মসজিদ নেই, মুসলিমও নেই, তবু মহরমে মেতে ওঠে গোটা গ্রাম! মহারাষ্ট্রের বেরডওয়াড়ির সম্প্রীতির বিস্ময়

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 9 h ago
মসজিদ নেই, মুসলিমও নেই, তবু মহরমে মেতে ওঠে গোটা গ্রাম! মহারাষ্ট্রের বেরডওয়াড়ির সম্প্রীতির বিস্ময়
মসজিদ নেই, মুসলিমও নেই, তবু মহরমে মেতে ওঠে গোটা গ্রাম! মহারাষ্ট্রের বেরডওয়াড়ির সম্প্রীতির বিস্ময়
 
ভক্তি চালক 

ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহরম কেবল নতুন বছরের সূচনা নয়, এটি কারবালার আত্মত্যাগ, ন্যায়ের পক্ষে অটল থাকার অমর ইতিহাসেরও স্মারক। এই মাসের প্রথম দশ দিনেই শহিদ হন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসেইন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা। সেই কারণেই মহরম মুসলিম সমাজে শোক ও মাতমের মাস হিসেবে পালিত হয়। বিশেষ করে আশুরার দিনে শিয়া সম্প্রদায় মাতম পালন করেন, আর ভারতে, বিশেষত মহারাষ্ট্রে, সুন্নি মুসলমানরাও ঐতিহ্য মেনে মহরম পালন করেন। তবে মহারাষ্ট্রের মহরমকে অন্য মাত্রা দিয়েছে একটি অনন্য বাস্তবতা, এখানে বহু জায়গায় হিন্দু সমাজও সমান উৎসাহ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে এই ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে।
 
মহারাষ্ট্রের গ্রামীণ অঞ্চলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হিন্দু ও মুসলিম সমাজ একসঙ্গে মহরম পালন করে আসছে। তবে মহারাষ্ট্রে এমন একটি গ্রামও রয়েছে, যেখানে একজনও মুসলিম বাস করেন না, তবুও সেখানে রামোশি (বেরড) সম্প্রদায়ের উদ্যোগে মুহররম পালিত হয়। এই গ্রামের নাম বেরডওয়াড়ি (ভুসণিওয়াড়ি)। এই গ্রামের মানুষ বিপ্লবী উমাজি নায়ক এবং মারাঠা সাম্রাজ্যের গোয়েন্দা প্রধান বহিরজি নায়কের বীরত্বের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন।
ইতিহাসে সাহসিকতার জন্য পরিচিত রামোশি সম্প্রদায়ের এই বসতির প্রকৃত পরিচয় হলো, এখানে একটি মুসলিম পরিবারও নেই, তবুও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে মহরম পালিত হয়ে আসছে। বছরের পর বছর ধরে এই আয়োজন গ্রামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মিলিত সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
 
মসজিদ নেই, তবুও মুখে মুখে উচ্চারিত হয় ইমাম সাহেবের নাম!
 
ভুসণি-ভুসণিওয়াড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত এই গ্রামে বহু বছর ধরে এক অনন্য ঐতিহ্য দেখা যায়।মহরমের সময় গোটা গ্রাম বারো ইমাম এবং কাসিম ইমাম সাহেবের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে মগ্ন হয়ে ওঠে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পীরের পূজার সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান সঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য পাশের গ্রাম থেকে মুসলিম মুজাওয়ারদের অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
 
তাঁদের হাত দিয়েই ইসলামি রীতি মেনে সমস্ত ধর্মীয় আচার সম্পন্ন হয়। গ্রামের যুবকেরা একত্রিত হয়ে ‘কারবাল’ খেলা আয়োজন করে। ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে ভ্রাতৃত্বের এই বার্তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
 
মহরমের সঙ্গে সামাজিক পরিবর্তনের উদ্যোগ

রামোশি সমাজের ইতিহাস বরাবরই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং বীরত্বের ইতিহাস। সেই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ভুসণিওয়াড়ির মানুষ মহরমকে সামাজিক সচেতনতার সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। এই উপলক্ষে গ্রামে সমাজকল্যাণমূলক নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় রোগীদের সাহায্যের জন্য রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা হয়। সমাজ সচেতনতামূলক গান পরিবেশিত হয়, লোকনৃত্যের আয়োজন করা হয় এবং নাটকের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার ওপর সরাসরি বার্তা দেওয়া হয়।
 
মুহররমের এই কয়েক দিনে গোটা গ্রামে এক অপূর্ব শান্তি ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ বিরাজ করে। সমস্ত পরিবার একত্রিত হয় এবং মহাপ্রসাদের আয়োজন করা হয়। চাকরি ও জীবিকার জন্য মুম্বই-পুনের মতো বড় শহরে থাকা যুবকেরাও এই সময় বিশেষভাবে গ্রামে ফিরে আসেন। ফলে গোটা বেরডওয়াড়িতে এক বৃহৎ পারিবারিক মিলনমেলার আবহ তৈরি হয়।
 
গ্রামে তাজিয়া অনুষ্ঠান
 
মহরমের এই অনন্য উদ্‌যাপনের একাধিক ভিডিও বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হচ্ছে। বেরডওয়াড়ির যুবক উমেশ ভোকলে এই ঐতিহ্যের প্রতিদিনের ভিডিও নিজের ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করেছেন।
 
‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে উমেশ বলেন, “এই বহু পুরনো ঐতিহ্যকে বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য আমি প্রতিদিনের ভিডিও তৈরি করে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেছি। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই ভিডিও শেয়ার করেছেন এবং অত্যন্ত ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।”
 
উমেশ আরও বলেন, “আমাদের গ্রামে একজনও মুসলিম নেই, তবুও আমার গ্রাম আজও এই ঐতিহ্যকে জীবিত রেখেছে, এটা আমার কাছে গর্বের বিষয়। আর আমাদের প্রজন্মও এই ঐতিহ্য একইভাবে ভবিষ্যতে এগিয়ে নিয়ে যাবে।”
 
এই ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে বেরডওয়াড়ির বাসিন্দা এবং শ্রী ষণ্মুখেশ্বর বিদ্যালয়-এর ক্রীড়া শিক্ষক অঙ্কুশ মাণ্ডলে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমাদের বেরডওয়াড়ির এই মুহররমই আমাদের গ্রামের ঐক্যের সবচেয়ে বড় শক্তি। স্বাধীনতার আগের সময় থেকে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই ঐতিহ্য পালন করে আসছেন, আর আজ আমরা সেটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আমাদের গ্রামে জাতপাত বা বৈষম্যের কোনও স্থান নেই। আমরা বিশ্বাস করি, সবার জন্য ঈশ্বর একজনই। সেই বিশ্বাস থেকেই আমরা সবাই একসঙ্গে মিলিত হই। বারো ইমাম এবং কাসিম ইমাম সাহেবের প্রতি এই গ্রামের মানুষের গভীর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস রয়েছে।”
 
গ্রামের উপ-সরপঞ্চ দশরথ মাণ্ডলে গ্রামের পরিচয় তুলে ধরে বলেন, “আসলে আমাদের গ্রামের তিনটি নাম রয়েছে। অনেকে এটিকে অনন্তপুর, ভুসণিওয়াড়ি এবং বেরডওয়াড়ি, এই তিন নামেই চেনেন। মহরমের কারণে আমাদের গ্রামের পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব আরও দৃঢ় হয়েছে। এখানে একজনও মুসলিম পরিবার নেই, তবুও সব সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হয়ে পীর বাবার মহরম পালন করেন। এটাই আমাদের গ্রামের প্রকৃত পরিচয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্যই আমাদের গ্রামের গর্ব।”
 
গ্রামে তাজিয়া রাখার স্থান
 
রাজস্ব কর্মী শিবশঙ্কর মাণ্ডলে বলেন, “বারো ইমাম এবং কাসিম ইমাম সাহেব আমাদের গ্রামের বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। গ্রামের কেউ কোনও শুভ বা গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে প্রথমেই ইমাম সাহেবের নাম স্মরণ করেন। আমাদের বিশ্বাস, তাঁর আশীর্বাদেই সব কাজ সফল হয়। মহরমের সময় শহরে থাকা গ্রামের সমস্ত মানুষ বাড়ি ফিরে আসেন। তাই আমাদের কাছে মুহররম শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং আবেগ, সংস্কৃতি এবং সামাজিক ঐক্যের প্রতীক।”
 
বীরত্বের ইতিহাস হোক কিংবা সম্প্রীতির, ভুসণিওয়াড়ি বরাবরই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একজনও মুসলিম পরিবার না থাকা সত্ত্বেও ইসলামি পবিত্র ঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে যেভাবে এখানে মহরম পালন করা হয়, তা আজকের প্রজন্মের জন্য এক বিরল প্রেরণা। বিভক্ত সমাজকে একসূত্রে বাঁধার এই ঐতিহ্য সত্যিই মহারাষ্ট্রের মিলিত সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অমূল্য সম্পদ।