আওয়াজ দ্য ভয়েস
সৌদি আরবের কারাগারে দীর্ঘ ২০ বছর কাটানোর পর অবশেষে পবিত্র ঈদ-উল-আজহার দিন নিজের মাটিতে ফিরলেন কেরালার আব্দুল রহিম। প্রায় দু’দশক ধরে তিনি ছিলেন শুধুই পরিবারের স্মৃতি, অপেক্ষা আর প্রার্থনার অংশ। তাঁর এই ঘরে ফেরা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, গোটা কেরালার মানুষের কাছেই এক আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে উঠেছে। মৃত্যুদণ্ডের মুখ থেকে ফিরে ঈদের দিন বাড়ি পৌঁছাতে পারা আব্দুল রহিমের মুক্তির জন্য ‘ব্লাড মানি’ হিসেবে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।
তাঁর বাড়ি ফেরা শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির ফিরে আসা ছিল না। কেরালার বহু মানুষের কাছে এটি ছিল সামষ্টিক মানবতার জয়, বিশেষ করে মালয়ালি সমাজের ঐক্যের এক অনন্য নিদর্শন।
সৌদি আরবের কারাগারে নিজের মালিকের বিশেষভাবে সক্ষম পুত্রের মৃত্যুর মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে প্রায় ২০ বছর কাটানোর পর আব্দুল রহিম নিজ গ্রামে ফিরে আসেন এবং শত শত গ্রামবাসী, আত্মীয় ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে আবেগঘন অভ্যর্থনা পান। বিশ্বজুড়ে থাকা মালয়ালিরা ধর্ম বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে তাঁর মুক্তি নিশ্চিত করতে ‘ব্লাড মানি’ বা ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩৪ কোটিরও বেশি টাকা সংগ্রহ করেছিলেন। তারপরেই সম্ভব হয় তাঁর মুক্তি।
কেরালার কোডাম্পোঝার বাসিন্দারা ভোররাত থেকেই অপেক্ষা করছিলেন। সকাল প্রায় ৯টা ১৫ মিনিট নাগাদ আব্দুল রহিমকে নিয়ে আসা এসইউভি গাড়িটি গ্রামে প্রবেশ করার সময় তাঁর পূর্বপুরুষদের বাড়ি ‘জিনাত মঞ্জিল’-এর দিকে যাওয়া সরু পথটি মানুষে উপচে পড়ে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দেওয়ালের উপর দাঁড়িয়ে ছিল, বৃদ্ধরা গেটের পাশে লাঠিতে ভর দিয়ে অপেক্ষা করছিলেন এবং অনেক মহিলা বারান্দা থেকে চোখের জল মুছতে মুছতে তাকিয়ে ছিলেন।
গাড়িটি ধীরে ধীরে ভিড়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় মানুষজন সামনে এগিয়ে এসে কখনও প্রার্থনা করছিলেন, কখনও বা শুধু সেই মানুষটিকে একবার দেখতে চাইছিলেন যার কাহিনি গোটা রাজ্যকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আব্দুল রহিম গাড়ির জানালা নামিয়ে দুর্বলভাবে হাত নাড়লেন। তাঁর মুখে ক্লান্তি, অবিশ্বাস আর কৃতজ্ঞতা একসঙ্গে ফুটে উঠেছিল।
গাড়ি থেকে নামার পর কিছু সময়ের জন্য তাঁকে ঘিরে থাকা অসংখ্য মুখ দেখে আব্দুল আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। উপস্থিত অধিকাংশ মানুষ তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে কখনও দেখেননি, তবুও তাঁদের কথায় যেন তিনি পরিবারেরই একজন সদস্য।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর বৃদ্ধা মা ফাতিমা। ছেলের কারাবাসের দীর্ঘ বছরগুলোর ছাপ তাঁর মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর চোখ ছিল শুধু ছেলের দিকেই। আব্দুল রহিম মায়ের দিকে তাকাতেই ফাতিমা ভেঙে পড়েন। একটি তোয়ালে দিয়ে মুখ ঢেকে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং আত্মীয়রা তাঁকে সামলানোর চেষ্টা করেন। আব্দুল রহিমও ভিড় ঠেলে মায়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
ঘরের ভিতরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল সেই প্রথম খাবার, যা তৈরি করেছিলেন সেই মা, যিনি এই মুহূর্তটির জন্য প্রায় দু’দশক ধরে প্রার্থনা করেছিলেন।
“আমার আনন্দ প্রকাশ করার মতো কোনও শব্দ নেই,” আব্দুল রহিম আবেগঘন কণ্ঠে বলেন। “হাজার হাজার দয়ালু মানুষের প্রার্থনা এবং নিঃস্বার্থ সাহায্যের কারণেই আমি আজ বেঁচে আছি। আমি চিরকাল তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।”
প্রায় ২০ বছর আগে উন্নত জীবিকার সন্ধানে আব্দুল রহিম সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। উপসাগরীয় দেশটিতে পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর জীবনে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
তিনি একটি সৌদি পরিবারের ড্রাইভার হিসেবে কাজ করতেন এবং যাত্রার সময় মালিকের বিশেষভাবে সক্ষম পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সময় গাড়ির ভিতরে একটি ঝাঁকুনির কারণে শিশুটির গলায় লাগানো চিকিৎসা-সংক্রান্ত খাদ্যনালী খুলে যায় বলে জানা যায়। সৌদি আদালতে আব্দুল রহিমের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর হাত দুর্ঘটনাবশত শিশুটির সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জামের গায়ে লেগে গিয়েছিল। পরে শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে মারা যায়।
যদিও ঘটনাটিকে অনিচ্ছাকৃত বলা হয়েছিল, তবুও ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর আব্দুল রহিমকে গ্রেফতার করা হয়। বহু বছরের আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০১২ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
কেরালায় এই ঘটনাটি ধীরে ধীরে একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থেকে জনমানসে আলোড়ন তোলা একটি বিষয়ে পরিণত হয়।
যখন খবর ছড়িয়ে পড়ে যে ভুক্তভোগীর পরিবার ১৫ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল অর্থাৎ প্রায় ৩৪ কোটি টাকার বিনিময়ে আব্দুল রহিমকে ক্ষমা করতে রাজি হয়েছে, তখন সাধারণ মালয়ালিরা অসাধারণভাবে একত্রিত হতে শুরু করেন। গোটা কেরালা এবং উপসাগরীয় দেশগুলিতে থাকা প্রবাসী সমাজের মধ্যে “সেভ আব্দুল রহিম” অভিযান গতি পায়।
এই অর্থ সংগ্রহ অভিযান খুব দ্রুতই রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ মানবিক অভিযানে পরিণত হয়। মসজিদ কমিটি, গির্জা, মন্দির, প্রবাসী শ্রমিক, ছাত্রছাত্রী, দোকানদার, অটোচালক এবং ‘কুদুম্বশ্রী’ কর্মীদের কাছ থেকেও অনুদান আসতে শুরু করে।
তহবিল সংগ্রহ কমিটির আহ্বায়ক কে কে আলি কুট্টি স্মরণ করেন কীভাবে মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করেছিলেন। তিনি বলেন, “কেউ ১০০ টাকা দিয়েছেন, কেউ ১,০০০ টাকা। বহু দরিদ্র মানুষও নিজেদের সামান্য সঞ্চয় থেকে সাহায্য করেছেন।”
এই অভিযানে বহু বিস্ময়কর মুহূর্ত দেখা গিয়েছিল। অর্থ সংগ্রহের এক পর্যায়ে মাত্র ৯ মিনিটের মধ্যে প্রায় ১ কোটি টাকা সংগ্রহ হয়। রমজানের পঞ্চম দিনেই সংগ্রহ ৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। তবে প্রকৃত জোয়ার আসে পবিত্র মাসটির শেষ দিনগুলিতে।
রমজানের ২৭তম রাত, যাকে মুসলমানরা ‘শবে কদর’ হিসেবে মানেন, সেই রাতে আবেগ আর প্রার্থনা এক বিশাল জনসমর্থনে রূপ নেয়। মাত্র একদিনেই প্রায় ৯ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। শেষ পর্যন্ত ১২ এপ্রিল লক্ষ্য পূরণ হওয়ার পরও কয়েক মিনিটের মধ্যে আরও ১ কোটি টাকা জমা পড়ে।
কেরালার বহু মানুষের কাছে এই অভিযান শুধু অর্থ সংগ্রহের বিষয় ছিল না। এটি ধর্ম, শ্রেণি এবং রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যের এক বিরল উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৪ সালের ২ জুলাই ‘ব্লাড মানি’ বা ক্ষতিপূরণের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর সৌদি আদালত আব্দুল রহিমের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে। যদিও সৌদি জনআইন অনুযায়ী ২০ বছরের কারাদণ্ডের মেয়াদ পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারেই থাকতে হয়েছিল।
সৌদি আরবে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস পরে তাঁর মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, কর্মকর্তারা সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলেন এবং পুরো আইনি প্রক্রিয়ায় আব্দুল রহিমের অবস্থার ওপর নজর রেখেছিলেন। দূতাবাস অর্থ সংগ্রহ অভিযানে ভারতীয় সমাজের অসাধারণ সমর্থনের কথাও স্বীকার করে।
বৃহস্পতিবার সকালে যখন আব্দুল রহিম অবশেষে কোডাম্পোঝার নিজের বাড়িতে বসে মায়ের হাতে পরিবেশিত খাবার খাচ্ছিলেন, তখন বাড়ির বাইরের দৃশ্য যেন উৎসবে পরিণত হয়েছিল। মানুষ দলে দলে এসে ফুল দিচ্ছিলেন, কেউ প্রার্থনা করছিলেন, আবার কেউ শুধু তাঁর সঙ্গে করমর্দন করতে চাইছিলেন।
বছরের পর বছর যাঁর নাম গ্রামের মানুষের প্রার্থনায় উচ্চারিত হয়েছে, সেই আব্দুল রহিম আর সৌদি আরবের দূরবর্তী কোনও বন্দি নন। অবশেষে তিনি নিজের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করলেন।