫:৩২)

আধুনিক যুগে ড. মুহাম্মদ তাহিরুল কাদরি তাঁর ঐতিহাসিক Fatwa on Terrorism and Suicide Bombings-এর মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন যে সন্ত্রাসবাদ ও আত্মঘাতী হামলা কুফর,অর্থাৎ বিশ্বাসবিরোধী। আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামিক ফিকহ একাডেমি, এবং ইসলামিক কোঅপারেশন সংস্থা (OIC) সহ বহু প্রতিষ্ঠান সন্ত্রাসবাদকে গুরুতর পাপ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

ইসলামি ইতিহাস শান্তি ও সহাবস্থানের উদাহরণে পরিপূর্ণ। “মদিনা সনদ”—মানব ইতিহাসের প্রথম লিখিত সামাজিক চুক্তি; মুসলিম, ইহুদি ও মুশরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল। খলিফা উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর আমলে জেরুজালেম মুসলিম শাসনের অধীনে এলে কোনও গির্জা ভাঙা হয়নি, কোনও প্রাণহানি ঘটেনি। তাঁর খ্রিস্টানদের সঙ্গে করা চুক্তি আজও সহনশীলতার এক অদ্বিতীয় উদাহরণ।

সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (সালাদিন) ১১৮৭ সালে জেরুজালেম পুনর্দখলের পর সব খ্রিস্টান নাগরিককে নিরাপদে শহর ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দেন—যা ক্রুসেডারদের রক্তপাতের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁর এই উদারতা ইসলামের নৈতিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
 
সন্ত্রাসবাদের সর্বাধিক শিকার মুসলিম দুনিয়া
 
বৈশ্বিক নিরাপত্তা সূচক অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদের সর্বাধিক শিকার নিজেরাই মুসলিম;ইরাক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও নাইজেরিয়ার সাধারণ নারী, পুরুষ ও শিশু। যারা ইসলামের নামে এই অপরাধ করে, তারা ইসলামের প্রতিনিধি নয়, তার বিশ্বাসঘাতক। তাদের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক, জাতিগত বা ব্যক্তিগত, কখনও ধর্মীয় নয়।

তাদের কর্মকাণ্ডকে ইসলামের সঙ্গে যুক্ত করা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি খ্রিস্টধর্মকে কু ক্লাক্স ক্ল্যান বা বৌদ্ধধর্মকে মিয়ানমারের জাতিগত নিধনের সঙ্গে যুক্ত করা। সন্ত্রাসবাদ কোনও ধর্মীয় সমস্যা নয়, এটি এক মানবিক ব্যাধি।

ইসলামি নেতৃত্বের ভূমিকা চরমপন্থাকে প্রতিহত করতে ইসলামি পণ্ডিত ও নেতৃত্বকে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশকের ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের কর্তব্য:
 
 সুস্পষ্ট ফতোয়া প্রদান: সন্ত্রাস ও আত্মঘাতী হামলাকে হারাম ঘোষণা করা।
 
 ভ্রান্ত ব্যাখ্যা প্রতিরোধ: কুরআন ও হাদিসের প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা দিয়ে চরমপন্থার মতাদর্শ ভেঙে দেওয়া।
 
 শান্তি ও সংলাপ প্রচার: আন্তঃধর্মীয় ও নাগরিক উদ্যোগে অংশ নিয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করা।

আগামীর পথ: ইসলামের প্রকৃত চিত্র পুনরুদ্ধার

 
ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা সংশোধন শুধু মুসলমানদের দায়িত্ব নয়, এটি সমগ্র মানবতার দায়িত্ব। সরকার, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
 
 শিক্ষা: যুক্তি, সহানুভূতি ও সামাজিক ন্যায়ের ইসলামী শিক্ষা পুনরুজ্জীবিত করা। তরুণদের শেখাতে হবে যে “জিহাদ” মানে যুদ্ধ নয়, নিজের অহং, অন্যায় ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে নৈতিক সংগ্রাম।
 
 গণমাধ্যমের দায়িত্ব: ধর্মকে অপরাধের সঙ্গে না জুড়ে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করা।
 
 ন্যায় ও অন্তর্ভুক্তি: বঞ্চনা ও নিপীড়ন হতাশা জন্মায়; প্রকৃত সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ হলো ন্যায়, সুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
 
 নারী ও যুবশক্তির ক্ষমতায়ন: সমাজে সক্রিয় অংশগ্রহণই চরমপন্থার সর্বোত্তম প্রতিষেধক।

ইসলামের সারকথা রহমত-দয়া; এর লক্ষ্য শান্তি; এর পথ ন্যায়। নবী (সা.) বলেছেন, “মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়, যে মানুষের সর্বাধিক উপকারে আসে।” (আল-মুজাম আল-আওসত, ৬১৯২)

প্রতিটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ইসলামকে নয়, তার আত্মাকে বিদ্রোহ করে। কুরআনের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, সহাবস্থান, সহানুভূতি ও মানব মর্যাদার আহ্বান, ঘৃণার মতাদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে।

সন্ত্রাসবিরোধী সংগ্রাম অস্ত্রের নয়, চিন্তার যুদ্ধ। এটি সেই লড়াই যা ধর্মকে বিকৃতি থেকে, আর সত্যকে পক্ষপাত থেকে মুক্ত করে। সন্ত্রাসের শিকারদের স্মরণ করতে হলে, মুসলিম হোক বা অমুসলিম, আমাদের পুনরায় উচ্চারণ করতে হবে ইসলামের চিরন্তন বার্তা, “শান্তি বর্ষিত হোক সকলের উপর, যারা শান্তি অনুসন্ধান করে।”