হিমালয়ের স্বপ্ন ভেঙে জেরক্সের দোকানে জীবনযুদ্ধ: ২০ আঙুল হারিয়েও হার মানেননি পর্বতারোহী সুমিত

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 6 h ago
হিমালয়ের স্বপ্ন ভেঙে জেরক্সের দোকানে জীবনযুদ্ধ: ২০ আঙুল হারিয়েও হার মানেননি পর্বতারোহী সুমিত
হিমালয়ের স্বপ্ন ভেঙে জেরক্সের দোকানে জীবনযুদ্ধ: ২০ আঙুল হারিয়েও হার মানেননি পর্বতারোহী সুমিত
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

একসময় স্বপ্ন ছিল হিমালয়ের দুর্গম শৃঙ্গে ভারতের পতাকা ওড়ানোর। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য বছরের পর বছর কঠোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন হুগলির পাণ্ডুয়ার তিন্না গ্রামের যুবক সুমিত দাস। কিন্তু পাহাড় জয়ের সেই অভিযানের স্মৃতি আজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা। ফ্রস্টবাইটে হাত ও পায়ের মোট ২০টি আঙুল হারিয়ে বর্তমানে একটি ছোট্ট জেরক্স ও স্টেশনারি দোকান চালিয়ে জীবনের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
 
সুমিতের অভিযোগ, ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুব কল্যাণ দপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত শ্রীকৈলাস পর্বত অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। অভিযানের উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। কিন্তু অভিযানের জন্য যে জ্যাকেট, জুতো, গ্লাভস, স্লিপিং ব্যাগ ও অন্যান্য সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল, সেগুলি বরফাচ্ছন্ন পরিবেশের উপযোগী ছিল না। নিম্নমানের ওই সরঞ্জামের কারণেই তিনি মারাত্মক ফ্রস্টবাইটে আক্রান্ত হন বলে দাবি তাঁর।
 
সুমিত জানান, ২০১৭ সালে সুদর্শন পর্বত অভিযানের একটি বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করেছিলেন তিনি। নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমে সুদর্শন শৃঙ্গে যাওয়ার কথা বলা হলেও পরে তাঁদের উত্তরাখণ্ডের ২২,৭৪৪ ফুট উচ্চতার শ্রীকৈলাস অভিযানে পাঠানো হয়। অভিযানে যাওয়ার আগে অংশগ্রহণকারীদের জানানো হয়েছিল, তাঁরা কোন শৃঙ্গে যাচ্ছেন, তা কাউকে বলা যাবে না।
 
সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে সুমিত বলেন, “রাতে তাঁবুর মধ্যে শুয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখি তাঁবুর ছাদ দিয়ে জল পড়ছে। আমাদের দেওয়া জ্যাকেট, স্লিপিং ব্যাগ, জুতো বা গ্লাভস—কোনওটাই বরফের জন্য উপযুক্ত ছিল না। কোমরসমান বরফ কেটে এগোতে হয়েছে। এরপরই ফ্রস্টবাইট হয়।”শুধু সুমিত নন, তাঁর দাবি, ওই অভিযানে অংশ নেওয়া আরও কয়েকজন পর্বতারোহীও একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারও হাতের আঙুল, কারও পায়ের আঙুল কেটে বাদ দিতে হয়। তবে সবচেয়ে গুরুতর অবস্থার মুখোমুখি হন সুমিত। দীর্ঘ চিকিৎসার পর কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসকদের তাঁর হাত ও পায়ের সবকটি আঙুল কেটে বাদ দিতে হয়।
 
অভিযানের পরও দুর্ভোগ থামেনি। সুমিতের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর সরকারি তরফে তিনি কোনও আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ পাননি। এমনকি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত সাহায্য মেলেনি। বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ জানিয়েও কোনও সুরাহা পাননি বলে দাবি তাঁর। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, “যদি ভালো মানের সরঞ্জাম দেওয়া হতো, তাহলে হয়তো আজ আমার হাত-পায়ের আঙুলগুলো থাকত।”
 
২০১২ সালে পর্বতারোহণ শুরু করেন সুমিত। ২০১৩ সালে হিমাচল প্রদেশের সিভি-১৩ শৃঙ্গ জয় করেন। পরে দার্জিলিংয়ের মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণও নেন। লক্ষ্য ছিল দেশের অন্যতম সফল পর্বতারোহী হওয়া। কিন্তু শ্রীকৈলাস অভিযানের সেই মর্মান্তিক ঘটনা তাঁর সমস্ত স্বপ্নকে মুহূর্তে ভেঙে দেয়।বর্তমানে আঙুল না থাকায় অন্য কোনও পেশায় সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই নিজের গ্রামেই একটি ছোট্ট জেরক্স ও স্টেশনারি দোকান খুলে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। তবুও তাঁর অভিযোগ, সরকারি অবহেলা ও নিম্নমানের সরঞ্জামের জন্য তাঁকে আজীবন এই মূল্য দিতে হচ্ছে।
 
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। পাণ্ডুয়ার বিজেপি বিধায়ক তুষার মজুমদার অভিযোগ করেছেন, তৎকালীন ক্রীড়া দফতরে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছিল এবং পর্বতারোহীদের জন্য নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছিল। তিনি সুমিতের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন এবং বিষয়টি রাজ্য সরকারের নজরে আনার কথাও বলেছেন।
এক সময় যিনি পাহাড় জয়ের স্বপ্ন দেখতেন, আজ তিনি প্রতিদিন জয় করার চেষ্টা করেন নিজের জীবনকে। শরীরের ২০টি আঙুল হারিয়েও সুমিত দাসের অদম্য মানসিক শক্তি যেন আমাদের একটাই শিক্ষা দেয়—স্বপ্ন ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু সংগ্রাম কখনও থেমে থাকে না।


শেহতীয়া খবৰ