রেস্তোরাঁ নয়, ইতিহাসের রাজকীয় স্বাদ: মালিহা বেগের ক্লাউড কিচেনের গল্প

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 13 h ago
মালিহা  বেগ
মালিহা বেগ
 
রত্না জি চোত্রাণী 

হায়দ্রাবাদের ব্যস্ত খাদ্য-সংস্কৃতির ভিড়ে, যেখানে নতুন নতুন রেস্তোরাঁ প্রতিদিন নিজেদের পরিচিতি গড়ে তুলতে ব্যস্ত, সেখানে এক নিভৃত গলির রান্নাঘর নিঃশব্দে ফিরিয়ে আনছে নিজামি ঐতিহ্যের হারিয়ে যাওয়া স্বাদ। জাফরানের সুবাস, কয়লার ধোঁয়া আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সযত্নে রক্ষিত রেসিপি, এসব নিয়েই গড়ে উঠেছে মালিহা বেগের অনন্য রন্ধনজগৎ
 
রন্ধনশিল্পের কোনো আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই, পেশাদার শেফ হিসেবেও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নেই। তবু মালিহা বেগের  কাছে এমন এক সম্পদ রয়েছে, যা আজ হায়দ্রাবাদের বহু নামী হোটেল ও রেস্তোরাঁর কাছে অমূল্য, বংশপরম্পরায় পাওয়া গোপন রেসিপি এবং ঐতিহ্যবাহী রান্নার কৌশল। মুঘলাই রন্ধনশৈলীর রাজধানী বলে পরিচিত ভারতের এই শহরে তিনি নিজের ক্লাউড কিচেন থেকে এমন সব পদ পরিবেশন করছেন, যা প্রকৃত হায়দ্রাবাদি স্বাদকে জীবন্ত করে তোলে। আর সেই কারণেই বহু প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ শেফের মধ্যেও তিনি আলাদা পরিচিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
 
মালিহা বেগ
 
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের রন্ধনজগতে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। সাধারণ গৃহস্থের রান্নাঘর এখন উদ্যোক্তা-চেতনা, সৃজনশীলতা এবং আত্মিক স্বাচ্ছন্দ্যের এক নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে। বিশেষ করে “হোম শেফ”-দের উত্থান এক নতুন মোড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যারা শহুরে ভারতের খাওয়া-দাওয়া, উদ্‌যাপন এবং সামাজিকতার ধরন বদলে দিচ্ছেন।
 
হায়দ্রাবাদের অভিজাত বানজারা হিলসে বাস করেন মালিহা বেগম। টলিউডের বহু তারকার পছন্দের এই এলাকায় ১০ হাজার বর্গফুটেরও বেশি আয়তনের বহু রেস্তোরাঁ, বার ও ক্লাব গড়ে উঠেছে। তবুও অসংখ্য মানুষের গাড়ি সেই ঝলমলে বহুতল স্থাপনা ও রাজকীয় বাংলোগুলোকে পিছনে ফেলে পৌঁছে যায় এক শান্ত গলিতে, মালিহা বেগমের ঠিকানায়। আঞ্চলিক রন্ধনপ্রণালী, টাটকা উপকরণ, কৃত্রিম সংযোজনমুক্ত খাবার এবং ঐতিহ্যভিত্তিক রান্নার কৌশলকে আঁকড়ে ধরে তিনি এমন খাবার পরিবেশন করেন, যা একই সঙ্গে আরামদায়ক এবং গভীরভাবে ব্যক্তিগত।
 
মালিহা বেগ
 
তিনি যে মেনু তৈরি করেছেন, তা যেন হায়দ্রাবাদেরই এক রন্ধন-সংকলন, রাস্তার জনপ্রিয় খাবার, ঘরোয়া পদ এবং শহরের কিংবদন্তি রেস্তোরাঁগুলোর বিখ্যাত স্বাদের এক অনন্য মিশ্রণ। মালিহার মতে, ভারতের বড় বড় মহানগরে বহু হোম শেফ এখন আঞ্চলিক খাবারের পপ-আপ আয়োজন করছেন। তবে তিনি মূলত বিভিন্ন পার্টির জন্য মধ্যাহ্নভোজ, নৈশভোজ এবং জলখাবারের ক্যাটারিং করেন, যার মাধ্যমে ঘরোয়া রান্নাকে বাণিজ্যিক খাদ্যপরিসরে নিয়ে এসেছেন।
 
সমৃদ্ধ প্রস্তুতি এবং সূক্ষ্ম স্বাদের জন্য খ্যাত হায়দ্রাবাদি খাবার মূলত মুঘলাই, তুর্কি, আরবি এবং তেলুগু রন্ধন ঐতিহ্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ। মালিহার কথায়, এর ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন নিজামেরা। তাঁরা শুধু তুরস্ক, আফ্রিকা এবং আরব থেকে মানুষই নিয়ে আসেননি, সঙ্গে এনেছিলেন পারস্যের স্মৃতি ও সংস্কৃতিও, কারণ তাঁদের বংশপরিচয় ছিল পারস্যের সঙ্গে যুক্ত।
 
মালিহা বেগের তৈরি খাবারের একটি ছবি
 
৩৫ বছরের সফল শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক-পরামর্শদাতা জীবনের পর মালিহা বেগম এক ভিন্ন শিল্পের প্রতি নিজের ভালোবাসাকে অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ২০২০ সালের সর্বভারতীয় লকডাউনই তাঁকে নিজের বাড়ির রান্নাঘরের দিকে পুরোপুরি নিয়ে আসে। ব্যক্তিগত ডিনারের আয়োজন করতে করতেই হায়দ্রাবাদে তাঁর অনুরাগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। জামাতার উৎসাহে তাঁর ক্লাউড কিচেন বাস্তবে রূপ পায়। মালিহা বলেন, “আমাদের হাতে বড় কোনো সম্পদ ছিল না, আবার বাইরের অর্থায়নও চাইনি। আমরা দল হিসেবে আমাদের ব্র্যান্ডের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রেখেছিলাম, পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ থেকে শুরু করে এই প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা পর্যন্ত সবকিছু নিজেরাই করেছি।”
 
কাঠের আগুনে রান্না করা ‘দম’ পদ্ধতির কাঁচা গোশতের বিরিয়ানির জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। তাঁর স্বাক্ষর পদগুলোর মধ্যে রয়েছে ধীরে ধীরে রান্না করা হালিম, খাঁটি ঘি, এলাচ, গোলাপের পাপড়ি এবং সুগন্ধি ডালের সঙ্গে মিশ্রিত মাটন; তাশ কাবাব; এবং শিকমপুর, জাফরান, শুকনো ফল ও পেঁয়াজের মিশ্রণে ভরা মুখে গলে যাওয়া মাটনের কাবাব। মালিহা বেগের  মতে, বিরিয়ানিপ্রেমী ক্রেতারাও এখন তাঁর সুগন্ধি পোলাও, লুকমি, খাট্টি ডাল, ফিরনি এবং শুকনো ফলের লাড্ডুর প্রতি সমানভাবে আকৃষ্ট হচ্ছেন। আর এই তালিকা যেন শেষ হওয়ার নয়।
 
মালিহা বেগের তৈরি খাবারের একটি ছবি
 
মালিহা অনেক কিছুরই প্রতীক, স্নেহ, টান, নস্টালজিয়া, ইতিহাস, সহযোগিতা এবং বন্ধুত্ব। তিনি যেন এক চলমান সাংস্কৃতিক ভাণ্ডার। কখনও হাতের সামান্য কারসাজি, কখনও বা গোলমরিচের একটি বাড়তি ছোঁয়া, আর তাতেই বদলে যায় একটি সম্পূর্ণ পদ। যেমন একটি বংশবৃক্ষ জানিয়ে দেয় আপনার পূর্বপুরুষদের কথা, তেমনি তাঁর রান্না বলে রাজকীয় ঐতিহ্যের গল্প। এই ক্লাউড কিচেনের কোনো সাইনবোর্ড নেই, নেই বসার টেবিলও। আছে শুধু জাফরান আর কয়লার ধোঁয়ার সেই মাদকতাময় সুবাস, যা বানজারার গলিপথ জুড়ে ভেসে বেড়ায়।
 
মালিহার লাল কালির কলম অনেক আগেই হারিয়ে গেছে; তার জায়গা নিয়েছে কাবাবের শিক। উপস্থিতির খাতা বদলে গেছে অনলাইন অর্ডারে। হায়দ্রাবাদে রেস্তোরাঁর অভাব নেই। কিন্তু এমন জায়গা একটাই, যেখানে প্রতিটি কাবাবের সঙ্গে মেলে একটি শিক্ষা, নিজের স্বপ্নকে আগে গুরুত্ব দিতে কখনওই দেরি হয়ে যায় না।