ক্ষমতায়নের নতুন আকাশে ‘পারওয়াজ’: প্রশাসন, কূটনীতি ও জনসেবায় মুসলিম নারীর উড়ান

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
ক্ষমতায়নের নতুন আকাশে ‘পারওয়াজ’: প্রশাসন, কূটনীতি ও জনসেবায় মুসলিম নারীর উড়ান
ক্ষমতায়নের নতুন আকাশে ‘পারওয়াজ’: প্রশাসন, কূটনীতি ও জনসেবায় মুসলিম নারীর উড়ান
 
আওয়াজ দ্য ভয়েস

ভারতের প্রশাসন, কূটনীতি, শিক্ষা, প্রত্নতত্ত্ব, সমাজকল্যাণ ও জনসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন বহু মুসলিম নারী। প্রতিকূলতা, সামাজিক বাধা এবং নানা সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে তাঁরা নিজেদের মেধা, অধ্যবসায় ও নেতৃত্বগুণের মাধ্যমে সাফল্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তাঁদের অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয়, বরং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার এক অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ।
 
এই অসাধারণ নারীদের জীবনসংগ্রাম, সাফল্য এবং সমাজে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের গল্প নিয়েই আওয়াজ দ্য ভয়েস-এর বিশেষ ধারাবাহিক ‘পরওয়াজ’-এর এই পর্ব। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অর্জনের মাধ্যমে উঠে এসেছে এমন এক ভারতের ছবি, যেখানে নারীর ক্ষমতায়ন, জনসেবা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পরিবর্তনের পথকে।
 
আদিবা আনাম আশফাক আহমেদ শেখ

আদিবা আনাম আশফাক আহমেদ শেখ
 
মহারাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম মহিলা আইএএস কর্মকর্তা হিসেবে আদিবা আনাম আশফাক আহমেদ শেখের যাত্রা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দৃঢ় সংকল্পের এক অনন্য উদাহরণ। ইয়াভতমালের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া আদিবা একজন অটোরিকশাচালকের কন্যা। আর্থিক সংকট, একাধিক ব্যর্থতা এবং সামাজিক কুসংস্কার অতিক্রম করে তিনি ইউপিএসসি ২০২৪ পরীক্ষায় সর্বভারতীয় ১৪২তম স্থান অর্জন করেন। তাঁর এই সাফল্য গ্রামীণ ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের অসংখ্য মেয়ের কাছে আশা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক, যারা শিক্ষা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখে।
 

ড. আদিলা আবদুল্লা
 
ড. আদিলা আবদুল্লা

ড. আদিলা আবদুল্লা কেরলের প্রশাসনে মানবিক ও সংবেদনশীল নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। মালাবার অঞ্চলের প্রথমদিকের মুসলিম নারী আইএএস কর্মকর্তাদের একজন হিসেবে তিনি সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থা এবং নগর প্রশাসনকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কেরলের সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পে তাঁর কাজ হোক বা সমাজকল্যাণ দপ্তরের বিশেষ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন—সব ক্ষেত্রেই তাঁর নেতৃত্বে প্রতিফলিত হয়েছে সহমর্মিতা, জবাবদিহিতা এবং বিশেষত সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রতি গভীর অঙ্গীকার।
 

ড. সাবিনা হাসান
 
ড. সাবিনা হাসান
 
অসমে ড. সাবিনা হাসান ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রত্নতত্ত্বের ক্ষেত্রে এক শক্তিশালী নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। অসম প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হিসেবে তিনি চরাইদেউ মৈদামকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং ডিমা হাসাও জেলায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার করেছেন। মাতৃত্ব, গবেষণা এবং মাঠপর্যায়ের কাজকে সমানভাবে সামলে তিনি প্রত্নতত্ত্বকে মানুষের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এক সেতুবন্ধনে পরিণত করেছেন এবং তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে অনুপ্রাণিত করছেন।
 

ড. সৈয়দ সেহরিশ আসগার
 
ড. সৈয়দ সেহরিশ আসগার
 
ড. সৈয়দ সেহরিশ আসগারের কর্মজীবন উৎকর্ষ, অধ্যবসায় এবং জনসেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও তিনি ২০১০ সালে জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসনিক পরিষেবা পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন এবং পরে ইউপিএসসি পরীক্ষায় সর্বভারতীয় ১১৮তম স্থান লাভ করেন। বুদগামের প্রথম মহিলা ডেপুটি কমিশনার হওয়া থেকে শুরু করে ‘সাথ’ কর্মসূচির মাধ্যমে পাঁচ লক্ষাধিক গ্রামীণ নারীকে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করে ক্ষমতায়নের উদ্যোগ, তাঁর প্রশাসনিক জীবন উদ্ভাবন ও সামাজিক প্রভাবের মাধ্যমে চিহ্নিত। সিভিল সার্ভিসে উৎকর্ষের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পুরস্কার তাঁর অবদানের স্বীকৃতি বহন করে।
 

নাঘাত তাবাসসুম আবরু
 
নাঘাত তাবাসসুম আবরু

নাঘাত তাবাসসুম আবরুর জীবনকাহিনি পরিবার, শিক্ষা এবং অধ্যবসায়ের শক্তিতে নির্মিত। বিবাহ ও মাতৃত্বের কারণে দীর্ঘ দশ বছর শিক্ষাজীবন থেকে দূরে থাকার পর তিনি আবার পড়াশোনায় ফিরে এসে কেপিএসসি পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন এবং পরে কর্নাটকের অগ্রগণ্য মুসলিম নারী আইএএস কর্মকর্তাদের একজন হয়ে ওঠেন। নারীকল্যাণ, স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন এবং ই-গভর্ন্যান্সের ক্ষেত্রে ‘বেঙ্গালুরু ওয়ান’ ও ‘খাজানে-২’-এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে মানবিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক উদ্ভাবন জনসেবার মান উন্নত করতে পারে।
 

নাগমা মহম্মদ মালিক
 
নাগমা মহম্মদ মালিক

নাগমা মহম্মদ মালিক ভারতের প্রথম মুসলিম মহিলা আইএফএস কর্মকর্তা হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন এবং নীরব অথচ কার্যকর কূটনৈতিক সেবার মাধ্যমে এক উজ্জ্বল কর্মজীবন গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে তিনি জাপান ও মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন দেশে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি তিনি কূটনীতি, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করেছেন। গণতন্ত্র, সংলাপ এবং অহিংসার মূল্যবোধকে সুচিন্তিতভাবে তুলে ধরে তিনি বিশ্বমঞ্চে ভারতের ভাবমূর্তি মর্যাদার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন।
 

নাহিদা জাম
 
নাহিদা জাম

নাহিদা জাম জাম কর্নাটকে একজন নির্ভীক ও জনমুখী প্রশাসক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছেন। জনসভা এবং তৃণমূল পর্যায়ের কাজের মাধ্যমে তিনি ধারাবাহিকভাবে নারী ক্ষমতায়ন, শিক্ষা এবং মুক্তচিন্তার পক্ষে কথা বলে চলেছেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় গর্ভবতী অবস্থাতেও মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে তিনি মানুষের গভীর শ্রদ্ধা অর্জন করেন। ছাত্রছাত্রী, নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি সামাজিক কুসংস্কার ও সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলছেন এবং আত্মনির্ভরতার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
 

সৈয়দা সাইয়িদাইন হামিদ
 
সৈয়দা সাইয়িদাইন হামিদ

ভারতের নারী অধিকার, শান্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। তিনি একজন খ্যাতিমান লেখক, শিক্ষাবিদ, পরিকল্পনা কমিশনের প্রাক্তন সদস্য এবং জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্য ছিলেন। মানবাধিকার রক্ষা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সংলাপ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি সারাজীবন কাজ করেছেন। মুসলিম উইমেন্স ফোরাম এবং উইমেন্স ইনিশিয়েটিভ ফর পিস ইন সাউথ এশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি ভারত-পাকিস্তান শান্তি উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে সাহস ও সহমর্মিতা জনজীবনে পাশাপাশি চলতে পারে।
 

অধ্যাপক শাবিনা নিশাত ওমর
 
অধ্যাপক শাবিনা নিশাত ওমর
 
অধ্যাপক শাবিনা নিশাত ওমর পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও নারী ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। শিক্ষা ও প্রশাসনে পঁচিশ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, ডিজিটাল সাক্ষরতা ও লিঙ্গ-সচেতনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। একজন শিক্ষাবিদ, বক্তা এবং প্রশাসক হিসেবে তিনি তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষা শুধু পেশা নয়, সামাজিক পরিবর্তন ও আত্মনির্ভরতার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করেন।
 

জয়নাব সৈয়দ
 
জয়নাব সৈয়দ

জয়নাব সৈয়দের জীবনযাত্রা অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা এবং জনসেবার প্রতি অঙ্গীকারের এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় একাধিক ব্যর্থতার মুখোমুখি হওয়ার পরও তিনি হাল ছাড়েননি এবং শেষ পর্যন্ত সর্বভারতীয় ১০৭তম স্থান অর্জন করেন। বর্তমানে ট্রাইফেডে তাঁর দায়িত্বের মাধ্যমে তিনি পূর্ব ভারতের আদিবাসী শিল্পী ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির জীবিকা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করছেন। তাঁর গল্প প্রমাণ করে যে দৃঢ় সংকল্প ও নিষ্ঠা প্রতিকূলতাকে সমাজসেবার সুযোগে পরিণত করতে পারে।
 
সমষ্টিগতভাবে এই নারীরা আধুনিক ভারতের এক রূপান্তরমূলক অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রশাসন, কূটনীতি, শিক্ষা, প্রত্নতত্ত্ব, সমাজকল্যাণ এবং অধিকার আন্দোলনের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান ছড়িয়ে থাকলেও তাঁদের সবার লক্ষ্য এক, শিক্ষা, সেবা এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন। প্রতিবন্ধকতা ভেঙে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন পরিসর তৈরি করে তাঁরা শুধু প্রতিষ্ঠানগুলিকেই রূপান্তরিত করছেন না, সমকালীন ভারতে নেতৃত্বের ধারণাকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছেন।