পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের মাটির বাড়ি থেকে জাতীয় স্বীকৃতির মঞ্চে পৌঁছানোর গল্প যেন রূপকথাকেও হার মানায়। একসময় যাঁদের সংসারে দু’বেলা পেটভরে ভাত জুটত না, আজ সেই দুই ছৌ শিল্পী ভারতের সর্বোচ্চ সাংস্কৃতিক সম্মানগুলির অন্যতম সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হতে চলেছেন। এই স্বীকৃতি শুধু দুই শিল্পীর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বাংলার লোকসংস্কৃতির দীর্ঘদিনের সাধনা ও সংগ্রামেরও স্বীকৃতি।
সম্প্রতি ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীন সঙ্গীত নাটক আকাদেমি ১০৮ জন শিল্পীর নাম ঘোষণা করেছে। সেই তালিকায় স্থান পেয়েছেন পুরুলিয়ার দুই ছৌ শিল্পী, পুরুলিয়া ১ নম্বর ব্লকের বালিগাড়া গ্রামের নৃপেন সহিস এবং বাঘমুন্ডির কুশলডি গ্রামের সোমনাথ মাহাতো। নৃপেন সহিস ২০২৪ সালের নৃত্য বিভাগে সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন, আর তরুণ শিল্পী সোমনাথ মাহাতো পাচ্ছেন উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান যুব পুরস্কার।
ছৌ শিল্পী সোমনাথ মাহাতো
এই দুই শিল্পীর জীবনের গল্প যেন এক সুদীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। নৃপেন সহিসের শৈশব কেটেছে চরম অভাবের মধ্যে। পরিবারে অর্থনৈতিক সংকট এতটাই প্রকট ছিল যে অনেক সময় না খেয়েই রাত কাটাতে হয়েছে। জঙ্গলের শাকপাতা খেয়েও দিন গুজরান করতে হয়েছে তাঁদের। কিন্তু দারিদ্র্য কখনও তাঁর শিল্পচর্চার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। মাত্র ১০-১১ বছর বয়সে দাদু রাসু সহিসের কাছে ছৌ নাচের পাঠ শুরু করেন তিনি। পরবর্তীকালে পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার দায় কাঁধে নিয়ে পড়াশোনার বদলে পুরোপুরি নিজেকে উৎসর্গ করেন এই লোকনৃত্যের জন্য।
আজ ৫৪ বছর বয়সেও নৃপেন সহিস ছৌ মঞ্চে সমান সাবলীল। কৃষ্ণ, গণেশ, কার্তিক, মহিষাসুর কিংবা দুর্গা, একাধিক চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিল্পীজীবন এখন নতুন প্রজন্মের কাছেও অনুপ্রেরণা। তাঁর দুই ছেলেও বাবার হাত ধরেই ছৌ নাচ শিখছেন এবং পারিবারিক ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।
অন্যদিকে, সোমনাথ মাহাতোর গল্পও কম অনুপ্রেরণার নয়। পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের সন্তান সোমনাথের শিল্পজীবনের প্রথম শিক্ষক তাঁর বাবা সাধুচরণ মাহাতো। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সাধুচরণ মাহাতো নিজেও ছৌ নাচের জন্য সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। অর্থনৈতিক অনটনের মধ্যেও ছোট্ট একটি মুদি দোকান চালিয়ে ছেলের স্বপ্নপূরণে পাশে থেকেছেন তিনি।
ভূগোলে অনার্স এবং ছৌ নাচে ডিপ্লোমাধারী সোমনাথ ইতিমধ্যেই দেশ-বিদেশে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে তুলে ধরেছেন। জাপান ও মালয়েশিয়ার মতো দেশেও তিনি ছৌ নৃত্যের প্রদর্শনী করেছেন। তাঁর কার্তিক চরিত্র বিশেষভাবে জনপ্রিয় হলেও বিভিন্ন পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক চরিত্রে সমান দক্ষ তিনি।
ছৌ শিল্পী নৃপেন সহিস
পুরুলিয়ার ছৌ নাচ শুধু একটি লোকনৃত্য নয়; এটি এই অঞ্চলের মানুষের জীবন, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুখোশ, যুদ্ধকৌশল, শরীরীভাষা এবং পৌরাণিক কাহিনির অনন্য মিশেলে গড়ে ওঠা এই শিল্পরীতি আজ বিশ্বজোড়া পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে যাঁরা দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে চলেছেন, তাঁদের অধিকাংশের জীবন এখনও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ঘেরা।
সেই বাস্তবতার মধ্যেই নৃপেন ও সোমনাথের এই সাফল্য নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। তাঁদের প্রাপ্ত সম্মান প্রমাণ করে যে, মাটির কাছাকাছি থাকা লোকশিল্পও জাতীয় স্তরে সমান মর্যাদা পেতে পারে। একই সঙ্গে এই স্বীকৃতি আগামী প্রজন্মকে ছৌ নাচের প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলবে বলেই মনে করছেন সংস্কৃতি মহল।
পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা এই দুই শিল্পীর কাহিনি আসলে বাংলার লোকসংস্কৃতির জয়ের গল্প। অভাব, অনিশ্চয়তা ও সংগ্রামকে সঙ্গী করেও যে শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা একদিন জাতীয় স্বীকৃতি এনে দিতে পারে, নৃপেন সহিস ও সোমনাথ মাহাতো তারই জীবন্ত উদাহরণ।