মালিক আসগর হাশমি / নয়াদিল্লি
মানবতা কি ধর্মের চেয়ে বড় হতে পারে? ভোপাল থেকে সামনে আসা এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা এই প্রশ্নের জবাব অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ বলে প্রতিষ্ঠা করেছে। যখন ধর্ম ও পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিতর্ক সমাজকে বিভক্ত করছে বলে মনে হয়, ঠিক সেই সময় কেরলের এক মুসলিম মহিলা চিকিৎসক মৃত্যুর পরও মানবতার এমন এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা শুধু শোকাহত দুটি পরিবারের জীবনেই আলো এনে দেয়নি, বরং মানবতা, সম্প্রীতি ও সামাজিক ঐক্যের এক নতুন উদাহরণও তুলে ধরেছে।
মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপালে এক মুসলিম মহিলা চিকিৎসকের অঙ্গদানে দুই হিন্দু রোগী নতুন জীবন পেয়েছেন। বিশেষ বিষয় হলো, এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এমন একটি পরিবার, যারা হঠাৎ আসা অকাল মৃত্যুর গভীর শোকে ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু সেই অবর্ণনীয় বেদনার মধ্যেও তারা মানবতাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিল। এই ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়াতেও আবেগঘন আলোচনার সূত্রপাত করেছে এবং হাজার হাজার মানুষ এটিকে “মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ” বলে অভিহিত করেছেন।
কেরলের বাসিন্দা ৪২ বছর বয়সী আয়ুর্বেদ চিকিৎসক শ্রীমতী সজনা এস. এ. গত প্রায় ছয় মাস ধরে ভোপালে কর্মরত ছিলেন। জানা গেছে, ২০২৬ সালের ১৫ মে গুরুতর ব্রেন হেমারেজে আক্রান্ত হয়ে তাঁকে ভোপালের বানসাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পরও তাঁর অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হতে থাকে এবং চিকিৎসার মধ্যেই তাঁকে ‘ব্রেন-স্টেম ডেড’ (মস্তিষ্ক-মৃত) ঘোষণা করা হয়।
ভোপালের বানসাল হাসপাতাল থেকে মুসলিম মহিলা চিকিৎসক সজনা এস. এ.-এর মরদেহের শেষ বিদায়ের এক দৃশ্য
পরিবারটির জন্য এই সময় ছিল অত্যন্ত কঠিন। একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শোক, অন্যদিকে অস্বাভাবিক চিকিৎসাগত পরিস্থিতি। কিন্তু এই কঠিন সময়েও পরিবারটি এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়, যা আজ সারা দেশজুড়ে আলোচিত হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং ট্রান্সপ্লান্ট দলের পরামর্শের পর পরিবারটি অঙ্গদানের জন্য সম্মতি প্রদান করে।
জানা গেছে, সজনা এস. এ.-এর যকৃত ও কিডনি সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়। একটি যকৃত এবং একটি কিডনি একই হাসপাতালে প্রতিস্থাপন করা হয় এবং অন্য কিডনিটি ভোপালেরই আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালের এক প্রয়োজনীয় রোগীকে দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি ‘ন্যাশনাল অর্গান অ্যান্ড টিস্যু ট্রান্সপ্লান্ট অর্গানাইজেশন’ (NOTTO)-এর নীতিমালা এবং অনুমোদিত কমিটির তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করা হয়।
বানসাল হাসপাতালের পরিচালক ডা. এস. কে. ত্রিবেদী এই ঘটনার উল্লেখ করতে গিয়ে এক অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্তের কথা বর্ণনা করেন। তিনি জানান, যখন পরিবারকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে অঙ্গ গ্রহণকারী ব্যক্তির ধর্ম বা পরিচয় নিয়ে তাঁদের কোনো অগ্রাধিকার আছে কি না, তখন বেঙ্গালুরুতে আইটি ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত সজনার স্বামী অত্যন্ত সরলভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, “যার প্রয়োজন, তাকেই দিন।”
এই একটি বাক্যই সমগ্র ঘটনার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। কোনো ধর্ম নয়, কোনো জাতি নয়, কোনো পরিচয় নয়, শুধু মানবতা।
ভোপালের বানসাল হাসপাতাল থেকে সজনা এস. এ.-এর মরদেহ যখন শেষ বিদায়ের জন্য বেরিয়ে আসে, সেই দৃশ্য ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। হাসপাতালের কর্মী, চিকিৎসক, রোগীর আত্মীয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ তাঁকে সম্মানসূচক ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে এবং পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে তাঁর মরদেহ তিরুবনন্তপুরমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, এস.এ.এম. মহাবিদ্যালয় এবং ‘ইউনাইটেড মালয়ালি অ্যাসোসিয়েশন’ (UMA)-এর প্রতিনিধিরাও পরিবারটিকে সম্মাননা জানান। হাসপাতালের কর্মীরা পরিবারটিকে একটি স্মারক প্রদান করে বলেন, এটি শুধু একটি সম্মান নয়, বরং মৃত্যুর পরও অন্যকে জীবনদান করা সেই মহিলার সহানুভূতি ও মানবতাকে স্মরণ করার একটি প্রচেষ্টা।
এই ঘটনার একটি সামাজিক ও ধর্মীয় দিকও আলোচনায় এসেছে। সাধারণত মুসলিম সমাজে অঙ্গদান নিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যাখ্যা দেখা যায়। ইসলামে অঙ্গদান বৈধ না অবৈধ, তা নিয়ে অনেকের মনেই সংশয় রয়েছে। তবে বহু ইসলামি পণ্ডিত বিশ্বাস করেন, যদি কোনো মানুষের প্রাণ রক্ষার উদ্দেশ্যে অঙ্গদান করা হয়, তাহলে তা মানবসেবার অন্তর্ভুক্ত।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিও এবং পোস্টগুলিতেও এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা গেছে। ভোপালের বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং ইনস্টাগ্রাম পেজে শেয়ার করা ভিডিওগুলো লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখেছেন এবং হাজার হাজার মানুষ আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
অনেক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “মানবতাই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম”, আবার কেউ কেউ এই ঘটনাকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য এবং ভারতের যৌথ সংস্কৃতির প্রতীক বলে উল্লেখ করেছেন। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “প্রাণ কেড়ে নেওয়া সহজ, কিন্তু জীবনদানই সর্বশ্রেষ্ঠ দান।” আরেকটি প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, “যে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করে, সে সমগ্র মানবজাতিকেই রক্ষা করে।”
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ঘটনা এমন এক রাজ্যে ঘটেছে, যেখানে রাজনীতিতে প্রায়ই হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু ভোপালের এই দৃশ্য রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে সমাজের মানবিক দিকটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এক মুসলিম মহিলার অঙ্গদান, হিন্দু রোগীদের নতুন জীবন, হাসপাতালে সম্মানের সঙ্গে বিদায় এবং প্রশাসনের উপস্থিতি, সব মিলিয়ে এমন এক বার্তা দিয়েছে, যাকে অনেকেই “গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতি”-র জীবন্ত উদাহরণ বলে অভিহিত করেছেন।
মধ্যপ্রদেশে মৃত্যুর পর অঙ্গদানের হার এখনও যথেষ্ট কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্যে প্রতি বছর খুব বেশি হলে ২৪টি এমন ঘটনা সামনে আসে। সময়মতো ‘ব্রেন-স্টেম ডেথ’ শনাক্তকরণে বিলম্ব, ট্রমা সেন্টারগুলির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতিই এর প্রধান কারণ। এমন পরিস্থিতিতে সজনা এস. এ.-এর পরিবারের এই সিদ্ধান্ত শুধু অনুপ্রেরণাদায়কই নয়, ভবিষ্যতে অঙ্গদান সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আজকের স্বার্থপর সময়ে, যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণা এবং ধর্মীয় বিতর্ক প্রায়ই শিরোনাম দখল করে, তখন ভোপালের এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ভারতের প্রকৃত পরিচয় এখনও মানবতা, যৌথ ঐতিহ্য এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মহান সংস্কৃতির মধ্যেই নিহিত। সজনা এস. এ. আজ আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তিনি এবং তাঁর পরিবারের সেই নিঃস্বার্থ সিদ্ধান্ত দুটি পরিবারের হৃদস্পন্দনে চিরদিনের জন্য বেঁচে থাকবে। তাই হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই একসুরে লিখেছেন, “তিনি চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু যাওয়ার সময় দুটি ঘরে জীবনের আলো জ্বালিয়ে রেখে গেছেন।”