শান্তনু ঠাকুরের দেওয়া নথি অগ্রাহ্য, এসআইআর শুনানিতে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে মতুয়া সম্প্রদায়

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 21 d ago
শান্তনু ঠাকুরের দেওয়া নথি অগ্রাহ্য, এসআইআর শুনানিতে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে মতুয়া সম্প্রদায়
শান্তনু ঠাকুরের দেওয়া নথি অগ্রাহ্য, এসআইআর শুনানিতে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে মতুয়া সম্প্রদায়

দেবকিশোর চক্রবর্তী 

দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়া শুরু হতেই উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ মহকুমা ও সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক এসআইআর শুনানিতে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর-এর দেওয়া বা সুপারিশ করা নথি অগ্রাহ্য হওয়ার অভিযোগে এই অনিশ্চয়তা আরও তীব্র হয়েছে।
 
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এসআইআর শুনানিতে বহু মতুয়া নাগরিক তাঁদের ভোটার পরিচয় ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথি জমা দেন। অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বৈধ হিসেবে ব্যবহৃত একাধিক নথি সাম্প্রতিক যাচাইয়ে গ্রহণ করা হয়নি। ফলে বহু মানুষের আশঙ্কা, তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারে।
বনগাঁ, গাইঘাটা, হাবরা ও ঠাকুরনগর এলাকার মতুয়া পরিবারগুলির বক্তব্য, দেশভাগ ও তার পরবর্তী সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে আসা মানুষজনের হাতে পূর্ণাঙ্গ কাগজপত্র থাকা সবসময় সম্ভব হয়নি। অনেকের কাছেই রয়েছে শরণার্থী শিবিরের নথি, স্থানীয় প্রশাসনের সার্টিফিকেট বা পুরনো ভূমি সংক্রান্ত কাগজ। সময়ের সঙ্গে সেই নথির অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
 
মতুয়া সমাজের একাংশের দাবি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের আশ্বাস ও তাঁদের দেওয়া নথির উপর ভরসা করেই এতদিন তাঁরা ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে এসেছেন। এখন হঠাৎ করে সেই নথি অগ্রাহ্য হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এক প্রবীণ মতুয়া বাসিন্দার কথায়, “আমাদের কাছে নতুন করে দেওয়ার মতো আর কিছু নেই। যা ছিল, সেটাই দিয়েছি। এখন যদি এগুলো মানা না হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?”
 
এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর। তিনি বলেন, “মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। এসআইআর একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, এর সঙ্গে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। যদি কোনও জায়গায় নথি নিয়ে সমস্যা হয়ে থাকে, তা সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলে সমাধান করা হবে।” তিনি আরও দাবি করেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টির উপর নজর রাখছি। কোনও প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে না।”
 
তবে তাঁর এই আশ্বাসে পুরোপুরি আশ্বস্ত নন অনেক মতুয়া বাসিন্দা। তাঁদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের শুনানিতে স্পষ্ট দিকনির্দেশের অভাব রয়েছে। কোথাও কোথাও আধিকারিকদের কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা মিলছে, যা বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এসআইআর একটি নিয়মবদ্ধ ও আইননির্ভর প্রক্রিয়া। নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট নির্দেশিকা অনুযায়ীই নথি যাচাই করা হচ্ছে। কোনও রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে নথি গ্রহণ করার নিয়ম নেই বলেই দাবি প্রশাসনিক সূত্রের। এক আধিকারিকের বক্তব্য, “আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য নথির ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বাদ দেওয়ার প্রশ্ন নেই।”
রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, এসআইআর-এর নামে সীমান্তবর্তী ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষকে আতঙ্কিত করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, মতুয়া সম্প্রদায় বারবার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও বাস্তবে প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন ও নাগরিকত্বের ইতিহাস যেখানে জটিল, সেখানে এসআইআর-এর মতো প্রক্রিয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল। স্বচ্ছতা ও একরূপ নির্দেশিকা না থাকলে এই অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, শান্তনু ঠাকুরের আশ্বাস সত্ত্বেও এসআইআর শুনানিতে নথি গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দ্রুত প্রশাসনিক স্পষ্টতা ও কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে এই অসন্তোষ আগামী দিনে আরও বড় আকার নিতে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।