অবৈধ ভোটার ইস্যুতে সরব শুভেন্দু অধিকারী, নির্বাচন কমিশনে জমা পড়ল কয়েক লক্ষ নামের তালিকা

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 2 Months ago
নির্বাচন কমিশনের অফিসে রাজ্যের বিরোধী দল নেতা শুভেন্দু অধিকারী
নির্বাচন কমিশনের অফিসে রাজ্যের বিরোধী দল নেতা শুভেন্দু অধিকারী
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী, কলকাতা 

রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি ও বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে একটি বিশদ অভিযোগপত্র এবং কয়েক লক্ষ “অবৈধ ভোটারের” তালিকা জমা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় বিপুল সংখ্যক মিথ্যা, দ্বৈত এবং অনুপ্রবেশকারীদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে—যা রাজ্যের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য বিপজ্জনক।

নির্বাচন কমিশনের কলকাতা দফতরে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী জানান, তাঁর দল বিজেপির হাতে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের ভোটার তালিকায় অন্তত ১.২৫ কোটি অবৈধ ভোটার থাকতে পারে। এই অভিযোগের সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন যে, প্রশাসনের একটি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে এসব নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে যাতে ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলা যায়।

বিরোধী দলনেতার বক্তব্য, “ভোটার তালিকা নিয়ে রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চলছে। অনেক মৃত ব্যক্তি, ভুয়ো নাম, এমনকি বিদেশি অনুপ্রবেশকারীদেরও ভোটার তালিকায় দেখা যাচ্ছে। আমরা চাই নির্বাচন কমিশন দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে এই ত্রুটি সংশোধন করুক।”

এই প্রেক্ষিতে বিজেপি রাজ্য শাখা “No SIR, No Vote” স্লোগানকে সামনে রেখে এক প্রচারাভিযান শুরু করেছে। SIR বা Special Intensive Revision হল ভোটার তালিকা পর্যালোচনার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া, যা কমিশনের অনুমোদনের ভিত্তিতে রাজ্য জুড়ে চালানো হয়। বিজেপির দাবি, যদি এই বিশেষ সংশোধন কার্যক্রম সময়মতো না হয়, তাহলে আগামীর ভোটে ভোটার তালিকার “অবৈধ অংশ” রাজনীতির ভারসাম্য নষ্ট করবে।

শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আমরা কোনো বৈধ ভোটারকে বাদ দিতে চাই না। যাদের জন্ম, নিবাস ও নথিপত্র বৈধ, তাদের নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। কিন্তু যাঁরা অবৈধভাবে তালিকায় ঢুকেছেন, তাঁদের চিহ্নিত করে বাদ দেওয়া উচিত। এই দায়িত্ব এখন নির্বাচন কমিশনের।”

অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) বিজেপির এই অভিযোগকে তীব্রভাবে খণ্ডন করেছে। দলের মুখপাত্র জানান, “বিজেপি রাজ্যে বিভাজনমূলক রাজনীতি করছে। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি কোনো প্রমাণ ছাড়াই বিভ্রান্তি ছড়াতে চাইছেন।” তৃণমূলের মতে, ভোটার তালিকা নিয়ে কমিশন নিয়মিতভাবে কাজ করছে এবং প্রতিটি অভিযোগ যাচাই করা হচ্ছে।

রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা (সিইও) ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, কমিশন নিরপেক্ষভাবে ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা করবে এবং কোনো বৈধ ভোটার যাতে বাদ না পড়ে, সেদিকে কঠোর নজর রাখা হবে। ইসির তরফে বলা হয়েছে, “কোনো বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে না। আবার কেউ অবৈধভাবে তালিকায় যুক্তও থাকতে পারবে না।”

এই পুরো বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এল, যখন রাজ্যে আগামী বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। বিজেপি দাবি করছে, অবৈধ ভোটারদের নাম থাকলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ণ হবে। অন্যদিকে, তৃণমূলের বক্তব্য, এটি বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণার অংশ মাত্র।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগ-প্রত্যাখ্যানের লড়াই এখন রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব এবং নির্বাচন স্বচ্ছতা—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে ভবিষ্যৎ রাজনীতি অনেকটাই নির্ভর করবে বলে তাঁদের মত।

সবশেষে, নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপই এখন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। শুভেন্দু অধিকারীর জমা দেওয়া তথ্যে কতটা সত্যতা রয়েছে, তা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। কমিশন নিশ্চিত করেছে, আইন মেনে, নিরপেক্ষভাবে এবং প্রযুক্তিগতভাবে সমস্ত নাম যাচাই করা হবে।

রাজ্যের রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই ইস্যু শুধু প্রশাসনিক নয়, ভবিষ্যৎ নির্বাচনের সমীকরণেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, “অবৈধ ভোটার” বিতর্ক রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে—যার প্রভাব ভোটের ময়দানে কতটা পড়বে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।