অসমে হিজাব একটি নতুন ধারা: এটি ফ্যাশনের পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়েরও অংশ

Story by  Munni Begum | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 11 h ago
ছবিতে রয়েছেন মনিজান বেগম, জেরিফা ইসলাম, অপর্ণা দাস ও অসফিয়ারা বেগমরা
ছবিতে রয়েছেন মনিজান বেগম, জেরিফা ইসলাম, অপর্ণা দাস ও অসফিয়ারা বেগমরা
 
মুন্নী বেগম / গুয়াহাটি 

একসময় শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয় ও শালীনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হিজাব অসমের মুসলিম নারীদের মধ্যে এক নতুন পরিচিতি লাভ করেছে। বিশ্বাস ও পর্দার পাশাপাশি, ফ্যাশন, আত্মবিশ্বাস এবং ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও হিজাব ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া পর্যন্ত, বিভিন্ন রঙ, নকশা এবং শৈলী এখন একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।   

অসমের বিভিন্ন অংশে তরুণীদের মধ্যে হিজাব পরার প্রবণতা বাড়ছে এবং বাজারে এর চাহিদাও বাড়ছে। সুতি, শিফন, জর্জেট, সিল্ক ইত্যাদি বিভিন্ন কাপড়ের তৈরি হিজাব এখন সহজেই পাওয়া যায়। বিশেষ করে ঈদ, বিয়ে এবং অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে হিজাবের বিক্রি বাড়ে। 

আজকাল অনেক মহিলাই নানা কারণে হিজাব পরেন। কিন্তু আমার মতে, হিজাব কোনো বাধ্যবাধকতার বিষয় নয়; এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দ এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতির ব্যাপার। হিজাব পরলে আমি মনের শান্তি পাই এবং আল্লাহর আরও কাছাকাছি অনুভব করি। আরামদায়ক হওয়ার পাশাপাশি এটি চুল ও ত্বককে ধুলো, রোদ এবং বাহ্যিক প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। আজকাল অনেকেই ফ্যাশনের অংশ হিসেবে হিজাব পরছেন। 

জেরিফা ইসলামের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় যে, বহু নারীর কাছে হিজাব শুধু একটি ধর্মীয় অনুশাসন নয়, বরং এটি একটি ব্যক্তিগত পছন্দ, একটি আধ্যাত্মিক অনুভূতি এবং জীবনযাত্রার একটি অংশ।  

সারা বিশ্বে 'শালীন ফ্যাশন' নামে একটি নতুন ধারার উদ্ভব ঘটেছে, যা শালীনতা ও ফ্যাশনকে একসূত্রে গেঁথেছে। আসামের মুসলিম নারী ও তরুণীরাও এই ধারা অনুসরণ করছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বাজারে নানা ধরনের হিজাব ও শালীন পোশাক সামগ্রী এনে এই চাহিদা পূরণ করছেন। 
 

হিজাব ফ্যাশনের পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়েরও একটি অংশ হয়ে উঠেছে

হিজাব হলো একটি ঐতিহ্যবাহী পোশাক যা মুসলিম নারীরা শতাব্দী ধরে পরিধান করে আসছেন। এটি অনেক নারীর কাছে শালীনতা, বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। অতীতে আসামের অনেক মুসলিম নারী শাল বা শাড়ি দিয়ে তাদের মাথা ঢেকে রাখতেন। নারীরা হিজাবকে শালীনতা ও আত্মসম্মানের প্রকাশ হিসেবে দেখেন। বাজারে বিভিন্ন রঙ, নকশা ও কাপড়ের হিজাব সহজলভ্য হওয়ায় অনেক নারী ও তরুণী তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে এটি ব্যবহার করছেন।  

হিজাব পরার ব্যাপারে আমাদের একমাত্র ধারণা ছিল ধর্মীয় পরিচয় ও আনুগত্য। অনেক মুসলিম নারীর কাছে হিজাব হলো আল্লাহর আনুগত্য করা এবং নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করার একটি উপায়। কিন্তু হিজাবের অনেক স্বাস্থ্যগত উপকারিতাও রয়েছে। এটি সূর্যের রশ্মি, ধুলোবালি ও দূষণ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়, রোদ, বাতাস ও দূষণের সংস্পর্শ কমায় এবং চুল শুষ্ক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি হ্রাস করে। তবে, হিজাব খুব আঁটসাঁট করে বাঁধলে বা অপরিষ্কার পোশাক ব্যবহার করলে মাথার ত্বকে ঘাম জমে চুলকানি বা ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। চুলের গোড়ায় অতিরিক্ত টান পড়ার কারণে চুলও ঝরে যেতে পারে। 

হিজাব  ফ্যাশনের পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়েরও একটি অংশ হয়ে উঠেছে

হিজাব অনেক নারীকে আত্মবিশ্বাসী ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে সাহায্য করে। বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এটি ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান এবং কর্মক্ষেত্রের মূল্যায়নেও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। তাই সময়ের সাথে সাথে আমাদের মধ্যে হিজাব সম্পর্কে জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।     

এই পরিবর্তনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক এবং ইউটিউবে বিভিন্ন ধরনের হিজাব এবং শালীন ফ্যাশন কন্টেন্টের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার ফলে আসামের যুবসমাজও এর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। অনেক তরুণী তাদের পোশাকের সাথে সামঞ্জস্য রেখে হিজাব পরিধান করেছেন, যা আধুনিকতা ও শালীনতার এক সুন্দর সমন্বয় তৈরি করেছে।

আরেক তরুণী অপর্ণা দাস বলেন, “ইসলাম হোক বা হিন্দুধর্ম, প্রায় সব ধর্মেই শালীনতা ও মর্যাদা বজায় রাখতে ঘোমটা দিয়ে নিজেদের আবৃত করার নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে। নারীরা তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় অনুযায়ী ঘোমটা ব্যবহার করে এসেছেন। এ ব্যাপারে কোনো বাধ্যবাধকতা থাকার প্রয়োজন নেই। এটি ব্যক্তিগত পছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়।”  

হিজাব ফ্যাশনের পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়েরও একটি অংশ হয়ে উঠেছে

আমি নিজেও প্রায়শই স্কুল, কলেজ, অফিস বা বাজারে যাওয়ার সময় আমার মাথা ও মুখ ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখি। এর অন্যতম কারণ হলো ক্রমবর্ধমান দূষণ। ধুলো, বালি, ধোঁয়া এবং সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি আমার চুল ও ত্বকের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। আজকাল দেখা যায় যে, অনেক তরুণী শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কারণেই নয়, বরং ত্বক ও চুলের যত্ন, আত্মবিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যও হিজাব বা হিজাবের মতো ওড়না পরিধান করে। 

আরেক তরুণী আসফিয়ারা বেগম বলেন, "হিজাব মূলত একটি ধর্মীয় পোশাক যা যুগ যুগ ধরে মুসলিম নারীদের পরিচয় ও শালীনতার প্রতীক হয়ে আসছে। এটি নারীদের পর্দা রক্ষা করতে সাহায্য করে। এক অর্থে, হিজাব তার ধর্মীয় তাৎপর্য অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক ফ্যাশনের ধারার সাথেও তাল মিলিয়ে চলেছে। আধুনিক ফ্যাশনের জগতে এটি একটি নতুন স্থান করে নিয়েছে।" 

সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতায় হিজাব এখন আর শুধু একটি ধর্মীয় পোশাক নয়, বরং বহু নারীর কাছে তা আত্মপরিচয়, আত্মবিশ্বাস, শালীনতা ও আধুনিকতার এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশ্বাস ও ফ্যাশনের এই সুন্দর সংমিশ্রণ অসমের মুসলিম সমাজে হিজাবকে একটি নতুন মাত্রা দিয়েছে।


শেহতীয়া খবৰ