কর্মসংস্থানের খোঁজে বেঙ্গালুরুতে শ্রমিক হিসেবে নিযুক্ত লখিমপুর জেলার চার যুবকের মৃতদেহ একটি বন্ধ কক্ষে উদ্ধার হওয়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কোকা-কোলার ওয়্যারহাউজে কর্মরত এই যুবকদের দেহ বেঙ্গালুরুর গ্রামীণ জেলার চুলিবেলে থানার অন্তর্গত হোসকোটে তালুকের মুচন্দ্রা গ্রামের একটি ভাড়া করা ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়। নিহতদের পরিচয়, নরেন্দ্র তাইদ (২২), ধনঞ্জয় তাইদ (২৩), ডাক্তার তাইদ (২০) এবং জয়ন্ত চিন্তে (২২)। নরেন্দ্র, ধনঞ্জয় ও ডাক্তার তাইদের বাড়ি ঢকুয়াখোয়ার বর্ষামুখ গ্রামে এবং জয়ন্ত চিন্তের বাড়ি শালমরা গ্রামে।
গতরাতে পাশের ঘরে থাকা লখিমপুরের আরেক যুবক তাঁদের ডাকলেও কোনো সাড়া না পাওয়ার পর দরজা ভেঙে চারজনকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঘরের ভিতর থেকে খাবার রান্নার তীব্র গন্ধ বের হচ্ছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও সন্দেহজনক করে তোলে। খবর পেয়ে চুলিবেলে থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে এবং চারজনের মৃত্যু নিশ্চিত করে।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের ধারণা, ছোট, বন্ধ ঘরে রান্নার ধোঁয়ায় অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে তাঁরা প্রথমে অচেতন হয়ে পড়েন এবং পরে মৃত্যু ঘটে। তবে খাদ্যে বিষক্রিয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। যদি বিষক্রিয়াই কারণ হয়, তবে কারা খাবারে বিষ মিশিয়েছে, তা-ও তদন্তাধীন। অন্য কোনো পক্ষ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, সেই দিকেও পুলিশ খতিয়ে দেখছে।
আজ চারজনের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এর রিপোর্টেই প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে। উল্লেখ্য, সরকারি চাকরির আশ্বাস থাকা সত্ত্বেও পেটের দায়ে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক অসমীয়া যুবক দেশজুড়ে বিভিন্ন রাজ্যে শ্রমিক হিসেবে পাড়ি দিচ্ছে। বাইরে কাজ করতে গিয়ে কিংবা বাড়ি ফেরার পথে রেল দুর্ঘটনায় অসমের বহু যুবকের মৃত্যু সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এই ঘটনা আবারও রাজ্যের বেকারত্বের চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে।
মুচন্দ্রা গ্রামের যে ঘর থেকে দেহগুলি উদ্ধার হয়, তা অত্যন্ত সংকীর্ণ ছিল। চারজনই মেঝেতে শুতেন এবং সেখানেই রান্না করতেন। ঘরে একটি ছোট জানলা ছাড়া বাতাস প্রবেশের অন্য কোনো পথ ছিল না। ফলে রান্নার ধোঁয়ায় অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়ে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে, এই সন্দেহই সবচেয়ে জোরালো।
এদিকে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা অসম পুলিশকে বেঙ্গালুরুর পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নিখুঁত তদন্ত নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার চারজনের মৃতদেহ যথাযোগ্য মর্যাদায় অসমে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে এবং কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন।
বেঙ্গালুরু অসম সোসাইটিও স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে বলে জানা গেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় লখিমপুর জেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের পরিবার গতরাতে শোকবিহ্বল হয়ে পড়েছে। জয়ন্ত চিন্তে মাত্র আট মাস আগে বিবাহিত হন এবং ছয় মাস আগে কাজের সন্ধানে বেঙ্গালুরু যান। তাঁর স্ত্রী জানিয়েছেন, গতকাল সন্ধ্যায় তিনি স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন; রান্না করার কথাও জানিয়েছিলেন জয়ন্ত। ঘটনাস্থলে দেখা গেছে, রান্না করা খাবার অখাদ্য অবস্থায় পড়েছিল এবং গ্যাস সিলিন্ডার অন ছিল।
ঘরের পাশেই থাকা লখিমপুরের আরেক যুবক রাতে কাজে থেকে ফিরে তাঁদের মৃত অবস্থায় প্রথম দেখতে পান এবং পরিবারকে খবর দেন। এই ঘটনা বেঙ্গালুরুতে কর্মরত অসমের বহু যুবকের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পুলিশের বিস্তারিত তদন্তেই এই রহস্যজনক ঘটনার পেছনের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে।