কলকাতা
কলকাতার আকাশরেখা বদলে দিয়েছে একের পর এক বহুতল। কিন্তু সেই উন্নয়নের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে উদ্বেগজনক এক বাস্তবতা। কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় শহরজুড়ে প্রায় ৩ হাজার বেআইনি নির্মাণ চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত এক হাজার নির্মাণ এমন অবস্থায় রয়েছে, যেগুলির বেআইনি অংশ যে কোনও সময় ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে পুরসভা সূত্রে খবর।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ইএম বাইপাস সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়ে উঠেছে একাধিক অনুমোদনবিহীন নির্মাণ। পুরসভার নজরে এসেছে যে শহরের বেলেঘাটা, ট্যাংরা, তিলজলা, তপসিয়া, বড়বাজার, কসবা, গার্ডেনরিচ, মেটিয়াবুরুজ, কাশীপুর ও চিৎপুরের মতো এলাকাগুলিতে বেআইনি নির্মাণের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে কয়েকটি এলাকাকে ইতিমধ্যেই ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুর আধিকারিকদের দাবি, স্থানীয় প্রোমোটার এবং সিন্ডিকেট চক্রের মদতেই দীর্ঘদিন ধরে এই বেআইনি নির্মাণ ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। অভিযোগ, পুরসভার অনুমোদিত নকশায় যেখানে ‘জি প্লাস ফোর’ ভবনের অনুমতি নেওয়া হয়, বাস্তবে সেখানে অতিরিক্ত একটি বা একাধিক তলা নির্মাণ করা হয়। ফলে বাড়তি ফ্লোর বিক্রি করে যেমন অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন সম্ভব হয়, তেমনই নির্মাণসামগ্রী সরবরাহের ক্ষেত্রেও অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়। সেই লাভের অংশ বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যায় বলে অভিযোগ।
পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের একাংশের মতে, শহরের যে এলাকাগুলি বর্তমানে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, সেখানে বেআইনি নির্মাণের সংখ্যা এত বেশি যে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে গেলে বহু প্রভাবশালী নাম সামনে আসতে পারে। প্রশাসনিক মহলে এমনও আলোচনা চলছে যে, এই নির্মাণগুলির নেপথ্যে রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগও উঠে আসছে।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে বলে দাবি সরকারি সূত্রের। যদিও কলকাতা পুরসভা এখনও তৃণমূল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে, তবু রাজ্য প্রশাসনের নির্দেশ মেনে বিভিন্ন ওয়ার্ডে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গত এক মাসে তিলজলা, বেলেঘাটা এবং কসবায় একাধিক বেআইনি নির্মাণে বুলডোজার চালানো হয়েছে। প্রশাসনের এই অভিযানে ইতিমধ্যেই আলোড়ন পড়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
এখন প্রশ্ন একটাই, পুরসভার ‘রেড জোন’ তালিকায় থাকা হাজার হাজার বেআইনি নির্মাণের মধ্যে পরবর্তী টার্গেট কোনটি? শহরজুড়ে শুরু হওয়া এই অভিযান কতদূর গড়ায়, সেদিকেই নজর কলকাতাবাসীর।