মায়ের স্মৃতিতে ৬.৫ লক্ষ গাছ, অনুর্বর পাহাড়ে সবুজ অরণ্য: অভিনেতা সয়াজি শিন্ডের অনন্য পরিবেশ বিপ্লব

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 3 h ago
মায়ের স্মৃতিতে ৬.৫ লক্ষ গাছ, অনুর্বর পাহাড়ে সবুজ অরণ্য: অভিনেতা সয়াজি শিন্ডের অনন্য পরিবেশ বিপ্লব
মায়ের স্মৃতিতে ৬.৫ লক্ষ গাছ, অনুর্বর পাহাড়ে সবুজ অরণ্য: অভিনেতা সয়াজি শিন্ডের অনন্য পরিবেশ বিপ্লব
 
আওয়াজ দ্য ভয়েস বাংলা

কেউ মায়ের স্মৃতিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন, কেউ প্রতিষ্ঠা করেন দাতব্য সংস্থা। কিন্তু জনপ্রিয় অভিনেতা সায়াজি শিন্ডে বেছে নিয়েছেন এক অভিনব পথ। মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসাকে তিনি রূপ দিয়েছেন এক সবুজ আন্দোলনে। গত এক দশকে তাঁর উদ্যোগে রোপণ করা হয়েছে ৬.৫ লক্ষেরও বেশি গাছ, যা শুধু পরিবেশ রক্ষাই করছে না, বদলে দিচ্ছে গ্রামের অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাত্রা।
 
হিন্দি, মারাঠি, তেলুগু, তামিল ও মালয়ালম-সহ একাধিক ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করা সায়াজি শিন্ডে ‘শূল’, ‘সরকার রাজ’, ‘সঞ্জু’-এর মতো ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে সারা দেশে পরিচিতি লাভ করেন। তবে আজ তিনি যতটা অভিনেতা হিসেবে পরিচিত, তার চেয়ে কম নন একজন পরিবেশযোদ্ধা হিসেবেও।
 
 
মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার এক কৃষক পরিবারে জন্ম তাঁর। শৈশব থেকেই তিনি গ্রামীণ জীবনের সংগ্রাম দেখেছেন। ১৯৭৮ সালে একটি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের জন্য তাঁর পরিবারের কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা হয়। ক্ষতিপূরণ হিসেবে জমি ফেরত পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হাতে আসে তিন দশকেরও বেশি সময় পরে। এই দীর্ঘ অপেক্ষা এবং কৃষকের জীবনসংগ্রাম তাঁর মানসিকতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
 
২০১৬ সালে মহারাষ্ট্র যখন খরা ও জলসংকটে জর্জরিত, তখন বিভিন্ন গ্রামে ত্রাণ ও সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নেন সয়াজি। এক গ্রামে তিনি দেখেন, প্রখর রোদের মধ্যে শত শত মানুষ সভা করছে, অথচ আশপাশে একটি ছায়াদানকারী গাছও নেই। সেই দৃশ্য তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। তাঁর উপলব্ধি হয়, গ্রামের উন্নয়নের প্রথম শর্তই হলো প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনা।
 
এই উপলব্ধির পর তিনি হায়দ্রাবাদ থেকে ট্রাকে করে হাজার হাজার চারা গাছ এনে বৃক্ষরোপণ শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি ভারতের প্রাচীন ‘দেবরাই’ বা পবিত্র বন সংরক্ষণের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারেন। সেই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় ‘সহ্যাদ্রি দেবরাই’ প্রকল্প, যার লক্ষ্য ছিল মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করা।
 
সায়াজি শিন্ডে একটি বৃহদাকার বৃক্ষের সম্মুখে
 
তবে এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তাঁর মা। ২০১৬ সালে তাঁর মা ৯২ বছর বয়সে পৌঁছেছিলেন। মাকে হারানোর আশঙ্কা তাঁকে ভীষণভাবে কষ্ট দিত। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, মায়ের স্মৃতিকে স্মৃতিস্তম্ভে নয়, জীবন্ত প্রকৃতির মধ্যে ধরে রাখবেন। তিনি মায়ের ওজনের সমপরিমাণ বীজ সংগ্রহ করে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে রোপণের পরিকল্পনা করেন।
 
সায়াজির বিশ্বাস ছিল, একদিন সেই বীজ গাছে পরিণত হবে, ফুল দেবে, ফল দেবে, ছায়া দেবে এবং হাজার মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করবে। তাঁর ভাষায়, “গাছের ফুলের সুবাসে, পাতার মর্মরে আমি আমার মায়ের উপস্থিতি অনুভব করি। এভাবেই তিনি আজও বেঁচে আছেন।”
 
বর্তমানে মহারাষ্ট্রের ৪৮টিরও বেশি স্থানে তাঁর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চলছে। বহু এলাকায় ছোট্ট চারা গাছ এখন ঘন অরণ্যে পরিণত হয়েছে। এসব বনভূমি শুধু কার্বন শোষণ বা পরিবেশ রক্ষার কাজই করছে না, বরং পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছি ও অসংখ্য প্রাণীর জন্য নতুন আবাসস্থল তৈরি করেছে।
 
সায়াজি শিন্ডে বৃক্ষ রোপণের মুহুর্তে
 
সায়াজির উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। তাঁর মতে, পরিকল্পিতভাবে ফলদ ও অর্থকরী গাছ লাগানো গেলে গ্রামের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আয়ের পথ তৈরি হয়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি গ্রামে যদি এক হাজার তেঁতুল গাছ লাগানো যায়, তবে ১৫ বছর পরে সেই গাছ থেকে প্রায় এক কোটি টাকার সমপরিমাণ আয় সম্ভব। অর্থাৎ বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশ রক্ষার কাজ নয়, এটি গ্রামীণ উন্নয়নেরও একটি কার্যকর মডেল।
 
তিনি ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রেও নতুন ভাবনার প্রস্তাব দিয়েছেন। মন্দিরে প্রসাদের পরিবর্তে চারা গাছ বিতরণের ধারণা তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষ যদি গাছকে আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করে, তবে তারা আরও বেশি যত্ন নিয়ে তা রক্ষা করবে।
 
এই ভাবনার বাস্তব প্রভাবও দেখা গেছে। মহারাষ্ট্রের একটি গ্রাম, যেখানে প্রায় ৬০ বছর ধরে কোনো উল্লেখযোগ্য গাছ ছিল না, সেখানে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে ১৬ হাজার গাছের সবুজ আবরণ। গ্রামের মানুষ নিজেরাই অর্থ সংগ্রহ করে প্রকল্পে অংশ নেন। ফলে যে পাহাড় একসময় অনুর্বর ও ধূসর ছিল, আজ তা সবুজে আচ্ছাদিত।
 
 
শুধু নতুন গাছ লাগানো নয়, পুরনো গাছ সংরক্ষণেও তিনি সমানভাবে সক্রিয়। উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছ কাটার বিরোধিতা করে তিনি নিজের অর্থে ২০০-রও বেশি বটগাছ স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর মতে, একটি পূর্ণবয়স্ক বটগাছের সঙ্গে শতাধিক প্রাণী ও পাখির জীবন জড়িয়ে থাকে। তাই গাছ কেটে ফেলার পরিবর্তে প্রযুক্তির সাহায্যে স্থানান্তর করাই হওয়া উচিত উন্নয়নের পথ।
 
আজ সায়াজি শিন্ডের আন্দোলন কেবল বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়, এটি একটি সামাজিক দর্শন। যেখানে প্রকৃতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধ একসূত্রে গাঁথা। অভিনয়ের জগতে তিনি বহু চরিত্রে প্রাণ সঞ্চার করেছেন, কিন্তু বাস্তব জীবনে তিনি যে চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন, তা হয়তো আরও বেশি অনুপ্রেরণাদায়ক, এক সন্তানের, যে মায়ের স্মৃতিকে লাখো গাছের ছায়ায় অমর করে রেখেছে এবং সেই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছে এক সবুজ উত্তরাধিকার।