একসময় মাওবাদী সন্ত্রাসে জর্জরিত অঞ্চলগুলি এখন শান্তি, বিশ্বাস ও উন্নয়নের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। ছত্তিশগড়ের ২৬তম প্রতিষ্ঠা দিবসে রাজ্যবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে এমনই মন্তব্য করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর মতে, মাওবাদ দমনে নির্ণায়ক সাফল্য রাজ্যে উন্নয়নের নতুন পরিবেশ তৈরি করেছে। বস্তারের পরিবর্তন নিয়েও গর্ব প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
শনিবার ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাইকে লেখা একটি চিঠিতে মোদি রাজ্যের উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। রবিবার নিজের এক্স হ্যান্ডেলে সেই চিঠি প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান মুখ্যমন্ত্রী। ছত্তিশগড়ের মাটি, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও পরিশ্রমী মানুষের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভালোবাসা রাজ্যের কাছে গর্ব ও অনুপ্রেরণার বিষয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০০০ সালের ১ নভেম্বর মধ্যপ্রদেশ থেকে পৃথক হয়ে ছত্তিশগড় রাজ্যের জন্ম হয়। দীর্ঘ চার দশকের মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলনের অবসানের পর ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ রাজ্যকে নকশালমুক্ত ঘোষণা করা হয়।
চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর দূরদর্শী নেতৃত্বে ছত্তিশগড় গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করেছিল। সেই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই রাজ্যে উন্নয়নের নতুন যাত্রা শুরু হয়।
মোদির কথায়, একসময় মাওবাদী প্রভাবিত ‘রেড করিডর’ হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলি এখন শান্তি, আস্থা ও উন্নয়নের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। মাওবাদ দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের উন্নয়নের অন্যতম বড় বাধা ছিল। কিন্তু এই বিপদের বিরুদ্ধে নির্ণায়ক সাফল্য অর্জনের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আধুনিক পরিকাঠামোর সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হয়েছে।
ছত্তিশগড়ের সঙ্গে নিজের দীর্ঘ সম্পর্কের কথাও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। অবিভক্ত মধ্যপ্রদেশের অংশ থাকাকালীনও তিনি একাধিকবার এই অঞ্চলে এসেছেন বলে জানান। সরগুজার বনাঞ্চল থেকে বস্তার পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় সফরের অভিজ্ঞতা তাঁকে রাজ্যের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা বুঝতে সাহায্য করেছে।
গত বছর রাজ্যের রজতজয়ন্তী উদযাপনে যোগ দেওয়ার স্মৃতিও তুলে ধরেন মোদি। সেই সময় নতুন বিধানসভা ভবনের উদ্বোধন তাঁর কাছে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল বলে জানান।
পরিকাঠামোগত উন্নয়নের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২৫ বছর আগে দিল্লি ও রায়পুরের মধ্যে দিনে মাত্র একটি বিমান চলাচল করত। বর্তমানে ছত্তিশগড়ে চারটি আধুনিক বিমানবন্দরের নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যে ৫১ হাজার কোটি টাকারও বেশি রেল প্রকল্পের কাজ চলছে। বন্দে ভারত ও অমৃত ভারত-এর মতো আধুনিক ট্রেন পরিষেবাও চালু হয়েছে।
সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের ফলে রায়পুর থেকে বিলাসপুরের যাতায়াতের সময় প্রায় অর্ধেক কমেছে। পাশাপাশি বিশাখাপত্তনম এবং রাঁচি-ধানবাদকে সংযুক্তকারী প্রস্তাবিত এক্সপ্রেসওয়েগুলি রাজ্যের যোগাযোগ, শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়াবে বলে আশাবাদী প্রধানমন্ত্রী।
উন্নয়নমূলক প্রকল্পের পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণের বিষয়টিও চিঠিতে তুলে ধরেছেন তিনি। সন্ত গুরু ঘাসিদাসের ‘মনখে-মনখে এক সমান’ অর্থাৎ সকল মানুষ সমান—এই বার্তা এবং ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ নীতির ভিত্তিতে সরকারের কাজ চলছে বলে জানান মোদি।
আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় যোগাযোগ ও মৌলিক পরিষেবা উন্নত করতে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা, পিএম জনমন এবং ধরতি আবা জনজাতীয় গ্রাম উৎকর্ষ অভিযানের মতো প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে ৭৩ লক্ষ দরিদ্র পরিবারকে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়া হচ্ছে। গ্রামীণ ও শহরাঞ্চল মিলিয়ে ২২ লক্ষেরও বেশি স্থায়ী বাড়ি তৈরি হয়েছে। ধান সংগ্রহ ব্যবস্থার মাধ্যমে ২৫ লক্ষেরও বেশি কৃষক উপকৃত হচ্ছেন। অন্যদিকে, মহতারি বন্দন যোজনার আওতায় ৬৮ লক্ষেরও বেশি মহিলা প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে পাচ্ছেন।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ছত্তিশগড়ের অগ্রগতির কথা তুলে ধরেছেন মোদি। এইমস, আইআইটি, আইআইআইটি, আইআইএম এবং এনআইএফটির মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজ্যের তরুণ প্রজন্মকে নতুন সুযোগ দিচ্ছে। পাশাপাশি পিএম-সেতু এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্টার্নশিপ প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
আধুনিক শহর হিসেবে নয়া রায়পুরের উত্থানের কথাও উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ইন্ডিয়া এআই মিশন এবং সেমিকন্ডাক্টর মিশনের আওতায় ছত্তিশগড়কে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ চলছে বলে জানান তিনি।
রাজ্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রসঙ্গে ভগবান রামের সঙ্গে ছত্তিশগড়ের যোগ, সন্ত গুরু ঘাসিদাস, কবীরপন্থী ঐতিহ্য এবং পদ্মবিভূষণ সম্মানপ্রাপ্ত তীজন বাইয়ের পাণ্ডবনীর কথা উল্লেখ করেন মোদি।
চিঠির শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্যে ছত্তিশগড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। রাজ্যের ‘অঞ্জোর ভিশন’ নথি বিকশিত ছত্তিশগড় গড়ার স্বপ্নকে নতুন দিশা দেখাবে বলেও আশাপ্রকাশ করেন তিনি। প্রতিষ্ঠা দিবসে মুখ্যমন্ত্রী-সহ রাজ্যবাসীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।