CAA-তে প্রথম নাগরিকত্ব জয়: ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে মুক্তি পেলেন দিপালী দাস

Story by  Satananda Bhattacharjee | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
CAA-তে প্রথম নাগরিকত্ব জয়: ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে মুক্তি পেলেন দিপালী দাস
CAA-তে প্রথম নাগরিকত্ব জয়: ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে মুক্তি পেলেন দিপালী দাস
 
শতানন্দ ভট্টাচার্য

ডি ভোটার অভিযোগে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক থাকা দিপালী দাস শিলচর ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে ১৭ ই মে, ২০২১ সালে মুক্তি পেয়েছিলেন  দিপালী দাস কিন্তু পরবর্তীতে অনেক আইনি প্রক্রিয়া শেষে সিএএ (CAA)- র অধীনে পেলেন ভারতীয় নাগরিকত্ব। অসমে ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকা ব্যক্তিদের জামিনে মুক্তি হওয়ার পর এই প্রথম একজনকে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হলো সিএএ (CAA)-র মাধ্যমে। এক ঐতিহাসিক জয় হলো দিপালী দাসের।
 
২০১৯ সালের মে মাসের সাত তারিখ জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের শর্তানুযায়ী প্রতি সপ্তাহে একবার করে কাছাড় জেলার ধলাই থানায় হাজিরা দিতে হত দিপালীকে। শিলচর ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকাকালীন মনের দুঃখে  মুখেমুখে গান বাঁধতে শিখে গেছিলেন দিপালী। সেগুলি যখন গাইতেন সব মেয়েরা খুব আনন্দ পেত, চুপ করে শুনত ও সাথে গলা মেলাতো। মনের সমস্ত জ্বালা যন্ত্রণা অপমান অভিমান অসহায়তা গানের মাধ্যমে প্রকাশ করতেন দিপালী দাস।

“আজি স্বাধীনতার দিনে ,
সবাই আছে স্বাধীন হয়ে আমি পরাধীনে 
আরে ও পনেরো আগস্ট  স্বাধীনতার দিন
এই দিনেতে কেন আমি রইলাম পরাধীন
আমার পরিবার পুত্র কন্যা ঘরেতে রাখিয়া
বিনা দোষে আমায় রাখে বন্দি করিয়া
হিন্দু হয়ে হিন্দুস্থানে থাকার জায়গা নাই
ভারতের আইন কানুনের এই কি বালাই
মনে আমার বড়ো কষ্ট, ওগো মোদি ভাই
বন্দিদশা হতে আমি মুক্ত হতে চাই"
 
- দিপালী দাস এভাবেই গান গেয়ে গেয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতেন।
 
দিপালী দাসের কথা “অসমে নাগরিকত্ব হরণের দহনলিপি” বইয়ের ২৫ নং কেস স্টাডিতে উল্লেখ আছে। এছাড়া যারা ইংরেজি সংস্করণ “FROM CITIZEN TO DOUBTFUL CITIZEN: The Unending Saga of Deprivation and Dispossession in Assam” – সেখানেও উল্লেখ আছে।
 
সেই দিপালী দাস নাগরিকত্ব আইনের বিধি চালু হওয়ার পর তার সুবিধে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। শিলচর ছয় নম্বর ফরেনার্স ট্রাইবুনাল থেকে  দিপালী দাসের কেসের জাজমেন্ট অর্ডার সহ পুলিশ রিপোর্টের সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করা হলো। নিয়ম হচ্ছে অসমে সন্দেহ ভাজন নাগরিকদের জন্য পুলিশ প্রথমেই খোঁজ খবর নিয়ে রাজ্যের এসপি বর্ডার অফিসে সেই ব্যক্তির নামে রিপোর্ট জমা দেয়। এসপি বর্ডার অফিস থেকে কেস রেফারেন্স পাঠিয়ে দেওয়া হয় ফরেনার্স ট্রাইবুনালে। ফরেনার্স ট্রাইবুনালের মেম্বার (বিচারক) সেই কেস রেফারেন্সের ওপর ভিত্তি করে সন্দেহ ভাজন ব্যক্তিদের নামে  নোটিশ পাঠিয়ে দেয় তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য। সেই সময় নথিপত্রের অভাবে তাঁকে বিদেশি ঘোষণা করে শিলচর ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়েছিল।
 
পুলিশের কেস রেফারেন্সের  এক জায়গায় লেখা ছিল দিপালী দাস বাংলাদেশের সিলেট জেলার দীপপুর গ্রাম, পোস্ট অফিস ধিরাই এলাকায় থাকতেন এবং ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ থেকে ভিটেমাটি ফেলে অসমে চলে আসেন স্বামী অভিমন্যু দাসের সঙ্গে। বিয়ে হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। অর্থাৎ দিপালী দাসের ক্ষেত্রে সরকারি কাগজে (এসপি বর্ডারের কেস রেফারেন্স) বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা ছিল এবং অসমে কবে এসেছিলেন সেটাও উল্লেখ ছিল।
 
দিপালী অসমে এসে কাছাড় জেলার  ধলাই অঞ্চলের হাওয়াইথাংয়ে বসবাস করতেন। ১৯৯৭ সালের ভোটার তালিকায় দিপালী দাসের নাম ছিল সেই অঞ্চলের। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে আসা এবং পরবর্তীতে ভারতে ভোট দেওয়া দুটোই রইল। সিএএ (CAA)-র  নিয়মানুযায়ী ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ভারতে আসার পর আরও দুটি কাগজের দরকার হয়, যা খুব সহজেই সংগ্রহ করা যায়। যেমন, কোন রেজিষ্টার্ড  হিন্দু মন্দির থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি সার্টিফিকেট এবং দিপালী দাসের বাসস্থান হাওয়াইথাং জায়গার কোনো ব্যক্তি যার আসামের চূড়ান্ত  এনআরসিতে  নাম আছে তার কাছ থেকে একটি ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট।
 
গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ তারিখ শিলচরের আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব– এর বাড়িতে গিয়েই অন্ লাইনে  আবেদন করা হয়। সঙ্গে ছিলেন দিপালী দাস ও তার ছেলে আদিত্য। দিপালী দাস একটু নার্ভাস হয়ে বলেছিল, “ আমার কোনো বিপদ হবে না তো? সমাজকর্মী কমল চক্রবর্তী উত্তর দিয়েছিলেন, “দুই বছর ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকার পর নতুনভাবে আর কী বিপদ হতে পারে!” 
 
স্বামী অভিমন্যু বেশ কয়েক বছর ধরে  মানসিক রোগে আক্রান্ত! শিলচরে মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখানো, বিভিন্ন টেস্ট, ওষুধের খরচ  নিরন্ন অসহায়  মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। বেশ কয়েকমাস আগে থেকেই সেই ডাক্তার দেখানো বন্ধ! জানান কমল চক্রবর্তী।
 
দিপালী দাসের  প্রথম শুনানি হয়েছিল  ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, শিলচর  সুপারিন্টেন্ডেন্ট অব্ পোস্ট অফিসে।সেদিন শুনানির পর আরো দু'বার শুনানি হয়েছিল। শুনানির শেষে দিপালী দাসের সমস্ত নথিপত্র অন লাইনে পাঠিয়ে দেওয়া হয় Ministry of Home Affairs ( MHA) এর কাছে। গত বছর মে মাসের ১২ তারিখ MHA থেকে পাঠানো গোয়েন্দা দপ্তরের অফিসার সহ কয়েকজন দিপালী দাসের হাওয়াইথাঙ বাড়িতে গিয়েছিলেন ভেরিফিকেশনের জন্য। ভেরিফিকেশনের শেষ করার পর  গোয়েন্দা বিভাগ রিপোর্ট পাঠিয়ে দিলেন সরকারের কাছে। 
 
এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর আবার দিপালী দাসকে শেষ বারের মত শিলচর সুপারিন্টেন্ডেন্ট অব্ পোস্ট অফিসে ডাকা হয় এবছরের ২৮  ফেব্রুয়ারি। সবশেষে ৬ মার্চ দিপালী দাস ভারতীয় নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট পান।
 
শিলচরের বিশিষ্ট আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব- এর পূর্ণ সহযোগিতায় এই পুরো কাজটি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে বলে জানান কমল চক্রবর্তী। 
 
আজ দিপালী দাস সহ তাঁর ছেলেমেয়েরা মাথার ওপর থেকে এক বিশাল বোঝা থেকে মুক্ত হলো। ছেলে আদিত্য সহ তাঁর মেয়েরা অর্পিতা, নিবেদিতা, জয়শ্রী সহ পরিবারের মোট ছয়জন ভবিষ্যতে তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মা'র পাওয়া নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট জমা দিলেই পেয়ে যাবে নাগরিকত্ব, কেননা ছেলেমেয়েদের জন্ম ভারতেই। পরিবারের কাছে এর চেয়ে আনন্দের খবর আর কী হতে পারে, জানান কমল চক্রবর্তী।
 
তবে দিপালী দাসকে দেখে অসমে সিএএ (CAA)-তে আবেদন করার ইচ্ছে থাকলে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাহায্য নেবেন বলেও পরামর্শ দেন আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব।