দেবকিশোর চক্রবর্তী, ঠাকুরনগর
সন্ধ্যা নামছে ঠাকুরনগরের আকাশে। শীতের হালকা হাওয়া বইছে, কিন্তু অনশন মঞ্চের পাশে সেই বাতাসে মিশে আছে এক অন্য উত্তাপ— উদ্বেগ, প্রতীক্ষা, আর অটল সংকল্পের। মতুয়া মহাসঙ্ঘের অনশন আজ ষষ্ঠ দিনে পা দিয়েছে। দীর্ঘ অনশনের ক্লান্তি স্পষ্ট অনশনকারীদের মুখে, কিন্তু চোখে এখনো ভরসা— সরকারের কাছ থেকে লিখিত আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবেই।
মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ অনশনকারী বললেন, “শরীর খারাপ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের লড়াই থামবে না। নাগরিকত্ব আমাদের অধিকার।” তাঁর কণ্ঠস্বর দুর্বল, কিন্তু দৃঢ়। কিছু দূরেই স্বেচ্ছাসেবকরা ওআরএস মিশিয়ে জল দিচ্ছেন, কেউ কেউ স্যালাইন হাতে বসে আছেন। ইতিমধ্যেই ছয়জন অনশনকারী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তাঁদের মধ্যে দু’জনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মঞ্চের চারপাশে জমেছে শতাধিক সমর্থক। কেউ গান গাইছেন, কেউ মোমবাতি হাতে প্রার্থনা করছেন। এক বৃদ্ধা কাঁপা গলায় বললেন, “আমরা ঠাকুর হরিচাঁদের সন্তান। আমাদের বাংলাদেশি বললে কষ্ট হয়।” তাঁর পাশে এক কিশোরী চুপচাপ জল দিচ্ছে অনশনকারীদের।
রাজনৈতিক তাপমাত্রাও বেড়েছে এই অনশন ঘিরে। দিনভর চর্চায় কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের মন্তব্য— “এই অনশন জঙ্গিদের নাগরিকত্বের সমর্থনে।” সন্ধ্যার পর মঞ্চে দাঁড়িয়ে মতুয়া মহাসঙ্ঘের সঙ্ঘাধিপতি মমতাবালা ঠাকুর সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেন, বলেন, “আমাদের অপমান করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা পিছিয়ে যাব না।” সঙ্গে ঘোষণা করেন, বুধবার থেকে তিনিও অনশনে যোগ দেবেন।
ঠাকুরনগরের রাজপথে তখন রাজনৈতিক কর্মীদের ছোট ছোট মিছিল ঘুরছে। কেউ ‘ন্যায়ের লড়াই জারি রাখো’ স্লোগান তুলছেন, কেউ আবার মোবাইলে লাইভ করছেন ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত। চিকিৎসকেরা চিন্তিত অনশনকারীদের শারীরিক অবস্থান নিয়ে; স্থানীয় থানার কর্মকর্তারা নজর রাখছেন পুরো পরিস্থিতির ওপর।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। মঞ্চে প্রজ্বলিত মোমবাতির আলোয় মুখগুলোয় জ্বলছে দৃঢ়তা। এক তরুণী অনশনকারীর কথায় দিনের শেষ শব্দগুলো যেন অনশনের প্রতীক হয়ে ওঠে—“আমরা নাগরিকত্ব চাই, মর্যাদা চাই। যতদিন না পাই, ততদিন এই মঞ্চ ছেড়ে যাব না।”