ভিডিওগ্রাফি না করায় ভেঙে পড়ল মাদক মামলার রায়, সাজা বাতিল করে চারজনকে মুক্তি দিল কলকাতা হাইকোর্ট
কলকাতা
৫২৫ কেজি মাদক উদ্ধারের মামলায় চার অভিযুক্তের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বাতিল করল কলকাতা হাইকোর্ট। তল্লাশি ও মাদক বাজেয়াপ্ত করার পুরো প্রক্রিয়ার ভিডিওগ্রাফি না করা এবং তদন্তে একাধিক গুরুতর ত্রুটির কথা উল্লেখ করে আদালত অবিলম্বে চার অভিযুক্তকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
যাঁদের খালাস দেওয়া হয়েছে, তাঁরা হলেন সমীর দাস, জাহিরুদ্দিন শেখ, গোপাল দাস এবং বিজয় বিশ্বাস। নদিয়ার কৃষ্ণনগরের একটি বিশেষ আদালত ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তাঁদের প্রত্যেককে ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল। সেই রায়ই এবার বাতিল করল কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।
বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিচারপতি অপূর্ব সিনহা রায়ের ডিভিশন বেঞ্চ ২৪ জুন দেওয়া রায়ে জানায়, তল্লাশি ও বাজেয়াপ্তকরণের ঘটনাকে ভিডিওগ্রাফি করার জন্য আদালত বারবার নির্দেশ দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা মানছে না। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই নির্দেশ অমান্য করার কারণ শুধুমাত্র কর্তৃপক্ষই জানে।
রায়ে আদালত আরও উল্লেখ করে, এসটিএফ এবং অন্যান্য তদন্তকারী আধিকারিকদের কাছে মাদক পরীক্ষার কিট, ওজন মাপার যন্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম থাকলেও ভিডিওগ্রাফির জন্য কোনও ব্যবস্থা রাখা হয়নি। অথচ বর্তমানে প্রায় সব আধিকারিকের কাছেই স্মার্টফোন রয়েছে, যার সাহায্যে সহজেই গোটা অভিযানের ভিডিও বা ছবি তোলা সম্ভব ছিল।
আদালত জানায়, প্রসিকিউশন চাইলে বাজেয়াপ্তকরণের পুরো প্রক্রিয়া ভিডিওগ্রাফি করতে পারত এবং স্বাধীন সাক্ষীদের মাধ্যমেও মামলাটি প্রমাণ করতে পারত। কিন্তু মামলার নথিতে এমন কোনও ভিডিও বা নিরপেক্ষ সাক্ষীর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। ফলে শুধুমাত্র অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যদের সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করতে আদালত রাজি নয়।
তদন্তে আরও একাধিক অসঙ্গতির কথাও তুলে ধরে আদালত। রায়ে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে ৫২৫ কেজি মাদক উদ্ধার করা হলেও পরবর্তী ইনভেন্টরিতে ৫৪৯ কেজি মাদকের উল্লেখ রয়েছে। আর্দ্রতার কারণে ওজন বেড়েছে, এই যুক্তির পক্ষে কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বা সাক্ষ্য আদালতের সামনে পেশ করা হয়নি।
এছাড়া আদালত লক্ষ্য করেছে, ২০২১ সালের ২৩ মে ঘটনাস্থলেই মাদকের নমুনা সংগ্রহ করা হলেও তদন্তকারী আধিকারিক এক মাস পরে সেই নমুনা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠান। এই এক মাস নমুনাগুলি কোথায় এবং কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, তার কোনও সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। বিচার চলাকালীন মলখানা রেজিস্টার বা গুদাম রেজিস্টারও আদালতে পেশ করা হয়নি।
ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, এনডিপিএস আইনের ৫৪ নম্বর ধারায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যে আইনি অনুমান (statutory presumption) প্রযোজ্য হয়, তা কার্যকর করতে হলে প্রসিকিউশনকে প্রথমে নির্ভুলভাবে তল্লাশি, বাজেয়াপ্তকরণ এবং অভিযুক্তের দখল প্রমাণ করতে হয়। এই মামলায় সেই শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রসিকিউশন।
ফলে চার অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস দেওয়ার নির্দেশ দেয় কলকাতা হাইকোর্ট এবং তাঁদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশও জারি করে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ২৩ মে নদিয়ার নাকাশিপাড়া থানার এলাকায় এই বিপুল পরিমাণ মাদক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। যদিও রাজ্য সরকারের আইনজীবী আদালতে দাবি করেন, অভিযুক্তরা একটি এসইউভিতে ছিলেন এবং একটি ট্রাক থেকে মাদক গ্রহণ করার সময় তাঁদের হাতেনাতে ধরা হয়। অন্যদিকে অভিযুক্তদের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, তদন্তে বেআইনিভাবে সংগৃহীত প্রমাণের উপর ভিত্তি করেই নিম্ন আদালত সাজা দিয়েছিল এবং জেরা চলাকালীন উঠে আসা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেই যুক্তিকেই গুরুত্ব দিয়ে নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে কলকাতা হাইকোর্ট।