“অম্বুবাচী: মহামায়া কামাখ্যার সৃষ্টিশক্তির মহোৎসব, তন্ত্রসাধনার মহাপীঠে আধ্যাত্মিকতার মহাসমাগম”
সুদীপ শর্মা চৌধুরী:
“সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।
শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণী নমোস্তুতে॥”
ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক মানচিত্রে এমন কিছু তীর্থক্ষেত্র রয়েছে, যেগুলি কেবল ধর্মীয় উপাসনার স্থান নয়, বরং হাজার বছরের সংস্কৃতি, দর্শন, সাধনা ও বিশ্বাসের জীবন্ত কেন্দ্র। অসমের গুয়াহাটির নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত মা কামাখ্যা দেবালয় তেমনই এক মহাপীঠ। শাক্তধর্ম, তন্ত্রসাধনা এবং মাতৃশক্তির উপাসনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিত এই তীর্থক্ষেত্র। আর এই কামাখ্যা ধামকে ঘিরেই প্রতিবছর আষাঢ় মাসে অনুষ্ঠিত হয় অম্বুবাচী মহাযোগ বা অম্বুবাচী মেলা, যা আজ শুধু অসম নয়, সমগ্র ভারতবর্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
অম্বুবাচী এমন এক উৎসব, যেখানে নারীত্ব, মাতৃত্ব, সৃষ্টি, প্রকৃতি এবং শক্তির এক অনন্য দর্শন প্রতিফলিত হয়। লক্ষ লক্ষ ভক্তের বিশ্বাস, এই কয়েকদিন মা কামাখ্যা ঋতুমতী হন এবং সৃষ্টির উৎস হিসেবে নারীর জীবনীশক্তিকে সম্মান জানাতেই মন্দিরের গর্ভগৃহ বন্ধ রাখা হয়। পৃথিবীর আর কোনও প্রধান তীর্থক্ষেত্রে নারীর ঋতুচক্রকে এত গভীর আধ্যাত্মিক মর্যাদা দেওয়ার নজির খুব কমই দেখা যায়।
কামাখ্যার উৎপত্তি: সতীপীঠের মহিমা
কামাখ্যা দেবালয়ের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে পুরাণপ্রসিদ্ধ দক্ষযজ্ঞের কাহিনির সঙ্গে। কিংবদন্তি অনুযায়ী, রাজা দক্ষ তাঁর যজ্ঞে জামাতা মহাদেবকে আমন্ত্রণ না জানালে অপমানিত হয়ে দেবী সতী আত্মাহুতি দেন। স্ত্রীর মৃত্যুতে শোকাহত শিব সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করেন। সৃষ্টি রক্ষার স্বার্থে ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্র নিক্ষেপ করে সতীর দেহকে বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত করেন।
বিশ্বাস করা হয়, সতীর যোনি অংশ নীলাচল পাহাড়ে পতিত হয়েছিল। সেই কারণেই কামাখ্যা শক্তিপীঠকে সৃষ্টিশক্তি, উর্বরতা এবং মাতৃশক্তির সর্বোচ্চ প্রতীক হিসেবে মানা হয়। এখানে দেবীর কোনও মানবাকৃতি মূর্তি নেই। গর্ভগৃহে একটি প্রাকৃতিক শিলাখণ্ডের ফাঁক দিয়ে নিরন্তর জলধারা প্রবাহিত হয়, যা দেবীর শক্তিস্বরূপ হিসেবে পূজিত।
অম্বুবাচী শব্দের অর্থ
‘অম্বু’ অর্থ জল এবং ‘বাচী’ অর্থ প্রকাশ বা উন্মোচন। বর্ষার আগমনের সময় প্রকৃতি যেমন নতুন প্রাণ ফিরে পায়, তেমনি এই সময়কে পৃথিবীর উর্বরতার প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। কৃষিনির্ভর সমাজে এই সময়কে মাটির ঋতুকাল বলেও উল্লেখ করা হয়। ফলে অম্বুবাচী কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, প্রকৃতি ও কৃষি সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
কামাখ্যা মন্দিরকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে
অম্বুবাচীর সূচনার সঙ্গে সঙ্গে মা কামাখ্যার গর্ভগৃহের দ্বার বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাধারণত তিন দিন ধরে মন্দিরের মূল গর্ভগৃহে কোনও দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারেন না।
এই সময়ে—মন্দিরে নিয়মিত পূজা-অর্চনা বন্ধ থাকে।
দেবীর নিত্যসেবা স্থগিত রাখা হয়।
গর্ভগৃহ সম্পূর্ণভাবে আবৃত রাখা হয়।
বহু ভক্ত নতুন কাজ, বিবাহ, গৃহপ্রবেশ বা অন্যান্য শুভ অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলেন।
কৃষিজমিতে চাষাবাদ বা বীজ বপন থেকে বিরত থাকার প্রথাও অনেক স্থানে প্রচলিত।
ভক্তরা উপবাস, জপ, ধ্যান এবং ধর্মীয় অনুশীলনে সময় কাটান।
তিন দিনের পর ‘নিবৃত্তি’ বা ‘মহাস্নান’-এর মাধ্যমে দেবীর শুদ্ধিকরণ সম্পন্ন হয় এবং চতুর্থ দিনে পুনরায় মন্দিরের দরজা খুলে দেওয়া হয়।অম্বুবাচী মেলাকে অনেকেই ‘তান্ত্রিকদের কুম্ভমেলা’ বলে অভিহিত করেন। কারণ এই সময় দেশ-বিদেশের অসংখ্য তান্ত্রিক, অঘোরী, কাপালিক, নাগা সাধু, শৈব ও শাক্ত সম্প্রদায়ের সাধক কামাখ্যায় সমবেত হন।মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে চলে—তন্ত্রমন্ত্র জপ,যজ্ঞ ও হোম,ধ্যানসাধনা,কুণ্ডলিনী জাগরণের অনুশীলন,শাক্ত তন্ত্রের বিশেষ সাধনা।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, অম্বুবাচীর সময় সাধনার ফল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাই বহু সাধক বছরের পর বছর এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন।কামাখ্যা ধামকে দশ মহাবিদ্যার অন্যতম প্রধান সাধনপীঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শাক্ত দর্শনে দশ মহাবিদ্যা হলেন দেবীর দশটি শক্তিরূপ।
এই দশ মহাবিদ্যা হলেন—১. মহাকালী,২. তারা,৩. ত্রিপুরাসুন্দরী,৪. ভুবনেশ্বরী,৫. ছিন্নমস্তা,৬. ভৈরবী,৭. ধূমাবতী,৮. বগলামুখী,৯. মাতঙ্গী,
১০. কমলা।
নীলাচল পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে এই দেবীদের আরাধনার পৃথক কেন্দ্র রয়েছে। অম্বুবাচীর সময় এই সমস্ত শক্তিরূপের বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়।অম্বুবাচী শেষে ভক্তদের মধ্যে ‘রক্তবস্ত্র’ এবং ‘অঙ্গোদক’ বিতরণ করা হয়।রক্তবস্ত্র হল দেবীর ঋতুকালের প্রতীক হিসেবে পূজিত লাল বস্ত্র।অঙ্গোদক হল গর্ভগৃহের পবিত্র জল।ভক্তদের বিশ্বাস, এই প্রসাদ গৃহে সংরক্ষণ করলে শুভশক্তির আশীর্বাদ লাভ হয় এবং অশুভ শক্তি দূরে থাকে।
অম্বুবাচী মেলার সময় নীলাচল পাহাড় এক বিশাল মানবসমুদ্রে পরিণত হয়। ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্য থেকে ভক্তরা এখানে আসেন। পাশাপাশি নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও বহু দর্শনার্থী উপস্থিত হন।সাধুদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা যায়—নাগা সাধু,অঘোরী,বৈরাগী,কাপালিক,শৈব তপস্বী,শাক্ত সাধক।
তাদের জীবনযাপন, সাধনপদ্ধতি এবং আধ্যাত্মিক চর্চা সাধারণ মানুষের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে।
যোগ সাধনায় মগ্ন সাধু
অম্বুবাচীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নারীদেহ ও ঋতুচক্রকে পবিত্রতার সঙ্গে দেখা। সমাজের বহু ক্ষেত্রে এখনও ঋতুস্রাবকে ঘিরে নানা কুসংস্কার ও সংকোচ বিদ্যমান। সেখানে কামাখ্যা দেবালয় ঘোষণা করে যে, ঋতুচক্র কোনও অশুচিতা নয়; বরং এটি সৃষ্টির উৎস, জীবনের ধারাবাহিকতার ভিত্তি।এই দর্শনই অম্বুবাচীকে বিশ্বের অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবের থেকে আলাদা করে তুলেছে।
অম্বুবাচী শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এই সময় গুয়াহাটিতে বিশাল অস্থায়ী বাজার, হস্তশিল্প মেলা, ধর্মীয় গ্রন্থের প্রদর্শনী এবং লোকসংস্কৃতির নানা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারিগর ও স্থানীয় মানুষ এই উৎসবকে কেন্দ্র করে জীবিকা অর্জনের সুযোগ পান।
অম্বুবাচী হল শক্তির আরাধনা, মাতৃত্বের বন্দনা এবং সৃষ্টির উৎসকে সম্মান জানানোর এক অনন্য মহোৎসব। নীলাচল পাহাড়ে এই কয়েকদিন যেন ধর্ম, দর্শন, তন্ত্র, সংস্কৃতি এবং মানবতার এক মহামিলন ঘটে। গেরুয়া বসনের সাধু, ভস্মমাখা অঘোরী, সাধারণ ভক্ত, গবেষক, পর্যটক—সবাই একাকার হয়ে যান মহামায়ার চরণে।
মা কামাখ্যার দ্বারে তখন বর্ণ, ভাষা, জাতি ও পরিচয়ের সব বিভাজন মুছে গিয়ে ধ্বনিত হয় একটাই জয়ধ্বনি—“জয় মা কামাখ্যা। জয় আদ্যাশক্তি। জয় মহামায়া।”