জলাশয়ের ‘অভিশাপ’ এখন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার! গৌরব আনন্দের হাত ধরে কচুরিপানার সৌজন্যে ভাগ্যবদল হচ্ছে সংখ্যালঘু মহিলাদের

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Aparna Das • 11 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
তরুণ নন্দী / কলকাতা

যে কচুরিপানাকে গ্রামবাংলার জলাশয়ের ‘অভিশাপ’ মনে করা হয়, সেই কচুরিপানাই এখন উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরের ৫০জনের অধিক দুঃস্থ সংখ্যালঘু পরিবারের অন্নসংস্থানের মূল চাবিকাঠি। নদী, পুকুর বা ছোটখাটো জলাশয়ে জন্মানো কচুরিপানা শুকিয়ে তাকেই শৈল্পিক রূপ দিয়ে রোজগারের পথ বেছে নিয়েছেন এলাকার সংখ্যালঘু মহিলারা। গ্রামের অর্থনীতিকে বদলে দেওয়া এই অসাধ্যসাধনের নেপথ্য কারিগর গৌরব আনন্দ ও সচ্ছতা প্রকারের একনিষ্ঠ সদস্য কৌশিক মন্ডল ও রেহেনা খাতুনের হাত ধরে হালিশহরের একটি ছোট ঘরে গড়ে উঠেছে এই অনন্য কর্মশালা।
 
এখানে এলে দেখা যাবে, জলাশয় থেকে তুলে আনা কচুরিপানা রোদে শুকিয়ে তার আঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে একের পর এক চোখধাঁধানো নজরকাড়া সামগ্রী। কচুরিপানা থেকে যে এত ধরনের আধুনিক জিনিস তৈরি হতে পারে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
 

কী নেই সেই তালিকায়? আভিজাত্যে ভরা লেডিজ ব্যাগ থেকে শুরু করে শাড়ি, ডায়েরি, বাহারি গয়না, ফাইল, পেনদানি, এমনকি সুদৃশ্য ট্রে ও ফলের সাজি। জলাশয়ের সাধারণ আগাছা থেকে তৈরি হওয়া এই পণ্যসামগ্রীগুলো এখন রীতিমত টেক্কা দিচ্ছে প্লাস্টিক বা কৃত্রিম উপকরণের তৈরি আধুনিক ঘর সাজানোর ইউনিটগুলোকে।
 
বলা ভালো, পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু পরিবারের মহিলাদের আর্থিক মেরুদণ্ড শক্ত করতে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সমাজকর্মী রেহেনা খাতুন। প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন এলাকার সংখ্যালঘু মহিলাকে তিনি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে পেশাদার শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
 
প্রতীকী ছবি
 
কৌশিকবাবু ও রেহেনা খাতুন হাসিমুখে তার উদ্দেশ্যের কথা বলতে গিয়ে জানালেন, আমরা চাই গ্রামের মহিলারা যেন কারও মুখাপেক্ষী না থেকে নিজের যোগ্যতায় সংসার চালাতে পারেন। কচুরিপানা জোগাড় করতে তেমন কোনও সমস্যা নেই। জোগাড় করে নিতে পারলেই  শুধু প্রয়োজন পরিশ্রম আর সৃজনশীলতা দিয়ে তৈরি হবে অসাধারণ আইটেম। আর আমরা সেই পথটাই দেখাচ্ছি। হালিশহরের ছোট ঘরটিতে এখন জায়গার বড় অভাব, তাই ভাগে ভাগে কাজ করতে হয় মহিলাদের। কিন্তু তাতে তাঁদের উৎসাহে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।
 
বলা ভালো, এই কর্মশালায় কাজ করতে আসা মহিলারা শুধু অর্থনৈতিক সচ্ছলতাই পাননি বরং তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন এক নতুন পরিচয়। তাঁদের কাছে এই ওয়ার্কশপটি একটি বৃহৎ পরিবারের সমান। সারাদিন সহকর্মীদের সঙ্গে গল্প আর হাসাহাসির মাঝেই চলে নিপুণ হাতের কাজ।
 
কর্মশালায় কাজ করতে ব্যস্ত মহিলাদের একটি দৃশ্য
 
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক মহিলা আনন্দের সঙ্গে জানালেন, আগে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। এখন নিজের হাতে কাজ করে রোজগার করছি। নিজেদের হাতের তৈরি সামগ্রী মেলা বা প্রদর্শনীতে যখন বিশেষ কদর পায়, তখন বুকটা গর্বে ভরে যায়।
 
কথা প্রসঙ্গে জানা গেল, কৌশিক মন্ডলের উদ্যোগে এই হস্তশিল্পগুলো রাজ্যের বিভিন্ন নামী প্রদর্শনী ও মেলায় পাঠানো হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব হওয়ায় কচুরীপানা শিল্পের দিকে ক্রেতাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। বিক্রি থেকে আসা লভ্যাংশ সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে মহিলাদের হাতে।
 
কর্মশালায় কাজ করতে ব্যস্ত মহিলাদের একটি দৃশ্য
 
কৌশিকবাবুর স্বপ্ন আরও বড়। তিনি চান ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এই কর্মশালা গড়ে উঠুক। আর কচুরিপানা থেকে তৈরি শিল্পের হাত ধরে এলাকার আরও বহু মহিলা এই স্বনির্ভরতার পথ খুঁজে পান।
 
পরিবেশ বাঁচিয়ে কচুরীপানা নামক আগাছাকে সম্পদে পরিণত করে হালিশহরের এই ‘কচুরিপানা মডেল’ আজ গোটা বাংলায় আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। গ্রামের দুঃস্থ মহিলারা ঘরের কাজের পাশাপাশি আজ তৈরি করছেন ঘর সাজানোর বিশ্বমানের সামগ্রী। হয়ত একেই বলে প্রকৃত ক্ষমতায়ন।