আযান আর শাঁখের মেলবন্ধনে থাকা সংসার ছেড়ে কাঁটাতারে শেষ মোনাজাত, বহু বছর এপারে থেকে এবার চোখের জলে সীমান্ত পার সংখ্যালঘুদের

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Aparna Das • 13 d ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
তরুণ নন্দী / কলকাতা

ভোর হতেই হাকিমপুর চেক পোস্টে একরাশ চেনা-অচেনা মুখের ভিড় জমছে। উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার বিথারী হাকিমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের এই সীমান্তে দাঁড়িয়ে তাঁরা ওপারে যাওয়ার জন্য এখন শুধুই অপেক্ষার প্রহর গুণছেন। ১৭০ জন মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে বেশিরভাগ বাংলাদেশি মুসলিম নারী-পুরুষ। ওপারে বাংলাদেশ, এপারে ভারত। মাঝে শুধু সীমান্ত বোঝাতে রয়েছে কাঁটাতার।
 
সীমান্তে অপেক্ষারত এই মানুষগুলো জানালেন, কয়েক বছর আগে পেটের দায়ে বেঁচে থাকার তাগিদে দালালের হাত ধরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এপারে পা রেখেছিলেন এই মানুষগুলো। এপারে এসে পেটের ভাত জোগাড় করতে কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে ভিন্ন রাজ্যে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন। কেউ আবার এ দেশেই ঘর বেঁধেছেন। বিয়ে করে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়েছেন এ মাটিকে ভালোবেসে। কেউ কেউ টাকার বিনিময়ে আধার কার্ড, রেশন কার্ড বা সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সবই জুটেছিলেন পরিচয়ের আড়ালে। কিন্তু বাংলার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হতেই প্রশাসনের সক্রিয়তায় ভারতে উড়ে এসে জুড়ে বসা অনুপ্রবেশকারীদের এবার তাড়ানোর পালা শুরু হয়েছে।
 
প্রতীকী ছবি
 
BSF-এর ক্যাম্প আর হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রশাসনিক নানা হিসাব-নিকাশ। ফিঙ্গারপ্রিন্ট, বায়োমেট্রিক আইকন টাচ আর নথিপত্র যাচাইয়ের কম্পিউটারের স্ক্রিনটা এবার মুছে দিচ্ছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এদেশের অলিখিত পরিচয়। বাদুড়িয়া ও স্বরূপনগরের হোল্ডিং সেন্টারে থাকা শিশু, মহিলা ও পুরুষদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে খাওয়া-দাওয়া, স্বাস্থ্য আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ফিরে যাওয়ার সময় তাঁদের মনের ভেতরের যে ক্ষত তৈরি হচ্ছে তা হয়ত সারাজীবন স্মৃতি হয়ে থাকবে।
 
বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার আগে ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন এক মুসলিম নারী। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, সংসার পেতেছিলাম, প্রতিবেশীদের আপন ভেবেছিলাম। আজ সব ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। এপার-ওপার যাই হোক, মনটা তো এই মাটিতেই পড়ে রইল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক মুসলিম যুবকের চোখেও জল দেখা দিল। তিনিও আক্ষেপ করে বললেন, পেটের দায়ে এসে এই দেশকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, আজ 'অনুপ্রবেশকারী'র তকমা নিয়ে বিদায় নিতে হচ্ছে এই আক্ষেপটা থেকে যাবে।
 
সূত্রের খবর, প্রতিটি থানা এলাকায় নতুন হোল্ডিং সেন্টার তৈরির প্রশাসনিক নির্দেশ জারি হয়েছে। গতকালও কয়েকশো মানুষকে পুশব্যাক করা হয়েছে। প্রশাসন তার নিয়ম পালন করছে। কিন্তু হাকিমপুর চেক পোস্টের এই চত্বরটায় চোখ ঘোরালে শুধুই দেখা যাবে বিমর্ষ মুখের সারি।
 
বাংলাদেশে ফিরে হয়তো নতুন করে জীবন সংগ্রামে লড়াই নামতে হবে, কিন্তু এপারের মাটির গন্ধ, ফেলে যাওয়া চেনা মুখ আর বছরের পর বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা স্মৃতির মায়া সহজে ভুলতে পারবেন না কেউই। চোখের জলে একদল মানুষ বিদায় নিচ্ছেন এক নীরব অপূর্ণতায়। আবার নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজতে পেতে কতটা বেগ পেতে হবে তা বোধহয় আঁচ করতে পারছেন এই বাংলাদেশিরা।


শেহতীয়া খবৰ