শিলিগুড়ি
কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগের অছিলায় ভারতে প্রবেশ, অথচ নেপথ্যে কি ছিল অন্য কোনও উদ্দেশ্য? উত্তরবঙ্গের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেন নেকে’ নজরদারি চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহের কেন্দ্রে এক চিনা নাগরিক। নেপালি পরিচয় দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশের অভিযোগে ওই চিনা নাগরিক এবং তাঁর নেপালি গাইডকে আটক করেছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সম্ভাব্য চরবৃত্তির যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্রে খবর, ধৃত চিনা নাগরিকের নাম ইউহাস লিউ। চলতি মাসেই চিন থেকে নেপালে আসেন তিনি। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় নেপালি গাইড দীনেশ পুরির সঙ্গে। অভিযোগ, শুক্রবার ভোররাতে দু’জনে নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের দিকে এগোচ্ছিলেন। সেই সময় টহলরত সশস্ত্র সীমা বলের (SSB) জওয়ানদের নজরে পড়েন তাঁরা। তাঁদের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন জওয়ানরা। পরে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারাও তদন্তে যোগ দেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীনেশ নিজেকে নেপালের বাসিন্দা বলে পরিচয় দেন। লিউও একই পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর কথাবার্তাতেই সন্দেহ দানা বাঁধে। ভাঙা ইংরেজি ছাড়া নেপালি কিংবা হিন্দি ভাষায় কথা বলতে পারছিলেন না তিনি। এরপর দোভাষীর সাহায্যে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই সামনে আসে আসল পরিচয়। জানা যায়, লিউ আদতে চিনের নাগরিক। এরপরই দু’জনকে আটক করা হয়।
জেরায় দীনেশের দাবি, কাঞ্চনজঙ্ঘার বিভিন্ন দিক থেকে ছবি তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন লিউ। সেই কারণেই তাঁকে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন তদন্তকারীরা। পর্যটনের আড়ালে অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় প্রবেশের পরিকল্পনা কেন করা হয়েছিল, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, ভারতে ঢোকার পর কোন কোন এলাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনও ছবি বা ভিডিও তোলা হয়েছিল কি না, ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দু’জনের পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে সম্ভাব্য যোগাযোগ এবং গতিবিধির সূত্র খুঁজছেন গোয়েন্দারা। তাঁদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানা গিয়েছে।
উল্লেখ্য, উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি করিডর ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। চিন সীমান্তের নৈকট্য এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চল বরাবরই নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। করিডরের নিরাপত্তা জোরদার করতে সম্প্রতি একাধিক পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্র।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি এই অঞ্চলের আকাশসীমায় নজরদারি বাড়াতে মোতায়েন করা হয়েছে ইজরায়েলি অ্যারোস্ট্যাট রাডার। বেলুনের সাহায্যে অনেক উঁচুতে অবস্থান করে এই রাডার পাহাড়ের আড়ালেও আকাশপথের গতিবিধি শনাক্ত করতে পারে। কম উচ্চতায় উড়ে আসা ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল এবং যুদ্ধবিমান শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও এর বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে। ইজরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের তৈরি এই ত্রিমাত্রিক রাডারের নজরদারির পরিসর প্রায় ৫০০ কিলোমিটার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অজুহাতে এক চিনা নাগরিকের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশের ঘটনা নিরাপত্তা সংস্থাগুলির উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে এটি নিছক পর্যটনের পরিকল্পনা, নাকি এর আড়ালে কোনও গুপ্তচরবৃত্তির ছক ছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্তের পরেই।