দয়ারাম বসিষ্ঠ / ফরিদাবাদ (হরিয়ানা)
হরিয়ানার ফরিদাবাদ, যাকে প্রায়ই “হরিয়ানার ম্যানচেস্টার” বলা হয়, তার শিল্পোন্নতি ও দিল্লির কাছাকাছি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশের সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান শহরগুলির একটি হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু এই শিল্পনগরীর আড়ালে এক অন্ধকার বাস্তবতা বারবার প্রকাশ পেয়েছে — এই শহর বহুদিন ধরেই সন্ত্রাসবাদী ও অপরাধীদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি ডক্টর মুজাম্মিল শাকিলের ঘটনাটি আবারও সেই বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে।
জম্মু-কাশ্মীর ও ফরিদাবাদ পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে ধৌজ এলাকায় অবস্থিত আল-ফালাহ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত ডাক্তার মুজাম্মিলকে গ্রেপ্তার করে এবং তার আস্তানা থেকে প্রায় ২৯০০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক সামগ্রী উদ্ধার করে। পুলিশের তথ্যানুসারে, উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকের মধ্যে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, রাইফেল, গোলাবারুদ, তার, সার্কিট, টাইমার এবং রিমোট কন্ট্রোলের মতো যন্ত্রপাতি রয়েছে — যা একটি বড়সড় সন্ত্রাসী হামলার ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়।

ডাক্তার থেকে জঙ্গি পর্যন্ত পথচলা
ড. মুজাম্মিল শাকিল আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।তার গ্রেপ্তার শুধু গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাজের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে — কীভাবে একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি, তাও আবার চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত, জইশ-ই-মোহাম্মদ এবং গজওয়া-তুল-হিন্দের মতো জঙ্গি সংগঠনের সংস্পর্শে আসতে পারে?
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অক্টোবর মাসে জম্মু ও কাশ্মীরের নওগাঁও এলাকায় এক নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কিছু পোস্টার লাগানোর ঘটনা সামনে আসে। তদন্ত চলাকালীন ড. মুজাম্মিলের নাম প্রকাশ্যে আসে। এরপর জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ ফরিদাবাদ পুলিশের সহযোগিতায় তাকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় সে স্বীকার করে যে, ফরিদাবাদের ফতেহপুর তাগা গ্রামে সে বিস্ফোরক ও অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে।
রবিবার দুই রাজ্যের পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে গ্রামের এক বাড়ি থেকে ২৫৬৩ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক পদার্থ, একে-৫৬ রাইফেল, ক্রিনকভ অ্যাসল্ট রাইফেল, দুটি অটোমেটিক পিস্তল, ৮৪ রাউন্ড গুলি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করে। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
ফরিদাবাদ — সন্ত্রাসীদের নতুন আস্তানা
পুলিশ তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে যে ফরিদাবাদ দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসবাদী ও অপরাধী চক্রগুলোর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করছে। শিল্পাঞ্চলের ভিড়, দিল্লির নিকটবর্তী অবস্থান এবং সহজে ভাড়া বাড়ি বা ঘর পাওয়া — এই সব কারণেই জঙ্গিরা এখানে গোপনে থেকে যেতে পারে।
এটি প্রথমবার নয় যে ফরিদাবাদ থেকে জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মার্চ ২০২৫-এ পালি গ্রাম থেকে আব্দুল রহমান নামে এক জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়, যে টিউবওয়েলের কুঠুরিতে লুকিয়ে থাকছিল। মে ২০০৬-এ পাকিস্তানি জঙ্গি আবু হামজা বল্লভগড় থেকে ধরা পড়ে। তার কাছ থেকে তিন কিলোগ্রাম আরডিএক্স এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল।
২০০৫ সালে নয়ডা পুলিশ জঙ্গি হানিফকে গ্রেপ্তার করে, যে স্বীকার করেছিল যে সে দুই বছর ধরে ফরিদাবাদে থেকে তার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছিল। ২০০১ সালে দিল্লি পুলিশ এসজিএম নগর এলাকা থেকে এক জঙ্গিকে আটক করে, যে ট্যাক্সিচালক সেজে সংসদ হামলার সঙ্গে যুক্ত কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।
এই ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে ফরিদাবাদের শিল্পাঞ্চলের ভিড় এবং গোপন গলিগুলো এখন জঙ্গিদের জন্য এক কৌশলগত আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।
জম্মু-কাশ্মীর সংযোগ ও চিকিৎসকদের ভূমিকা
ড. মুজাম্মিলের গ্রেপ্তার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কে শিক্ষিত তরুণদের সম্পৃক্ততার এক নতুন বিপদকে সামনে এনেছে। তদন্তে জানা গেছে, সাহারানপুরে গ্রেপ্তার হওয়া সন্দেহভাজন জঙ্গি ডাক্তার আদিল আহমেদ রাথারের তথ্যের ভিত্তিতেই মুজাম্মিলের আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মুজাম্মিল ফরিদাবাদের ফতেহপুর তাগা এলাকার মুসলিম-প্রধান মহল্লায় “জিনিসপত্র রাখার” অজুহাতে ভাড়া করে একটি ঘর নিয়েছিল, যেখানে সে বিস্ফোরক মজুত করেছিল। একই সঙ্গে তদন্তে আরও এক মহিলা চিকিৎসকের নাম উঠে এসেছে, যার গাড়ি থেকে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ খতিয়ে দেখছে।
৮০০ পুলিশ সদস্যের মোতায়েন ও তল্লাশি অভিযান
ফরিদাবাদের পুলিশ কমিশনার সতেন্দ্র গুপ্ত জানিয়েছেন, ড. মুজাম্মিলকে ১২ দিন আগে গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের সহযোগিতায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তার দেখানো জায়গা অনুসারে ফতেহপুর তাগা গ্রামে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে ছিল ৩৬০ কিলোগ্রাম অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, একটি ক্যানটপ অ্যাসল্ট রাইফেল, পাঁচটি ম্যাগাজিন, ৯১টি জীবন্ত কার্তুজ এবং বেশ কয়েকটি স্যুটকেস। এই গোটা অভিযানে প্রায় ৮০০ পুলিশ সদস্যের দল টানা এলাকাজুড়ে তল্লাশি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
ফরিদাবাদ: অপরাধ ও সন্ত্রাসের জালে আটকে থাকা শিল্পনগরী
ফরিদাবাদে শুধু সন্ত্রাসবাদী নয়, অনেক সংগঠিত অপরাধী চক্রও সক্রিয়। সম্প্রতি পুলিশ কুখ্যাত নীরজ ফরিদপুরিয়া চক্রের সদস্য কুলদীপ ত্যাগীকে গ্রেপ্তার করেছে, যে চক্রকে তহবিল, আশ্রয় এবং অবৈধ অস্ত্র সরবরাহ করত।
শিল্পাঞ্চলের সম্প্রসারণ, বিনা বাধায় চলাচল এবং দিল্লির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এই শহর আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার মতে, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এই শহরকে “অপারেশনাল ব্যাকবেস” হিসেবে ব্যবহার করছে — যার মাধ্যমে দিল্লি, জয়পুর ও লখনউর মতো শহরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।
ফরিদাবাদের নিরাপত্তার ওপর বড় প্রশ্ন
ড. মুজাম্মিল শাকিলের গ্রেপ্তার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক এখন আর কোনো এক অঞ্চল বা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষিত, পেশাদার ব্যক্তিরাও এই জালে জড়াচ্ছে। এই ঘটনা শুধুমাত্র হরিয়ানার নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যই একটি সতর্কবার্তা নয়, বরং এটি একটি প্রশ্নও তোলে — আমাদের শিল্পনগরীর মধ্যে কি কোনো নীরব সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে?
এখন পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টির গভীর তদন্তে জড়িত। তবে এই পুরো ঘটনাচক্রের একটি বার্তা স্পষ্ট ফরিদাবাদ এখন কেবল শিল্পনগরী নয়, বরং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরে একটি সংবেদনশীল শহর, যেখানে উন্নয়নের আড়ালে লুকানো ছায়াকে চিহ্নিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।